শিরোনাম

হারবাল ল্যাবরেটরিতে নেশার সিরাপ উৎপাদন

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল লতিফ রানা  |  ০০:১৬, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৯

মাদকদ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীসহ সারাদেশে ঠাণ্ডা-কাশির সিরাপকে নেশার বস্তু হিসেবে বেছে নিয়েছে মাদকসেবীরা। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার কথিত হারবাল ল্যাবরেটরিতে এসব নেশা ও ভেজাল সিরাপ উৎপাদন করা হচ্ছে। অতিরিক্ত মুনাফার আশায় কোনো প্রেসক্রিপশন ছাড়াই এ ধরনের ওষুধ বা ভেজাল ইউনানি সিরাপ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিক্রি করা হচ্ছে। আর এসব কাশের সিরাপ খেয়ে অনেক শিশুসহ বয়স্ক লোকজনও মারা যাচ্ছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ওষুধ প্রশাসনের লোকজনের সহযোগিতায় এসব ইউনানি ল্যাবরেটরিতে সিরাপ ও নেশার সিরাপ তৈরি করা হচ্ছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। আর মাদকসেবীরা এখন ডেক্সপোটেন সিরাপ, অফকফ, সুডুকফ, তুসকা, ফেনারগ্যান, ডায়ড্রিলসহ বিভিন্ন ঠাণ্ডা-কাশির সিরাপ বেশি খাচ্ছে। গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার বহুলবাড়িয়া গ্রামে হারবাল ওষুধ পান করে এক শিশুসহ দুইজন মারা গেছে। এ ঘটনায় আরও একজন গুরুতর অসুস্থ হয়ে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। নিহতরা রাজধানীর নবীন হারবাল ল্যাবরেটরিদে উৎপাদিত সিরাপ খেয়ে মারা গেছেন বলে অভিযোগে জানা গেছে। এ ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কয়েকজন কর্মকর্তা গিয়ে ওই কারখানাটি বন্ধ করে দিয়েছে। বাড়িটির সিকিউরিটি গার্ড আব্দুস সালাম মৃর্ধা এ তথ্য জানিয়েছেন। সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী দক্ষিণ শেখদির ৪ নম্বর রোডস্থ ১০/১ নম্বর অধ্যক্ষ এরশাদুল্লাহ সড়কের বাড়িতে ওই ল্যাবরেটরি। চারপাশে নোঙরা পরিবেশ আর মাদকাসক্তদের ভিড় দেখা গেছে। কারখানার মালিক এস কে চৌধুরী ওরফে কাজল চৌধুরী। তিনি ওই ভেজাল ও নেশার সিরাপের ব্যবসা করে কোটিপতি বনে গেছেন। ১৯৮৩ সাল থেকে ওই কারখানায় হারবাল সিরাপসহ নেশার ওষুধ তৈরি করে সারা দেশেই সরবরাহ করে আসছিল। সূত্র জানায়, গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে কুষ্টিয়ার বহুলবাড়িয়া গ্রামের ইটভাটা শ্রমিক নবাব কয়েক মাস আগে স্থানীয় বাজার থেকে একটি হারবাল সিরাপ ক্রয় করেন। ওই সিরাপটি খাওয়ার পর থেকেই শরীরে নানা পার্শ্বপ্রক্রিয়া দেখা দেয়। ঘটনার দিন রাতে নবাব ও তার ৯ বছরের মেয়ে শামীমা হারবাল এ সিরাপটি খায়। তাদের দেখাদেখি পাশের বাড়ির নুর মুহাম্মদ (৫০) সিরাপ পান করে। এর ২০ মিনিট পরই তারা তিন জন অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর মধ্যে বাড়িতেই নুর মুহাম্মদ ও শামীমা মারা যান। আর গুরুতর অসুস্থ নবাবকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনার পর ময়না তদন্তের জন্য নুর মুহাম্মদের মরদেহ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবারের সদস্যরা। এ ঘটনার পর কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. তাপস কুমার সরকার বলেছেন, ‘রাতে হারবাল ওষুধ পান করে নুর মুহাম্মদ একজনকে হাসপাতালে নিয়ে আসে। তবে হাসপাতালে আসার আগেই তিনি মারা যান। এ ছাড়া একটি শিশু মারা গেছে। বিষয়টি কেমিক্যাল পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হবে। তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে আসবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেখদির এক ব্যক্তি জানান, নবীন ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত সিরাপ মাদকাসক্তরা অল্প খরচে পায় বলে কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী বিনা প্রেসক্রিপশন এবং গোপনে প্রতিনিয়ত তা বিক্রি করছেন। এভাবে অতিরিক্ত মুনাফা হাতিয়ে নিয়ে তারা যুবসমাজসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। ফেন্সিডিল আর ইয়াবার দাম এখন অনেক বেশি। এ জন্য মাদক হিসেবে সিরাপকে বেছে নিয়েছে মাদকসেবীরা। ভেজাল ওষুধ খেয়ে এর আগেও অনেক শিশুসহ বয়স্ক ব্যক্তি মারা গেছেন। এসব ঘটনায় মামলা দায়ের করা হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া হয় না। ফলে ভেজাল ওষুধ তৈরির কারাখানায় ভেজাল ওষুধ উৎপাদন থামছেই না। সম্প্রতি প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে শিশুমৃত্যুর অভিযোগে দায়ের করা এক মামলায় মেসার্স পলিকেম ফার্মাসিটিক্যালস লিমিটেডের পরিচালক আব্দুর রবের এক বছরের কারাদ-ের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে আসামিকে কারাদ-ের পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা অর্থদ- অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদ-ের আদেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি ওই মামলার অভিযুক্ত অন্য দুই ফার্মাসিস্ট ও ম্যানেজারের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস দেয়া হয়েছে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ড্রাগ আদালতের বিচারক সৈয়দ কামাল হোসেন এ রায় দেন।জানা গেছে, ১৯৯২ সালের ১৯ ডিসেম্বর পলিকেম ফার্মাসিউটিক্যাল ভেজাল প্যারাসিটামলে শিশুমৃত্যুর অভিযোগে মামলাটি দায়ের করেন তৎকালীন ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক মো. আবুল খায়ের চৌধুরী। মামলাটির অভিযোগে বলা হয়, শেরেবাংলা নগর শিশু হাসপাতালে প্যারাসিটামল সেবনে করে অনেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। ১৯৯৩ সালের ৬ মার্চে মামলাটিতে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন। চার্জ গঠনের আদেশের বিরুদ্ধে আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করায় প্রায় ২০ বছর মামলার বিচারকাজ স্থগিত ছিল। এরপরও ২০১৫ সালের মামলার বিচারকাজ শুরু করেন। ওই মামলায় তিনজনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে রায় ঘোষণা করা হয়।ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার নবীন ল্যাবরেটরির জেনারেল ম্যানেজার মো. হাসান আমার সংবাদকে জানান, কুষ্টিয়ার ঘটনার পর ড্রাগসের লোকজন এসে কারাখানায় তালা দিয়ে বন্ধ করে দিয়ে গেছেন। এখন কারাখানায় কোনো ওষুধ উৎপাদন করা হচ্ছে না বলে জানান তিনি।এ ব্যাপারে কুষ্টিয়ার মিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবুল কালাম বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, হারবাল ওষুধ পান করে বিষক্রিয়ায় দুইজন মারা গেছে। এ ঘটনায় কেমিক্যাল পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ওই পরীক্ষার রিপোর্ট এখনো আসেনি। আর যে দোকান থেকে ওষুধ ক্রয় করা হয়েছিল, সেই দোকানদারকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইন্সপেক্টর সৈকত কুমার কর আমার সংবাদকে জানান, কুষ্টিয়ার ঘটনায় স্থানীয় থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তারও করেছে। আর নবীন হারবাল ল্যাবরেটরির সেই সিরাপের স্যাম্পল সংগ্রহ করা হয়েছে। আর তা পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে। ওই ল্যাবরেটরির পরীক্ষার রিপোর্টের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত