শিরোনাম

প্রয়োজন নেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার, টাকা হলেই আসল সনদ!

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল লতিফ রানা  |  ০০:১৭, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৯

বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মেডিকেলসহ কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাগত যোগ্যতারই প্রয়োজন নেই। শুধু টাকা হলেই পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডসহ সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট ও মেডিকেল কলেজের সার্টিফিকেট। শুধু তাই নয়, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স, বিদ্যুৎ বিল, ব্যাংক সার্টিফিকেটসহ যেকোনো সার্টিফিকেট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জানান, দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকেট হাতে লিখে দেয়া হলে এই জাল সার্টিফিকেট ব্যবসায়ীদের রোধ করা সম্ভব হবে।রাজধানীর নীলক্ষেত এলাকায় এসব সার্টিফিকেট কেনাবেচার মহোৎসব চলে। শুধু নীলক্ষেতেই সীমাবদ্ধ নেই এই জাল সাটিফিকেট কেনাবেচার চক্রের দৌরাত্ম্য, এখন পুরো রাজধানীতেই ছড়িয়ে পড়েছে। নীলক্ষেত এলাকায় দিনের চেয়ে রাতে বেশি চলছে এ অবৈধ কর্মকাণ্ড। বিভিন্ন কৌশল আর প্রযুক্তি ব্যবহার করে অসাধু এই চক্র অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়েই যাচ্ছে।রাজধানীর নীলক্ষেত এলাকায় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে জাল সার্টিফিকেট প্রস্তুতকারী চক্রের ৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মো. মোখলেছুর রহমান (৩৭), মো. কামাল হোসেন (৩৮) ও মো. সোহরাব হোসেন (২২)। এদের কাছ থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা বোর্ডের জাল সার্টিফিকেট ও জাল সার্টিফিকেট তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।র‌্যাব জানায়, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-১০, সিপিসি-৩, লালবাগ ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার মেজর মোহাম্মদ আনিসুজ্জামানের নেতৃত্বে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর নীলক্ষেত এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় নীলক্ষেত ৩১ নম্বর সিটি কর্পোরেশন মার্কেট, নীলক্ষেত ডায়ালকম ইন্টারন্যাশনাল নামক দোকানের ভেতর থেকে প্রচুর পরিমাণে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, মাদ্রাসা বোর্ডের জুনিয়র দাখিল, দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিলসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ও মাস্টার্স সার্টিফিকেট, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট ও ব্যবসা প্রশাসনের বিবিএ সার্টিফিকেট, বিভিন্ন মেডিকেল কলেজসমূহের এমবিবিএস সার্টিফিকেট, প্যারা মেডিকেল বোর্ডের সার্টিফিকেট, ডেন্টাল কলেজসহ ডিপ্লোমা কলেজসমূহের যাবতীয় সার্টিফিকেট তৈরি চক্রের তিন সদস্যকে আটক করা হয়। আটককৃতদের কাছ থেকে জাল সার্টিফিকেট তৈরির কাজে ব্যবহৃত দুটি কম্পিউটার মনিটর, দুটি সিপিইউ, দুটি প্রিন্টার, একটি স্ক্যানার মেশিন, দুটি মাউস ও দুটি কী-বোর্ড, পেন ড্রাইভসহ সফট কপি ও হার্ডকপির বিভিন্ন সরঞ্জামাদি এবং পাঁচটি জাল সার্টিফিকেটের কাগজপত্রাদি উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত মো. মোখলেছুর রহমানের বাবার নাম আব্দুল খালেক হাওলাদার। পটুয়াখালী জেলার বাউফলের বৌলতলী এলাকায় তাদের বাড়ি। আর রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থানার রনি মার্কেট ১নং গলি (বিডিআর বাড়ি) মো, বাবু মিয়ার বাসার ভাড়াটিয়া বলে জানা গেছে। আর গ্রেপ্তারকৃত মো. কামাল হোসেনের বাবার নাম মৃত আব্দুল ওহাব মিয়া। চাঁদপুর জেলার মতলবের দক্ষিণ ঘোড়াধারী এলাকায় তাদের বাড়ি। আর রাজধানীর লালবাগ থানার গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ, স্টাফ কোয়ার্টারের ৫ নম্বর বাসায় তিনি থাকেন। এছাড়া, গ্রেপ্তারকৃত মো. সোহরাব হোসেনের বাবার নাম মো. সারোয়ার উদ্দিন ভুইয়া। নোয়াখালী জেলার চাটখিলের শ্রীপুর গ্রামে তাদের বাড়ি বলে জানা গেছে। র‌্যাব সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারকৃতরা দীর্ঘদিন ধরে মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের জুনিয়র সার্টিফিকেট, উচ্চ মাধ্যমিক বোর্ডের সার্টিফিকেট, মাদ্রাসা বোর্ডের জুনিয়র দাখিল, দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিলসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ও মাস্টার্স সার্টিফিকেট, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট ও ব্যবসা প্রশাসনের বিবিএ সার্টিফিকেট, বিভিন্ন মেডিকেল কলেজসমূহের এমবিবিএস সার্টিফিকেট, প্যারা মেডিকেল বোর্ডের সার্টিফিকেট, ডেন্টাল কলেজসমূহের সার্টিফিকেট, ডিপ্লোমা কলেজসমূহের যাবতীয় সার্টিফিকেট, এসএসসি ও এইচএসসিসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জাল সার্টিফিকেট তৈরি করে আসছিল। আর মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের জাল সনদপত্র, জাল ভোটার আইডিকার্ড, জাল প্রশংসাপত্রসহ বিভিন্ন ধরনের জাল দলিল ও সনদ পত্রাদি তৈরি করে ব্যবসার আড়ালে জালিয়াতি কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল চক্রটি। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে রাজধানীর নিউ মার্কেট থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।সরেজমিন নীলক্ষেতের বাকুশাহ মার্কেটে ফাইল নিয়ে রাতের দিকে ঢুকলেই অসাধু চক্র বলে, ‘সার্টিফিকেট লাগবে, কম টাকায় মূল সার্টিফিকেট পাওয়া যাবে।’ একাধিক দোকানির সঙ্গে কথা বলে জানা যায় আরও বিস্ময়কর তথ্য। পরিচয় গোপন রেখে কথা হয় একটি দোকানের এক কর্মচারীর সঙ্গে। এসএসসি ও এইচএসসির সার্টিফিকেট জরুরি প্রয়োজন হলে, দুইটার জন্য তিন হাজার আর একদিন পরে হলে দুই হাজার টাকা। এই দুইটার সঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েরটা যদি দেন, তাহলে কত টাকা লাগবে? তখন বলা হয়, পাঁচ হাজার টাকা লাগবে। পরে দরকষাকষির একপর্যায়ে তিনি প্রকৃত কাস্টমার হিসেবে বিশ্বাস করতে পারেননি। এরপর বলেন, ‘ভাই, নেয়ার সময় দেখা যাবে’- বলেই তিনি সেখান থেকে কেটে পড়েন।এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স সার্টিফিকেট প্রয়োজন বলার সঙ্গে সঙ্গেই এক দোকানদার জানান, সার্টিফিকেট ও মার্কশিট দুটোর জন্য আগে সাত হাজার টাকা লাগতো। এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারি চলছে। আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে আসল সার্টিফিকেটের কাগজ দিয়ে চার হাজার টাকায় সার্টিফিকেট করে দেয়া হতো। এখন অনেক সমস্যা হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী চক্র নীলক্ষেতের বাকুশাহ মার্কেট, গাউসুল আজম মার্কেটে অবৈধভাবে জাল সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন ধরনের নথি তৈরির কাজ করে আসছে। তবে অবৈধ কর্মকান্ডের এই স্থানটিতে প্রশাসন মাঝে মধ্যেই অভিযান চালায়। আবার চক্রের সদস্যরা গ্রেপ্তার ও জেল হাজতেও যাচ্ছে। তারা আবার জামিনে এসে একই কর্মকান্ডে পুনরায় জড়িত হচ্ছে। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের হুবহু সার্টিফিকেট তৈরি করে ওই চক্র। দেখে কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই যে সার্টিফিকেটটি নকল বা জাল। এসব অবৈধ কর্মকান্ড দিনের চেয়ে রাতেই বেশি করা হয়। দিনে কাজের অর্ডার নিয়ে রাত ৮টায় মার্কেট বন্ধ হওয়ার পর অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে চলে সার্টিফিকেট কেনাবেচার রমরমা ব্যবসা। ৩ থেকে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা সার্টিফিকেটে নাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঠিকানা বসিয়ে দেয়া হয়। দেখতে হুবহু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেটের মতোই। তফাৎ শুধু একটাই, ওই সার্টিফিকেটটির বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ, হল অফিস ও প্রশাসনিক ভবনে রেকর্ড থাকে না।সূত্র জানায়, এসএসসি পরীক্ষায় পাস করে চাকরির খোঁজে ঢাকায় আসেন অনেক হতদরিদ্র বেকার যুবক। চাকরির ইন্টারভিউর জন্য বিভিন্ন জায়গায় বায়োডাটা জমা দিচ্ছেন তাদের মতো অনেক যুবক। এসএসসি সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরি হচ্ছে তাদের। এই পরিস্থিতিতে চাকরি পেতে জাল সার্টিফিকেট সংগ্রহ করার চেষ্টা করে। এরপর তারা সন্ধান পান রাজধানীর নীলক্ষেত এলাকার। নীলক্ষেত এলাকার বাকুশাহ সুপার মার্কেট থেকে মাত্র এক হাজার টাকার বিনিময়ে সংগ্রহ করা হয় সার্টিফিকেট।আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনার্স পরীক্ষা শেষ হলেও এখনো ফল প্রকাশ হচ্ছে না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়োগ বিজ্ঞাপন দিলেও কোনোটাতেই আবেদন করতে পারেন না। এরপর তারা পরীক্ষার সার্টিফিকেটের মডেল নিয়ে নীলক্ষেতের বাকুশাহ মার্কেটের ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনার্স পাসের সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাল সার্টিফিকেট থেকে শুরু করে যেকোনো ধরনের পরিচয়পত্র তৈরিতে কম্পিউটার দোকানগুলো বিশেষ কিছু পন্থা অবলম্বন করে। বিশেষ করে ফটোশপের মাধ্যমে কম্পিউটার অপারেটররা দক্ষতার সঙ্গে কাজগুলো করে থাকেন। তাদের প্রত্যেকের কম্পিউটারে বেশকিছু সার্টিফিকেট ও কার্ডের মডেল রয়েছে। গ্রাহকের চাহিদামতো তারা এসব মডেল দিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ করেন। তাদের রয়েছে স্ক্যানার মেশিন, যা দিয়ে তারা প্রথমে একটি মূল সার্টিফিকেট স্ক্যান করেন। এরপর ওই মডেলের ওপর নাম, রোল নং, শিক্ষাবর্ষসহ সব তথ্য পরিবর্তন করে তৈরি করেন আসল সার্টিফিকেটের আদলে একটি জাল সার্টিফিকেট। পরে তা সার্টিফিকেটে ব্যবহৃত কাগজের মতো এক ধরনের কাগজে প্রেসে নিয়ে ছাপানো হয়ে থাকে। আর এই চক্রের সঙ্গে কতিপয় ছাপাখানার যোগাযোগ রয়েছে। সেখানেই তারা জাল সার্টিফিকেটগুলো ছাপিয়ে থাকেন। এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. খোরশেদ আলম আমার সংবাদকে জানান, দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট কম্পিউটারের মাধ্যমে দেয়া হয়। এই সার্টিফিকেট পৃথিবীর যে কোনো জায়গা থেকে দেখা যাবে। ফলে এটা জাল করা সহজ হচ্ছে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট আমি দীর্ঘ ৪৪ বছর ধরে হাতে লিখে ছাত্রদের দিচ্ছি। এই হাতের লেখা সার্টিফিকেটের জাল করা সহজ হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, মানুষের আঙ্গুলের ছাপ অন্য মানুষের আঙ্গুলের ছাপ মিলছে না। এটা আল্লাহর দেয়া, এই হাতের আঙ্গুলের রেখা। এটা নকল বা জাল করা সহজ নয়। এজন্য দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকেট হাতে লিখে দেয়া হলে নকল রোধ করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত