শিরোনাম

হেরেও জিতে গেল বিএনপি!

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ১০:৪৪, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৯

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নজিরবিহীন ভরাডুবি। যদিও বিএনপির দাবি, ভোট চুরি হয়েছে! তবে ভোটের দিন স্বয়ং বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদেরও ভোটকেন্দ্রে যেতে দেখা যায়নি। এর আগে নির্বাচন নিয়ে বিএনপির ভাষ্য ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না, শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবে না, খালেদাকে জেলে রেখে নির্বাচনে যাবে না। অবশেষে সবকিছু আন্দোলনের অংশ হয়ে গেল! বিএনপির বর্তমান হালচাল নিয়ে দৈনিক আমার সংবাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশেষ সংখ্যায় তথ্যবহুল ও বিশ্লেষণধর্মী কয়েকটি প্রতিবেদন ও ফিচার উপস্থাপন করেছেন আমাদের রাজনৈতিক প্রতিবেদক আবদুর রহিম

দৈনিক আমার সংবাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মুখোমুখি হয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলের রাজনৈতিক ভূমিকা কী ছিল? জনগণের অধিকার আদায়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে কার্যত কী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে? এক বছর পার হলেও এখনো মুক্তি মেলেনি খালেদা জিয়ার। এ নিয়ে বিএনপি কী ভাবছে? সাম্প্র্রতিক এমন প্রশ্নগুলো নিয়ে খোলামেলা সাক্ষাতে বিএনপির ভাষ্য, দৈনিক আমার সংবাদের পাঠকদের জন্য তা হুবহু তুলে ধরা হলো- মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এবার একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল, নির্বাচন পর্যবেক্ষক, টিআইবিসহ অনেকে প্রশ্ন তুলেছে। নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি। এ নির্বাচনকে দেশের সংকট বলে দাবি করেছেন, তাহলে দেশের এই সংকট উত্তরণে, জনগণের অধিকার বাস্তবায়নে বিএনপির কী করণীয় আছে বলে মনে করছেন? উত্তরে মির্জা ফখরুল বললেন, বিএনপি একটি পুরনো রাজনৈতিক দল। সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল। বিএনপি মোট পাঁচবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছে। প্রত্যকবারই জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সফলভাবে দেশ পরিচালনা করেছে। খালেদা জিয়াই তিন-তিনবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। দুইবার বিরোধী দলে গেছেন। বিএনপির দায়িত্ব রয়েছে বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া। এ নিয়ে বিএনপি অতীতেও কাজ করেছে, এখনো করছে। বিএনপি যেহেতু বহুদলীয় গণতন্ত্রেরও প্রবক্তা, সে জন্য খালেদা জিয়াও অতীতে ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছেন। বিএনপি সবসময় গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য কাজ করেছে। দেশে এখন যেহেতু গণতন্ত্র নেই, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে গণতন্ত্রের মৃত্যু হয়েছে। সম্পূর্ণ ভোট ডাকাতির মধ্যে দিয়ে, প্রশাসন ও দলীয় ক্যাডার দিয়ে সরকার গঠন করা হয়েছে। এখন গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করা, সুষ্ঠু রাজনৈতিক ধারাকে ফিরিয়ে আনা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে যিনি গণতন্ত্রের সেনাপতি, যিনি দীর্ঘকাল গণতন্ত্রের জন্য লড়াই-সংগ্রাম করেছেন, গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা। সকলকে সংগঠিত করে ঐক্যবদ্ধ করা এবং খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই হচ্ছে বিএনপির প্রধান কাজ ও চ্যালেঞ্জ।প্রশ্ন ছিল মির্জা ফখরুলের কাছে, এবার একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর সচেতন মহল থেকে দুটি কথা জোরালোভাবে শুনতে পাচ্ছি। প্রথমত, এ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের চরিত্র উন্মোচিত করেছে বিএনপি। দ্বিতীয়ত, খালেদা জিয়ার মুক্তি ও তারেক রহমানের দেশে ফেরা আরও দীর্ঘায়িত হয়ে পড়ল। এ নিয়ে বিএনপির ভাষ্য কী? এ নিয়ে ফখরুলের মত, আমার কাছে মনে হয় এই নির্বাচন বাংলাদেশের একটি বড় রকমের ক্ষতি হয়ে গেছে। এই নির্বাচনের ফলে মানুষের নির্বাচন প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে আস্থা চলে গেছে। নির্বাচন কমিশনের ওপর থেকেও আস্থা চলে গেছে। এই নির্বাচনের ফলে রাষ্ট্রের ওপর থেকেও আস্থা চলে গেছে। কারণ রাষ্ট্রযন্ত্রগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছে, বিভিন্ন এজেন্সিগুলোকেও ব্যবহার করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে জনগণের প্রতিপক্ষ হিসেবে রাষ্ট্রকে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। যেটা আওয়ামী লীগ করেছে। ফখরুল বলেন, শুধু আমি নই দেশের সব ধরনের সচেতন মানুষ মনে করে, এই নির্বাচন কোনো নির্বাচনই হয় নাই। ফখরুলের মতে, আমরা তো (বিএনপি) লড়াই করছি গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধারের জন্য। আমাদের লাখো নেতাকর্মীকে অন্যায়ভাবে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর মিথ্যা মামলা দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। এগুলোর পুরোপুরি অবসান চাই। সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আমরা বলছি, এ নির্বাচনকে বাতিল করে পুনরায় একটি নিরপেক্ষ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে আরেকটি নির্বাচনি ইমেজ দ্রুত তৈরি করা হোক।একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি জনগণের কাছে জিতে গেল নাকি হেরে গেল? জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপি হেরেও জিতে গেল! কারণ এবারের নির্বাচনে বিএনপি সম্পূর্ণভাবে জয়লাভ করেছে! এ নির্বাচনে বিএনপির কোনো পরাজয় ঘটেনি। পরাজয় হয়েছে আওয়ামী লীগের! তারা জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।আপনাদের দাবি বিএনপির ওপর এখনো মানুষের আস্থা আছে! সেই আস্থা অটুট রাখার জন্য দল এবং জনগণের উদ্দেশে কিছু বলার আছে কী? এমন প্রশ্নে ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আজকে সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে। ন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আপনারা ভয় পাবেন না, সারাদেশের মানুষ আপনাদের সঙ্গে আছে। বড় কথা হলো আওয়ামী লীগ জনগণের কাছ থেকে চিরদিনের জন্য দূরে সরে গেছে। সুতরাং এখন সাহস নিয়ে লড়াই করতে হবে। আজ (১২ ফেব্রুয়ারি) দৈনিক আমার সংবাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী! একটি গণমাধ্যমের ভূমিকা পালন নিয়ে বিএনপির কোনো বক্তব্য যদি থেকে থাকে? বিএনপি মহাসচিব আমার সংবাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, আমরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী! দুর্ভাগ্যজনকভাবে বলতে হয়, আজ গণমাধ্যমে কোনো স্বাধীনতা নেই। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আজকে পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশনের টকশোগুলোতে তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা বিএনপি আর ঐক্যফ্রন্টের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়ান। অথচ আওয়ামী লীগ যে ইচ্ছাকৃতভাবে রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দিলো। সংবিধানকে লঙ্ঘন করল সে বিষয়গুলো বলার সাহস তারা পান না। আমাদের প্রত্যাশা দেশের মানুষের জন্য, স্বাধীনতার জন্য, গণতন্ত্রের জন্য দৈনিক আমার সংবাদ জোরালোভাবে কাজ করবে বলে আশা রাখছি।

অবিশ্বাসের যুদ্ধখেলা
বেগম খালেদা জিয়া। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। যিনি স্বামী হারিয়েছেন বহু আগে। ওপারে চলে গেছেন ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো। আর বড় সন্তান তারেক রহমান লন্ডনে থেকেও না থাকার তালিকায়, পারছেন না দেশে আসতে। এখন বেগম জিয়ার কাছের মানুষ কেউ নেই বললেই চলে। এ পরিস্থিতিতে তিনি দীর্ঘ এক বছর চারদিন কারাগারে! নির্বাচনে গিয়ে নজিরবিহীন ভরাডুবির ঘটনাও ঘটেছে। প্রশ্ন উঠছে খালেদাকে কারাগারে রেখে দল কিভাবে চলছে? তৃণমূলের কথা কতটুকু চিন্তা করছে কেন্দ্র? সিনিয়র নেতাদের মাঝে সমন্বয়হীনতার যে আভাস তা কি প্রভাব ফেলছে? বিএনপি কী সত্যেই বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে পেরেছে? দলীয় নেতাদের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আন্দোলনে বিএনপি সম্পূর্ণ ব্যর্থতার তালিকায় রয়েছে। এ নিয়ে গত ৮ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার একটি প্রোগ্রামে কেন্দ্রীয় নেতারাও ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছেন। দীর্ঘ ১২ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে বিএনপি শেখ হাসিনাকে মোকাবিলা করতে পারেনি। তৃণমূলের ভাষ্য, বিডিয়ার বিদ্রোহ, ৩টি সরকারি ব্যাংকে বড় রকমের দুর্নীতি, পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ, জঙ্গি ইস্যু, মাদক নিয়ন্ত্রণে ক্রসফায়ার এমন কোনো ইস্যুতে বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারেনি। জনগণের হয়ে ভূমিকা পালন করতে পারেনি। সরকারের গতি বুঝে কোনো কার্যত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। বিশেষ করে, খালেদা জিয়ার রায়ের আগে-পরেও যদি ধরা হয়। খালেদার জিয়ার রায়কে কেন্দ্র করে সরকারের ভূমিকা আগে থেকেই স্পষ্ট ছিল। ৮ ফেব্রুয়ারি রায়ের আগে-পরে বিএনপি যেন আন্দোলন করতে না পারে পুলিশ অ্যাকশন দেখে ঠিকই বোঝা গিয়েছিল। কেননা তখন ঘটনা ঘটছে ঢাকায়, পুলিশ বিএনপি নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করছে সারাদেশে। শান্তিপূর্ণ বৈঠকেও নেতাকর্মীদের আটক করা হয়েছে। বিএনপি প্রধানের নিরুত্তাপ গাড়িবহর থেকেও আইনজীবী ও নেতাদের আটক করা হয়েছিল। দেশব্যাপী চলেছিল গ্রেপ্তারের মহোৎসব। সরকার তার নির্দিষ্ট ছকে সবকিছুই সম্পন্ন করল। শুধু কিছুই করতে পারেনি বিএনপি। খালেদাকে কারাগারে রেখে নির্বাচন হলো। বিএনপিও অংশগ্রহণ করল। ড. কামালকে নিজেদের ঘরে আনায় তৃণমূলের বড় একটা অংশ অনেক দূরে সরে গেল। যারা মাঠে আন্দোলন করেন। যাদের জন্যই বিএনপির ঠিক থাকা সেই তৃণমূলের কথা কিঞ্চিৎ ভেবেছে কিনা সেটাই সন্দেহ। কারণ তৃণমূলের কথা ভাবতে গেলে বিএনপিকে যেতে হয় আন্দোলনে! সে আন্দোলনে বিএনপি কেন যেতে পারে না। এর পেছনে রয়েছে অনেক গল্প! কারণ দলের ভেতরে অনেক স্বার্থবাদী চরিত্রের লোকই বেশি। এটি স্বয়ং খালেদা জিয়াই জানতেন। কিন্তু নিতে পারেননি কার্যত পদক্ষেপ। কারাগারে যাওয়ার কয়েকদিন আগে রাজধানীর হোটেল লা মেরিডিয়ান হোটেলে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেদিন দলের ভেতরে থাকা দ্বিমুখী লোকদের বার্তা দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। সেখানে বিএনপির জন্য এসেছেও আদর্শিক পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত। সেদিন তৃণমূলের নেতারা বলেছিলেনও, আন্দোলন শুরুর আগেই বিশ্বাসঘাতকদের চিহ্নিত করতে, না হলে আবার বিপদে পড়তে হবে। কারণ বিএনপির কোনো নেতা সরকারের কাছ থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের করে সুযোগ পাচ্ছেন, ব্যাংক লোন মওকুফ পাচ্ছেন, বিএনপির কোনো নেতা সরকারের সাথে বৈঠক করছেন, ইত্যাদি সব খবর তৃণমূল নেতারাও রাখেন বলে জানিয়েছেন। তবে তৃণমূলের আস্থায় বিএনপি নেত্রীও বলেছেন যথার্থ। ‘যারা বেইমানি করবে, যারা এদিক-ওদিক, এক পা এদিক অন্য পা অন্যদিকে রাখবে তাদের চিহ্নিত করা যাবে। এদের মূল্যায়নের জায়গা থাকবে না। এদের তারাও (সরকার) নেবে না, আমরাও নেবো না। আমরা আগে একবার ক্ষমা করেছি, ক্ষমা বারবার হয় না। আমি খোঁজ রেখেছি যারা অতীতে আন্দোলন করেছে, দলের জন্য কাজ করেছে, দলের সাথে বেইমানি করেনি তাদের ভবিষ্যতে ভালো জায়গা দেয়া হবে। যদি বিএনপি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে তাদেরও মূল্যায়ন করা হবে।’ এমন কথা বলে খালেদা জেলে গেল। এক বছর পূর্ণ করল। দলের ভেতরে প্রশ্ন, সেই বেইমানরা কি চিহ্নিত হলো? স্থায়ী কমিটিসহ অনেক নেতাই তৃণমূলের কাছে সন্দেহের চোখে। যারা অতীতে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ বানিয়েছে। এখন সেই সম্পদ রক্ষা করতে সরকারের সাথে সমঝোতা করে। ওই লোকদের দিয়ে কি বিএনপি কোনো আলোর মুখ দেখবে? দলের ভেতরে গুপ্তচর আছে! যার কারণে কোনো তথ্যই আর গোপন থাকে না এটি এখন স্পষ্ট। যার ফলে পদে পদে বিএনপির ব্যর্থতার প্রতিধ্বনি। এ নিয়ে মুখ খুলছেন সিনিয়র নেতারাও।এতদিন চুপ থাকলেও এখন সিনিয়র নেতাদের সামনে রেখে অনেক নেতাই মুখ খুলছেন। গত ৮ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপি আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে অনেক নেতাকে প্রকাশ্যে বলতে শোনা গেছে ‘রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে’ কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে গত এক বছরে ‘নির্যাতন উপেক্ষা’ করে রাজপথের আন্দোলন জোরদার করতে বিএনপি ব্যর্থ হয়েছে। নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করে এ অবস্থায় নেতারা বলেন, আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা সম্ভব হবে না। রাজপথে আন্দোলন ছাড়া তার মুক্তিও সম্ভব নয়। নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির নেতাদের উচিত, দ্রুত সিনিয়র নেতাদের নিয়ে বৈঠক করে কর্মসূচি নির্ধারণ করা। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হলে হরতালসহ রাজপথের শক্ত কর্মসূচি দিতে হবে। কারাবন্দি নেতা খালেদা জিয়ার বরাত দিয়ে অনেক নেতা বলে থাকেন, ম্যাডাম হরতাল-অবরোধ দিতে নিষেধ করেছেন, এ কথা মানা যাবে না।সমাবেশে বিএনপি নেতারা বলেন, খালেদা জিয়ার মতো দেশের জনপ্রিয় নেতাকে এক বছর ধরে কারাগারে থাকতে হবে, এটা আমরা চিন্তা করতে পারিনি। কেন আজ আমাদের ঘরের মধ্যে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য কর্মসূচি করতে হবে? খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে গেলাম; এখন সে আন্দোলন কোথায়? একটা কথা স্পষ্ট খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা না গেলে বিএনপি ঘুরে দাঁড়াবে না। তাই খুব দ্রুত দলকে পুনর্গঠন ও নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন করতে হবে। তা হলেই কেবল আন্দোলনের মাধ্যমে নেত্রীকে মুক্ত করে আনতে পারব। স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘এক বছরে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে পারিনি। আমরা ব্যর্থ। নেত্রী আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। আসছে আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপিকে নেতৃত্ব দিতে হবে। নিজেরা বাঁচতে চাইলেও আন্দোলন করতে হবে।’ আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার মুক্তি অর্জন সম্ভবপর হবে না। আন্দোলন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। যদি আপনারা বেগম জিয়াকে মুক্ত করতে চান, তা হলে আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি নিন। এ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, এই যে আমার ভাইয়েরা এখানে আছেন, হাজার হাজার নেতাকর্মী আছেন, তারা আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত। আমরা যারা নেতৃত্বে আছি, আমরা সফল হইনি। আন্দোলনে আপনাদের যে শক্তি আছে, সেই শক্তিকে আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। আসুন সবাই যে দলকে আমরা ভালোবাসি, যে নেত্রীর জন্য আজকে সভা করছি, আমাদের পর্যায়ে মাথা হেট হয়ে যায়, এত বড় একটা আমাদের সংগঠন, এত বড় জনসমর্থন, সেই দলের নেত্রী তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দলের নেত্রী আজকে এক বছর জেলখানায় আছেন। এটা ভাবতেও চোখের পানি চলে আসে।

জামায়াত হারিয়ে গেছে, বিএনপির কী ক্ষতি হবে
জনগণের দাবি আদায়ে বিরোধীদলের ভূমিকা পালনে বিএনপি অনেকটাই ব্যর্থ। আছে নিজেদের শক্তিশালী ২০ দলীয় জোট। তবুও নির্বাচনের আগে গায়েবি লোভে নিজেদের সংসারে নিয়ে আসে ড. কামালকে। অন্যদিকে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ ব্যক্তিদের পাশ কাটিয়ে জামায়াতকে দেয়া হয় বেশি সংখ্যক আসন। প্রশ্নবিদ্ধ এই দলটিকে দেয়া ২৫টি আসনে ধানের শীষের প্রতীক। দলটির কয়েকজন নেতার ভাষ্য, বিএনপির ধারণা ছিল ড. কামাল হোসেন আন্তর্জাতিক শক্তির মাধ্যমে বিএনপিকে ক্ষমতায় এনে দেবে আর জামায়াতে ইসলামী ২০১৩-১৪ এর মতো রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ঠেকাবে। কিন্তু দিন শেষে দুই কূলই হারাতে হয়েছে! শরিক ২০ দলের চাইতেই বিএনপির কাছে যে জামায়াত এত প্রিয় সেই জামায়াত হঠাৎ হারিয়ে গেছে! কথা ছিল গণমাধ্যমে বিবৃতি কিংবা অজ্ঞাত স্থান থেকে গণমাধ্যমকে ভিডিও বার্তা পাঠিয়ে হারাবে কিন্তু সেটাও না করে সব কিছুই গোপনে তুলে নিয়েছে। এরই মধ্যে অনলাইন থেকে জামায়াত তাদের সব ধরনের তথ্য সরিয়ে নিয়েছে। দলীয় নামে যে ওয়েবসাইটসহ আরও কিছু কিছু সাইট ছিল তাও সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ফের সরকার গঠন করায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে অনেকের মত। কিন্তু জামায়াত এভাবে হারিয়ে গেলে বিএনপির কী ক্ষতি হতে পারে এবং জামায়াতের লাভ কি রাজানীতি পাড়ায় এই প্রশ্নটা খুব জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ ১২ বছর রাজনীতির মাঠে খুব কঠিন সময় পার করছে দলটি। হারিয়েছে দলের শীর্ষ নেতাদের। বহুদিক মোকাবিলা করে জামায়াত এখন খুবই ক্লান্ত। যদিও বিএনপির নেতৃত্বে জোটে ২০ বছর থেকেও কঠিন সময়ে তাদেরও পাশে পাওয়া যায়নি। জামায়াতের ফাঁসির দ-প্রাপ্ত নেতাদের নিয়ে কেউ মুখ খুলেনি। যেমনি দলটি আওয়ামী লীগের ওপর ক্ষোভ তেমনি বিএনপির ওপরও। কারণ বিএনপি জোটে আছে, এখনো সেই বিএনপিই জানে না জামায়াত কিভাবে রাজনীতির মাঠ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। আর কেনই বা গুটিয়ে নিচ্ছে। এরই মধ্যে বিএনপির মধ্যে বিশ্লেষণ শুরু হয়ে গেছে জামায়াত হারিয়ে গেলে বিএনপির লাভ-ক্ষতি কী? তবে বিএনপির অনেকে মনে করছেন এতে ক্ষতির দিকই বেশি। জামায়াত দীর্ঘ সময় হারিয়ে গিয়ে অদৃশ্যভাবে যে কর্ম করবে এবং সাংগঠনিক রূপ নিয়ে কোনো সময় মাঠে এলে বিএনপি জামায়াতকে মোকাবিলা করাই কষ্ট হয়ে যাবে। এখনো জামায়াতের যে সাংগঠনিক অবস্থা, দলীয় শৃঙ্খলা আছে তা বিএনপির মাঝে নেই। এখনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ২০ দল থেকে যে পরামর্শ আসে তাতে জামায়াতের পরামর্শই বেশি অগ্রাধিকার পায়। বিএনপি মনে করে জামায়াতের কথা একক ব্যক্তির নয় পুরো দলের। আর ২০ দলীয় জোটের অন্য সদস্যদের কথা ব্যক্তিগতই বেশি। এখন জামায়াত কী করবে, করছে? মৌলিক প্রশ্নটির খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএনপি থেকে জামায়াত দূরত্ব তৈরি করছে। জামায়াতে ইসলামী দলের নামে ভবিষ্যতে আর কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। এই নামে জাতীয় আর কোনো কার্যক্রম করবে না। অল্প দিনের মধ্যেই জামায়াতে ইসলামী বিএনপির নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোট থেকেও বেরিয়ে যেতে পারে এমন একটি কথাও শোনা যাচ্ছে। তবে কৌশলগত কারণে যেহেতু জামায়াত এখনো আনুষ্ঠানিক দল না থাকার ঘোষণা দেয়নি সেহেতু রাজনৈতিক অবস্থা বোঝার জন্য টিকে থাকার কৌশল নিচ্ছে বলে গতিবিধির ওপর ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। আপাতত জামায়াত তাদের সাংগঠনিক শক্তি আরও মজবুত এবং সমাজ বিনির্মাণে মনোযোগ দেবে। তারা ইতোমধ্যে ৪৫ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। রাজনীতির মাঠ থেকে নিজেদের পুরোপুরি গুটিয়ে আগামী এই ৪৫ বছর শুধু সামাজিক কাজ ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে তৎপর থাকবে। তথ্য মতে, তারা প্রশাসনে, সেনাবাহিনীতে এবং জাতীয় পর্যায়ে দক্ষ জনবল সৃষ্টি করবে।জামায়াতের তরুণ প্রজন্মদের দাবি, অনেক দিন ধরে দলটির স্বাভাবিক কোনো কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছে না। এ ছাড়া জামায়াত পরিচয়ে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়তেও ব্যাপক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হচ্ছে। ২০১৩-১৪ এর হরতাল অবরোধে জালাও-পোড়াও কর্মকা-ে নিজেদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। হারিয়ে গিয়ে কলঙ্ক মুছে কৌশলগতভাবে বিভিন্ন সেক্টরে দক্ষ জনবল তৈরিতে মনোযোগী হবে। ক্যারিয়ার গঠন করবে জনশক্তির। এই সময়টাকে তারা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিচ্ছে। আর তাদের হারিয়ে যাওয়ার পেছনে আওয়ামী লীগ বিএনপিসহ অনেকের জন্য খারাপ কিছুও অপেক্ষা করছে বলে অনেকের মত। কারণ তারা দক্ষ লোক তৈরি করে আগামীতে বাংলাদেশের নেতৃত্বই প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন।

পল্টন অফিস কী রিজভীতে চাঙ্গা, নাকি...
বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিসে এখন প্রাণ আছে। উড়ে নেতৃত্বের রঙিন বেলুন। সাথে আছে নষ্ট ফুলের ঘ্রাণ! বেশ ভালোই চলছে এলোমেলো পরিচর্যা। বলা চলে নিজেদের আখের খোলার ব্যাংকটা এখন বেশ জমজমাট। লোকে তাদের ভিরু-কাপুরুষের উপমায় দাঁড় করালেও এখনো স্লোগানে স্লোগানে হয় তাদের কথোপকথন। আছে ব্যর্থতার কিচির-মিচিরও। যেহেতু রাজার বিছানা আছে সেহেতু প্রজার ইচ্ছাটাও বক্রসতেজ দাবি রাখে। পুষ্টতার জোশ, নির্যাতন-কষ্ট বুকে নিয়ে নির্দোষ সন্ত্রাসের মনিবের কাছে ধরনা। দলে বিজ্ঞদের মতে, অসময়ে অন্ধকারে এটি তাদের ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতা। চাওয়া-পাওয়া শুধু বড় নেতার একটু হৃষ্টপুষ্ট দৃষ্টি। তাতেই মিলে যাচ্ছে বহু কিছু। এমন চরিত্র নিয়ে আসা ব্যক্তিদেরই খুলছে কপাল। কিন্তু যাদের ব্যক্তিত্ব আছে, চাটুরতার অভিজ্ঞতা নেই তাদের যোগ্যতা, মেধা ও অভিজ্ঞতা যাচ্ছে বুড়িগঙ্গায় এমন অভিযোগও রয়েছে! কারণ এখন ফোনে ভাইকে যে ম্যানেজ করতে পারে তার কপালই খুলছে! এবার আসি বাস্তবে, গত ৫ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টার দৃশ্য! তখন পল্টন অফিসের দ্বিতীয় তলায় চলছে রিজভীর সঙ্গে কোনো এক নেতার বৈঠক! দৈনিক আমার সংবাদের সপ্তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে একটি সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে অপেক্ষা। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর রিজভী এলেন। সাথে ছিলেন আরও দুজন নেতা। পরিচয় করিয়ে দিলেন! প্রথম পরিচয় বিধায় শেষ পর্যন্ত তাদের নামটা মনে রাখা গেল না। আসা মাত্র হাতে তুলে দিলাম ওই দিনের আমার সংবাদের এক কপি পত্রিকা। লিড নিউজ ছিল সরকারি জোটে দ্রোহের আগুন! এটি ৫ মিনিট খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ে রিজভী বললেন, ভালো নিউজ। এরপর খেতে বসলেন রিজভী! ঢাকনা দেয়া খাবার দেখে মনে করেছিলাম খুব খাবার হবে। কিন্তু ঢাকনা উল্টাতেই দেখা গেল শুধু ডাল আর ডিম! অন্য দুজন হাত দিয়ে খাবার শুরু করলেন আর রিজভী শুরু করলেন চামুচ দিয়ে। ওইদিন বিদায় নিয়ে চলে এলাম। এর পরদিন ফের সকাল ১০টায় পল্টন অফিসে গেলাম। মিনিট দশেক পরে শুরু হবে রিজভীর নিয়মিত ব্রিফিং! আজ সংবাদ সংগ্রহ না করে এই সময় বাইরের দৃশ্য দেখার খুব ইচ্ছা জাগলো! যখন ভেতরে ব্রিফ চলছে তখন বাইরে অনেক নেতাকর্মী চা, সিঙ্গারা, বিড়ি খেয়েই সময় কাটাচ্ছেন। এত নেতাকর্মী দেখে ঘুরে-ফিরে তাদের কিছু ভাষ্য শোনার ইচ্ছা জেগেছে। তার আগে পার্টি অফিসের আশপাশে আড্ডাখানার কিঞ্চিৎ বর্ণনা দিই। মূল গেটের ডান পাশে লাইব্রেরি। তার পাশে ফুটপাতে একটা সিঙ্গারা দোকান। সিঙ্গারার সাইজ ছোট হওয়ায় মাত্র তিন টাকায় তা মিলছে। আড্ডাটা এখানেই জমে বেশি। ৫-১০টা সিঙ্গারাও খেতে দেখা গেছে একেকজনকে। প্রতিটি নেতার পেছনেই ১০-১৫ জন কর্মী। তাই বিক্রেতার দম ফেলারও ফুরসত নেই। দুপুরে একই দোকানে ৩০ টাকায় খিচুড়িও পাওয়া যায়। এর পাশে ছোট টেবিল নিয়ে ফুটপাতে বসেছেন লোড দোকান। যার মূল টার্গেটই বিএনপি অফিসে আসা নেতাকর্মীরা। এর পাশেই মুচি দোকানে কিছু নেতাকর্মীকে জুতা পালিশ করাতেও দেখা গেছে। পাশেই পূবালী ব্যাংকের এটিএম বুথ। আনুমানিক হাত দশেক পরেই বার্গার কিং নামের একটি দোকান রয়েছে ফুটপাতে। সৌখিন নেতাকর্মীরা এখানে বেশ ভালোই ঢুঁ মারেন। এর একটু পরই একটি টঙের চা দোকান। শুধু আদা দিয়েই চা বিক্রি হয়। পল্টন অফিসের নিচে অপেক্ষারত যে যা কিছুই খান না কেন. সবাই রং চা খেতে এখানে ঠিকই ছুটে আসেন। চায়ের দামও সীমিত, মাত্র ৫ টাকা। এ দোকানে আবার কলা, পাউরুটি, বিস্কুট ইত্যাদি থাকায় সবসময় বেশ জমে ভালো। দুপুর ১টা ১০ মিনিটে এই চায়ের দোকানে আড্ডা আর সমালোচনার বেশ ঝড় উঠেছে। শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন তৃণমূল থেকে আসা এসব নেতাকর্মীরা। তারাও দলবেঁধে এসেছেন পল্টনের নেতাদের সন্তুষ্ট করতে। নদীর ওপারের লোকজনও জেনে গেছেন যোগ্যতা আর এলাকায় যত ত্যাগ থাকুক না কেন, শীর্ষ নেতাদের নজরে আসতে না পারলে ভারী পদ মেলে না। তাই গতিপথ রক্ষায় তাদের ঢাকায় আগমন। তারা শুনেছেন নির্বাচনে পরাজয়ের পর বিএনপি পুনর্গঠন চলছে। ইতোমধ্যে আইনজীবী পরিষদ, ড্যাবের কমিটি গঠন হয়ে গেছে। পর্যায়ক্রমে সবই হবে। এরপর স্থান ত্যাগ করে পল্টন অফিসের বাম পাশে এলাম। এখনে রয়েছে হোটেল ভিক্টোরিয়া নামক একটি হোটেল। নিচে রয়েছে পর্যাপ্ত জায়গা। এখানেও দলবেঁধে কিছু নেতাকর্মীকে আড্ডা দিতে দেখা গেছে। এর পাশেই গলি। এখানে সবসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উপস্থিত থাকে। গলির মাথায় ছোট্ট টেবিল নিয়ে সিগারেট দোকান বসিয়েছেন এক ব্যক্তি। পুলিশ-নেতাকর্মীর সবার সিগারেটের স্বাদ মেটাতে এই জাতীয় মামাই সবার ভরসা। এর পাশেই রয়েছে প্রজাপতি স্টোর নামক আরেকটি দোকান। এখানে বিকাশ, লোড, ডায়েরি-কলম সবই পাওয়া যায়। এই দিকে (বাম পাশে) খুব একটা লোকজনের সরগম নেই। নিচে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক ঘুরাফেরার পর উপরে উঠলাম। এখনো সেই আগের মতো দৃশ্য। ভেতরে ফখরুলের নেতৃত্বে বৈঠক চলছে অন্যদিকে অপেক্ষমাণ নেতারা। মিনিট দশেক পর ফের পল্টন অফিস থেকে স্থান ত্যাগ করে নিজ অফিসে চলে এলাম। সন্ধ্যায় বৈঠকের খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি খালেদা জিয়ার মুক্তি, আন্দোলন, নির্বাচনকালীন সময়ে দলের ভূমিকা, চলমান ইস্যুতে দলের নেতাদের প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকা- নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিছু নেতাকে সতর্ক করা হয়েছে এবং তৃণমূলে স্থানীয় নেতাদের মতামতের গুরুত্ব দিতে জোর দাবি জানানো হয়েছে। এ ছাড়াও ঢাকায় আলাদা আন্দোলনের রূপরেখা তৈরিতে উপস্থিত নেতাদের মতামত নেয়া হয়েছে। তবে এখন পল্টন কার্যালয়ে শুধু রিজভী কথা বলেন না। ওপার থেকে তারেক রহমানো সম্পৃক্ত হোন! আগে শোনা যেত শুধু রিজভীর সাথেই ভাইয়ের কথা হতো কিন্তু এখন দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। জানা গেছে, গত শনিবার ৯ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় বিএনপির প্রার্থী হিসেবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়া নেতাদের সঙ্গে স্কাইপিতে বৈঠক করেছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকে যোগ দিতে বিকাল ৫টার দিকে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে একে একে প্রবেশ করেন নেতারা। ২০ জেলার সব প্রার্থীকে নিয়ে দুই দফায় চলে বৈঠক। প্রথম ধাপে ১০ জেলার প্রার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করেন তারেক রহমান। পরে সন্ধ্যা ৭টার দিকে দ্বিতীয় ধাপে আরও ১০ জেলার নেতারা বৈঠকে যোগ দেন। বৈঠকে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, ব্যারিস্টার ইরফান ইবনে আমান অমি, শরিফুল আলম, আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন, জি কে গউছ, আজিজুল বারী হেলাল, লুৎফর রহমান কাজল, মিজানুর রহমান চৌধুরী, হাজি মুজিব, শামা ওবায়েদ, মিজানুর রহমান মিনু, জয়নুল আবদিন ফারুক, রফিকুল আলম মজনু, মাইনুল ইসলাম খান শান্ত প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

টিআইবি ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের ভাষ্যে বিএনপি খুশি!
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের প্রধানের দেয়া সাক্ষাৎকার নিয়ে বিএনপি এত খুশি কেন? যে দুটি প্রতিবেদন নিয়ে বিএনপি পাড়ায় এত উত্তেজনা। এ দুটি প্রতিবেদন নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকেও সন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয়েছে। জানা যায়, যুক্তরাজ্যভিত্তিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের প্রধান মোহাম্মদ আব্দুস সালাম বলেন, নির্বাচনের আগের রাতে আওয়ামী লীগের কর্মীরা ব্যালট বাক্স ভরে রেখেছেন এবং ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছেন। ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার ও ভোটারদের কাছ থেকে নির্বাচনের এমন বিবরণ শোনার পর তার কাছে এখন মনে হচ্ছে, নতুন করে নির্বাচন হওয়া দরকার।সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি ৭৫ বছর বয়সি আব্দুস সালাম বলেন, এখন আমি সবকিছু জানতে পেরেছি এবং বলতে দ্বিধা নেই, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। ফাউন্ডেশনের হয়ে কাজ করা এক কানাডীয় পর্যবেক্ষক বলেন, তার কাছে এখন মনে হচ্ছে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অংশ না নিলেই বোধ হয় ভালো হতো। আব্দুস সালাম বলেন, তাদের পর্যবেক্ষকরা মাত্র কয়েকটি নির্বাচন কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করেছেন। কাজেই এতে নির্বাচন যে অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে, তা পরিষ্কারভাবে মূল্যায়ন করা যায় না। তিনি বলেন, কয়েকজন প্রিসাইডিং অফিসার তাকে বলেছেন, ব্যালট বাক্স ভরতে তাদের বাধ্য করা হয়েছে। আব্দুস সালাম বলেন, আমি সত্য বলতে চাই।কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ পেতে আমি এসব বলছি না। এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ৫০ আসনে জরিপ চালিয়ে ৪৭টিতেই অনিয়ম দেখতে পেয়েছে তারা। এতে বিশেষ করে জাল ভোট, জোর করে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরা, ভোটকেন্দ্রে বিরোধী দলীয় এজেন্ট ও ভোটারদের ঢুকতে বাধা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। বার্লিনভিত্তিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি জানায়, তাদের জরিপ করা সব এলাকাগুলোয় নির্বাচনি প্রচারে কেবল ক্ষমতাসীন দলটিই সক্রিয় ছিল। কখনো কখনো স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সরকারি সম্পদের সহায়তা নেয়া হয়েছে। বিশ্বাসযোগ্যতার অভাবের কথা বলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তদন্ত নাকচ করে দিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম সংস্থাটিকে বিরোধী দল বিএনপির ‘পুতুল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।এ নিয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আঁতে ঘা লেগেছে। এ প্রসঙ্গে তার ভাষ্য, টিআইবির প্রতিবেদনে মহা সত্য প্রকাশ হয়েছে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে টিআইবির এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ‘টিআইবি অলীক গল্প সাজিয়েছে।’ তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ টিআইবির প্রতিবেদনকে ‘একপেশে, মনগড়া ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য যথেষ্ট বলে’ মন্তব্য করেছেন। টিআইবির এই প্রতিবেদনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদন ভিত্তিহীন। বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রিজভী দাবি করেন, টিআইবির রিপোর্টে ভোট ডাকাতির মহা সত্য প্রকাশ হওয়ায় সরকারের মন্ত্রীরা ও নির্বাচন কমিশন মুখ লুকাতে পারছে না। সে জন্য আর্তচিৎকার করে সত্য লুকানোর চেষ্টা করলেও কোনো লাভ নেই। মানুষ যা জানার নির্বাচনের আগের দিন রাত থেকেই জেনেছে। রিজভীর ভাষ্য, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিভিন্ন সংগঠন এই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্বের নানা গণতান্ত্রিক দেশ বলেছে, এই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ। তারা এই নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেয়নি। তদন্ত দাবি করেছে। রিজভী বলেন, ক্ষমতা চিরদিনের জন্য আঁকড়ে ধরে নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে ভোটারদের ভোট দেয়া থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত