শিরোনাম

বাঘের থাবায় সিংহ কুপোকাত

এম.এ.বাকী  |  ১৮:৪৭, জানুয়ারি ১৯, ২০১৮

বাংলাদেশকে অবজ্ঞা করে সাবেক কোচ হাথুরুসিংহে চলে গিয়েছিলেন শ্রীলংকায়। হয়েছিল নিজ দেশ শ্রীলংকার কোচ। হাথুরুকে বুঝিয়েদিল অবজ্ঞার ফল ভাল হয় না। টাইগাররা লজ্জাজনকভাবে সিংহ হিসেবে খ্যাত শ্রীলংকাকে হারিয়েছে ১৬৩ রানের বিশাল ব্যবধানে। নিশ্চয়ই হাথুরু সারাজাীবন মনে রাখবেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এই শোচনীয় হারের কথা। বাংলাদেশ চলে যাওয়ার পর এটাই ছিল হাথুরুর প্রথশ এ্যাসাইনমেন্ট। জিম্বাবুয়ে ও বাংলাদেশের কাছে টানা ২টি ম্যাচে হেরে ফাইনালে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক দুরে রয়েছে। আর বাংলাদেশ টানা ২টি ম্যাচ জিতে ফাইনালে যাওয়ার জন্য এক পা এগিয়ে রেখেছে। নিজেদের ওয়ানডে ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বেশি রানের ব্যবধানে পাওয়া জয়। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এটি ৬ষ্ঠ জয় বাংলাদেশের। বাংলাদেশ এর আগে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে খুলনায় ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ১৬০ রানে হারিয়েছিল। ঐ ম্যাচে আগে ব্যাট করে ৬ উইকেটে ২৯২ তুলে উইন্ডিজকে ১৩২ রানে অলআউট করে টাইগাররা।

শুক্রবার ( ১৯ জানুয়ারি) মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে ত্রিদেশীয় সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশের ছুঁড়ে দেওয়া ৩২১ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নেমে শ্রীলঙ্কা ৩২.২ ওভার ব্যাট করে সবাইকে হারিয়ে ১৫৭ রানেই গুটিয়ে গেছে। লাল-সবুজদের জয়টি ১৬৩ রানের বিশাল ব্যবধানে। নিজেদের প্রথম ম্যাচে জিম্বাবুয়েকে ৮ উইকেটে উড়িয়ে মিশন শুরু করা টাইগাররা এবার উড়িয়ে দিলো লঙ্কানদের। বাংলাদেশের সাবেক কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে এবার নিজ দেশ শ্রীলঙ্কার কোচিংয়ের দায়িত্ব নিয়ে সাবেক ছাত্রদের বিপক্ষে বর্তমান শিষ্যদের পরাজয় দেখলেন। দলীয় ২ রানের মাথায় কুশল পেরেরাকে ফিরিয়ে দেন ওপেনার বোলার নাসির হোসেন। এরপর উইকেট শিকারে যোগ দেন মাশরাফি। উপুল থারাঙ্গা ২৫ রানে সাজঘরে ফেরেন। দলীয় ৪৩ রানের মাথায় দ্বিতীয় উইকেট হারায় লঙ্কানরা।

দলীয় ১৪তম ওভারে আবারো মাশরাফি আঘাত হানেন। ফিরিয়ে দেন কুশল মেন্ডিসকে। ব্যক্তিগত ১৯ রান করে রুবেল হোসেনের হাতে ধরা পড়েন তিনি। দলীয় ৬২ রানের মাথায় তৃতীয় উইকেট হারায় লঙ্কানরা। দলীয় ৮৫ রানের মাথায় চতুর্থ উইকেট হারায় শ্রীলঙ্কা। নিরোশান ডিকওয়েলা ১৬ রানে বোল্ড হন। মোস্তাফিজের দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে পরাস্ত হন তিনি। দলীয় ১০৬ রানের মাথায় রানআউট হন চান্দিমাল (২৮)। ২৬তম ওভারে গুনারত্নে ১৬ রানে সাকিবের বলে বিদায় নেন। পরের বলেই সাকিব ফিরিয়ে দেন হাসারাঙ্গাকে। দলীয় ১১৭ রানের মাথায় ৭ উইকেট হারায় লঙ্কানরা। থিসারা পেরেরা ব্যাটে ঝড় তুলে করেন ১৪ বলে ২৯ রান। তার ব্যাট থেকে আসে তিনটি চার আর দুটি ছক্কা। সাকিব ফেরান তাকে। এরপর সুরাঙ্গা লাকমলকে (১) বোল্ড করে সাজঘরে পাঠান রুবেল। শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে ফেরেন ১৪ রান করা ধনাঞ্জয়া। সাকিব ৩টি, মাশরাফি-রুবেল ২টি করে উইকেট পান। একটি করে উইকেট তুলে নেন নাসির, মোস্তাফিজ।

জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে আগের ম্যাচের মতো শুক্রবারও জ্বলে উঠলেন তামিম ইকবাল। মুশফিকুর রহিম তুললেন শেষের দিকে ঝড়। সাকিব আল হাসান আবারও দেখালেন তার অলরাউন্ড নৈপুন্যে। মাশরাফি দিলেন সামনে থেকে নেতৃত্ব। তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিমদের হাফ-সেঞ্চুরীর ওপর ভর দিয়ে চন্ডিকা হাথুরুসিংহের শিষ্যদের সামনে ৩২১ রানের টার্গেট ছুঁড়ে দেয় বাংলাদেশ।নিজ দেশের দায়িত্ব নিয়ে এবারই প্রথমবার সাবেক শিষ্যদের বিপক্ষে কোচের দায়িত্বে হাথুরু। শুক্রবার মিরপুরে টসভাগ্যটা আরেকবার প্রসন্ন হয় মাশরাফি বিন মোর্তুজার। জিম্বাবুয়ের সঙ্গে আগের ম্যাচে ফিল্ডিং নিয়েছিলেন, গতকাল শ্রীলঙ্কার সঙ্গে জয়ের পর সিদ্ধান্ত নেন ব্যাট করার। নির্ধারিত ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ তোলে ৩২০ রান। তামিম ৮৪, সাকিব ৬৭, মুশফিক ৬২, বিজয় ৩৫, মাহমুদউল্লাহ ২৪ আর সাব্বির অপরাজিত ২৪ রান করেন। বাংলাদেশ ২৩ জানুয়ারী জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আবারো মুখোমুখি হবে। সেই ম্যাচে জিতলেই বাংলাদেশ এক ম্যাচ হাতে রেখেই ফাইনাল নিশ্চিত হয়ে যাবে।

তামিমের ১১ ও সাকিবের ১০ হাজার রান:
দুই বন্ধু তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসান যাই করেন, তা অলৌকিভাবে পাশাপাশি হয়ে যায়। আবার তা রেকর্ডও হয়ে যায়। শুক্রবার চলমান ত্রিদেশীয় সিরিজে তামিম ও সাকিব আরেকটি কীর্তি গড়লেন। তামিম ১১ হাজার ও সাকিব ১০ হাজার রানের ক্লাবে নাম লেখালেন। ৩৭তম ওভারের শেষ বল। ডাউন দ্য উইকেটে এসে সুরঙ্গ লাকমলের একটি ডেলিভারি মিড উইকেটে পাঠালেন সাকিব আল হাসান। ফিল্ডার যতক্ষণে বল থ্রো করে পাঠালেন,ততক্ষণে দুই রান নিয়ে নেন সাকিব। এই দুই রান নেওয়ার মধ্য দিয়ে নিজের মুকুটে আরও একটি পালক যুক্ত করলেন বাংলাদেশের এই পোস্টার বয়। জাতীয় দলের সতীর্থ ও বন্ধু তামিম ইকবালের পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ১০ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করলেন সাকিব।১৫ জানুয়ারী উদ্বোধনী ম্যাচে পঞ্চম বাংলাদেশি বোলার হিসেবে ১০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেছিলেন পেসার রুবেল হোসেন। ওই ম্যাচে তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ১১০০০ রানের মাইলফলকের একেবারে কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন তামিমও। যদিও সেদিন সাত রানের অপেক্ষা নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। তবে সিরিজে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে শুক্রবার শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেই মাইলফলক ঠিকই স্পর্শ করেছেন বাঁহাতি এই ওপেনার। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এই কীর্তি গড়েন তামিম। এই একই ম্যাচে নতুন আরেকটি মাইলফলক স্পর্শ করলেন সাকিবও। ৬৭ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলার পথে ১০ হাজার রানের ক্লাবে নিজের নাম লেখান বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার।
মজার ব্যাপার, গত বছরের মার্চে এই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেই ১০ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেছিলেন তামিম। বন্ধু সাকিবও তার পথে হাঁটলেন। শুক্রবার সেই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেই মাঠে নামার আগে এই মাইলফলক স্পর্শ করতে সাকিবের প্রয়োজন ছিল ৬৬ রানের। ৬৭ রানের ইনিংস খেলার পথে দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় এই বিজ্ঞাপন ছুঁয়ে ফেলেন এই মাইলফলক। ১০ হাজার রান করেছেন এমন ক্রিকেটারদের মধ্যে সাকিবের অবস্থান ৮১তম। ১০ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করার পর পরই সাজঘরে ফিরতে হয় সাকিবকে। ব্যক্তিগত ৬৭ রানে। আসেলা গুনারত্নের বলে ফিরতি ক্যাচ দেন সাকিব। তিন ফরম্যাট মিলিয়ে এখন সাকিবের সংগ্রহ ১০ হাজার ১ রান। তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ঝুলিতে রয়েছে ৪৯০টি উইকেট। আর ১০ উইকেট পেলে ইতিহাসের তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে ৫০০ উইকেট ও ১০ হাজার রানের মালিক হওয়ার কীর্তি গড়বেন সাকিব। তবে ইতোমধ্যেই ওই তালিকার ওপরের দিকে নিজের নামটি বসিয়ে নিয়েছেন ২৯৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা বাঁহাতি এই অলরাউন্ডার। ক্রিকেট ইতিহাসের চতুর্থ ক্রিকেটার হিসেবে ১০ হাজার রান এবং চার শতাধিক উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়েছেন তিনি। ১১ হাজার ৭৭ রান নিয়ে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের মধ্যে এই তালিকায় সবার উপরে রয়েছেন তামিম। ১০ হাজার ১ রান নিয়ে সাকিবের অবস্থান দুই নম্বরে। এই তালিকায় সাকিবের পরই রয়েছেন উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম। তিন ফরম্যাট মিলিয়ে তার রান সংখ্যা ৮ হাজার ৮৪৭ রান। ২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৫১টি টেস্ট খেলেছেন সাকিব। এই ফরম্যাটে ৪০.৩৮ গড়ে ৩ হাজার ৫৯৪ রান করেছেন তিনি। রয়েছে পাঁচটি সেঞ্চুরি ও ২২টি হাফ সেঞ্চুরি। ওয়ানডেতে খেলছেন ক্যারিয়ারের ১৮২তম ম্যাচ। এই ফরম্যাটে তার রান সংখ্যা ৫ হাজার ১৮৪। সাতটি সেঞ্চুরি ও ৩৫টি হাফ সেঞ্চুরি রয়েছে এই ফরম্যাটে। এছাড়া ৬১ টি-২০তে তার সংগ্রহ ১ হাজার ২২৩ রান। রয়েছে ছয়টি হাফ সেঞ্চুরি।

একইসঙ্গে ১ হাজারে বিজয়-সাব্বির:
ওয়ানডেতে বাংলাদেশের পক্ষে সবচেয়ে কম ইনিংস খেলে ১ হাজার রান পূর্ণ করার রেকর্ডটি ১১ বছর ধরে ছিল শাহরিয়ার নাফীসের দখলে। এবার সেই রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন এনামুল হক বিজয়। ২০১৫ সালের পর আবার বাংলাদেশের ওয়ানডে একাদশে জায়গা করে নেওয়ার পর মাত্র দুটি ওয়ানডে খেলেই রেকর্ডটি ছুঁয়ে ফেলেন এই ডানহাতি ওপেনার। এনামুলের পর একই দিনে ১ হাজারের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন সাব্বির রহমানও। ২০০৬ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একটি ম্যাচে নাফীস পূর্ণ করেছিলেন ওয়ানডেতে এক হাজার রান। এ জন্য তাঁকে খেলতে হয়েছিল ২৯টি ইনিংস। গতকাল শুক্রবার শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজের ম্যাচে ক্যারিয়ারের ২৯তম ইনিংস খেলতে নেমে সেই এক হাজার রানের মাইলফলক ছুঁয়েছেন বিজয়ও। নাফীস অবশ্য সময়ের হিসাবে সেরা কারণ অভিষেকের মাত্র এক বছর ১৬২ দিনের মধ্যেই তিনি ছুঁয়েছিলেন ওয়ানডেতে হাজার রানের মাইলফলক। ৩৪ ইনিংসে হাজার রান করে দ্রুততমের তালিকায় নাসির হোসেন ও ইমরুল কায়েস আছেন দ্বিতীয় অবস্থানে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ১৯তম ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়ানডেতে এক হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন এনামুল। এক হাজার রান করার পথে তিনি খেলেছেন তিনটি শতক ও তিনটি অর্ধশতকের ইনিংস। শুক্রবার শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এনামুলের ব্যাট থেকে এসেছে ৩৫ রান। এনামুলের পর বাংলাদেশের ২০তম ব্যাটসম্যান হিসেবে এক হাজারের ক্লাব ঢুকেছেন সাব্বির রহমান। এই মাইলফল সাব্বির ছুঁয়েছেন ৪২তম ইনিংসে। গতকাল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শেষপর্যায়ে সাব্বির খেলেছেন ১২ বলে ২৪ রানের ঝড়ো ইনিংস। ব্যাটিং গড়ের হিসাবে অবশ্য এনামুল এগিয়ে আছেন অনেকের চেয়ে। এক হাজার রান পূর্ণ করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে এনামুলের চেয়ে বেশি ব্যাটিং গড় আছে কেবল তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিমের। তিনজনেরই ব্যাটিং গড় ৩৫-এর ঘরে। আর এনামুলেরটা ৩৪.৬২।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত