শিরোনাম

ডিজিটাল চেক ডিজিটাল চেক জালিয়াতি

প্রিন্ট সংস্করণ॥হাসান-উজ-জামান  |  ০০:১২, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৯

দেশে নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠান প্রবাসীরা। টাকা জমা হওয়ার পরপরই সেই টাকা ট্রান্সফার হয়ে যায় কোনো দুষ্টু নারীর অ্যাকাউন্টে। সেখান থেকে টাকা তুলে নিয়ে যায় তৃতীয় পক্ষ। নিজের স্বাক্ষরিত চেকে টাকা ট্রান্সফার হলেও কিছুই জানে না প্রবাসীরা। যখন জানতে পারেন, তখন তাদের মাথায় হাত। অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা হাওয়া। একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এভাবেই অন্যের অ্যাকাউন্টের টাকা কৌশলে নিজের অ্যাকাউন্টে জমা করেন। মোটা অঙ্কের টাকা তোলার পর ওই অ্যাকাউন্ট হোল্ডারও গায়েব। ডাক বিভাগ ও ব্যাংক কর্মচারীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এভাবেই জালিয়াত চক্র কৌশলে হাতিয়ে নিচ্ছে শত শত কোটি টাকা। দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক রয়েছে এ প্রতারক চক্রের। অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকসহ সরকারি কিংবা বেসরকারি অনেক ব্যাংকের শাখা থেকেই তারা টাকা তুলে নিয়েছে অনায়াসে। যেসব শাখা থেকে টাকা তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ওইসব অ্যাকাউন্টধারী প্রবাসী। একটি সূত্র জানায়, গত এক বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে প্রতারক চক্র। ঢাকা-সিলেট, মুন্সীগঞ্জ ও চট্টগ্রামের ব্যাংকগুলোই প্রতারকদের টার্গেট বেশি। কারণ ওইসব জেলায় প্রবাসীদের অ্যাকাউন্টে বেশি টাকা থাকে। যে কারণে বিষয়টি ব্যাংক গ্রাহকের নজর আসে দেরিতে। কয়েক মাস আগে ঢাকার কদমতলীর দনিয়ায় একটি ব্যাংক থেকে ১৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রের সদস্যরা। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে ফের ১২ লাখ টাকা তুলতে গিয়ে ধরা পড়েন সিন্ডিকেটের এক নারী সদস্য। এরপরই বিষয়টি ব্যাংকের নজরে আসে। তবে ওই ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। মামলার সূত্র মতে, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকার কদমতলী থানাধীন দনিয়া ইসলামী ব্যাংক শাখা থেকে লন্ডনপ্রবাসী জগলুল বাসার চৌধুরীর একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ১৫ লাখ টাকা তুলে নেন শাহানা বেগম নামে এক নারী। এর কিছুদিন পর ১ মার্চ বিকালে ওই নারী একই অ্যাকাউন্টে একইভাবে ১২ লাখ টাকা তুলতে চেক জমা দেন। এ সময় সন্দেহ হয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের। জগলুল চৌধুরীর মূল অ্যাকাউন্ট ইসলামী ব্যাংক সুনামগঞ্জ শাখায়। তারা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন জগলুল চৌধুরী কাউকে চেক দেননি। এরপর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ওই নারীকে তুলে দেয় র‌্যাবের হাতে। এ ব্যাপারে ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার মাসুম খান বাদি হয়ে কদমতলী থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় এজাহার নামীয় পাঁচজনকে আসামি করা হয়। মামলাটি সিআইডিতে ন্যস্ত করা হয়। তদন্তের দায়িত্ব পান সিআইডির ডেমরা ইউনিটের পুলিশ পরিদর্শক মো. ইমাম আল মেহেদি। পুলিশের এ চৌকস কর্মকর্তা অল্পদিনের মধ্যেই আসামিদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন। আবদুস সালাম মিলন, আবুল কালাম ওরফে রানা চৌধুরী ও তানিয়া আক্তার ওরফে তানিসাকে গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে অনেকের নাম। তাদের মাধ্যমেই এ চক্রের অন্যতম হোতা আব্বাস আলী সিকদার ও হানিফ ওরফে হালিমের নাম প্রকাশ্যে আসে। এদের মধ্যে আব্বাস আলী কমলাপুর ডাক বিভাগের এয়ার অ্যান্ড সর্টিং শাখার কর্মচারী। পেশাগত কাজে বিদেশ থেকে আসা ডাক খুলে দেখার অবৈধ সুযোগ পেতেন তিনি। কোনো চেক পেলেই তা তিনি নিজের মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ছবি করে রাখতেন। সেই ছবি সরবরাহ করা হতো হানিফ ওরফে হালিমকে। হালিম ওই ছবি দেখেই কোন ব্যাংকের চেক, গ্রাহকের নাম ও চেকের নম্বর সংগ্রহ করত। এরপর সিন্ডিকেটের নারী সদস্যদের দিয়ে সে ব্যাংক শাখায় একটি হিসাব খুলতো। সেখানে নারী গ্রাহক ভাড়া বাসার ঠিকানায় ভোটার আইডি কার্ড ব্যবহার করত। হিসাব খোলার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে তিনি পেতেন একটি চেক বই। সেই চেক বইয়ের পাতার ক্রমিক নম্বর ও গ্রাহকের নাম বিশেষ কৌশলে মুছে ফেলা হতো। আর মুছে ফেলা অংশে বসানো হতো প্রবাসী গ্রাহকের নাম ও তার চেকটির ক্রমিক নম্বরের পরের দিকের একটি নম্বর। গ্রাহকের স¦াক্ষর হুবহু নকল করে চেকে স্বাক্ষর করত চক্রের বিশেষজ্ঞরা। মূল চেকের সামান্য অংশে পরিবর্তন আনায় সহজেই তা ধরা পড়তো না বলে দাবি ব্যাংক কর্মকর্তাদের। পাশাপাশি কর্মকর্তাদের সন্দেহ দূর করতে গ্রাহক সেজে শাখা ম্যানেজারকে টেলিফোন করত। কখনো কখনো বিদেশি ফোন নম্বর ক্লোন করে কল দিতো প্রতারক চক্রের সদস্যরা। এ সময় নিজেকে গ্রাহক পরিচয় দিয়ে তার অ্যাকাউন্টে কত টাকা আছে তা জেনে নিতো। একই সঙ্গে জানিয়ে দিতো একজনকে নির্দিষ্ট অঙ্কের চেক দেয়া হয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যেন সেই টাকা দিয়ে দেয়। কখনো নকল ই-মেইল ব্যবহার করেও কাউকে নির্দিষ্ট অঙ্কের চেক দেয়ার কথা জানিয়ে দিতো ওরা। পুলিশ পরিদর্শক মো. ইমাম আল মেহেদি আমার সংবাদকে বলেন, কদমতলী থানার মামলায় সংশ্লিষ্টতা থাকায় গত ২৭ নভেম্বর আব্বাস আলী সিকদারকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ডাক বিভাগ তাকে সাময়িক গ্রেপ্তার করে। গত ২৮ নভেম্বর গ্রেপ্তার হয় ব্যাংক জালিয়াতির অন্যতম গডফাদার হানিফ ওরফে হালিম। জালিয়াতির মাধ্যমে উক্ত হানিফ সিন্ডিকেট দেশের বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের টাকা তুলেছে। পুলিশের এ কর্মকর্তা দীর্ঘ তদন্ত শেষে জানিয়েছেন, দেশজুড়েই ব্যাংক জালিয়াত চক্র সক্রিয়। রয়েছে নারী সদস্য। দুষ্টু নারীরাই মূলত এ চক্রের সদস্য। কখনো বুঝেই আবার কখনো না বুঝেই তারা গডফাদারদের পাতা ফাঁদে পা দেয়। জালিয়াত চক্রের সাথে ব্যাংক কিংবা ডাক বিভাগের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে নাকি তাদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা কিংবা দক্ষতার অভাব রয়েছে সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রবাসীর কষ্টার্জিত অর্থ যাতে প্রতারক চক্র হাতিয়ে নিতে না পারে সেজন্য চক্রের মূল উৎপাটন জরুরি। তবে সবচেয়ে বেশি জরুরি সকলের সচেতনতা।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত