শিরোনাম

আ.লীগের অর্জন ও চ্যালেঞ্জ

প্রিন্ট সংস্করণ॥আসাদুজ্জামান আজম  |  ০০:০৫, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৯

দশ অর্জন
*প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পেয়েছে ২.১২ শতাংশ
*মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১০৪২ ডলার
*রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে ৩২ বিলিয়ন ডলার
রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৫.৪৪ বিলিয়ন ডলার
*বিদ্যুৎ আওতাধীন জনগোষ্ঠী ৯৫ শতাংশ
*১৯,৪৬৭ বর্গ কি.মি. সমুদ্রসীমা জয়
*মাতারবাড়ি ও পায়রায় নির্মিত হচ্ছে গভীর সমুদ্রবন্দর
*নির্মিত হচ্ছে পদ্মা ও কর্ণফুলী সেতু
*ঢাকা-চট্টগ্রাম চারলেন সড়ক নির্মাণ

 

দশ চ্যালেঞ্জ
*সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ
*ও দারিদ্র্য নির্মূল
*গ্রামে শহুরে সেবা
*দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স কার্যকর
*১ কোটি ৫০ লাখ তরুণের কর্মসংস্থান
*পদ্মা সেতুসহ চলমান মেগাপ্রকল্প মানসম্মত বাস্তবায়ন
*শিশু ও বয়স্কদের বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত
*নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা
*সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি
*৯৫ শতাংশ শিশুর মাধ্যমিক শিক্ষা
*লিঙ্গ সমতা নিশ্চিতসহ নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা
*নির্মিত হচ্ছে মেট্রোরেল

টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ। বিগত ১০ বছরের বেশকিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সফলতা দেখিয়েছে সরকার। আগামী ৫ বছরও নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হবে সরকারকে। অতীত অভিজ্ঞতা ও নেয়া পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে তেমন চ্যালেঞ্জ হবে না বলে মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্নীতি নির্মূলসহ মানসম্মত উন্নয়ন নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। ঘরের মাঠ নিয়ন্ত্রণেও বেগ পেতে হবে।তথ্যমতে, সরকারের বিগত ১০ বছরে প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পেয়েছে ২.১২ শতাংশ। গত ২০০৬ সালে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সাল শেষে প্রবৃদ্ধি হয় ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ২০১৮ সালে এসে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১০৪২ ডলার। ২০০৬ সালে মাথাপিছু আয় ছিল ৪২৭ ডলার। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে হয় ৭১০ ডলার। ২০১৮ সালে এসে ১ হাজার ৭৫২ ডলার। সরকারের সাফল্যের অন্যতম একটি হচ্ছে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় নির্বাচনের নির্বাচনি ইশতেহারের অন্যতম লক্ষ্য ছিল স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ। ক্ষমতায় আসার পরই পদ্মা সেতু নির্মাণকে অগ্রাধিকার মেগা প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করে শেখ হাসিনা সরকার। নানা ষড়যন্ত্র ও দেশ-বিদেশের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের স্বপ্নের সেই পদ্মা সেতু এখন বাস্তবায়নের পথে। পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে নদীর দুপাড়ে হাতছানি দিচ্ছে ব্যবসার নতুন দিগন্ত। গড়ে উঠতে শুরু করেছে পর্যটন কেন্দ্র। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি শতকরা ৬৩ ভাগ হয়েছে। সেতুর মোট ২৬১টি পাইলের মধ্যে ১৯১টির কাজ সম্পন্ন এবং আরও ১৫টি পাইলের আংশিক কাজ শেষ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মোট ৪২টি পিলারের মধ্যে ১৬টির কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে এবং ১৫টির কাজ চলমান রয়েছে। মোট ৪১টি স্প্যানের মধ্যে এ পর্যন্ত ৬টি স্থাপন করা হয়েছে। ফলে এখন ৯০০ মিটার দৃশ্যমান।সরকারের আরেকটি বড় সাফল্য বিদ্যুৎ খাতে। সারাদেশের ৯৫ শতাংশ মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনা হয়েছে। ২০০৬ সালে বিদ্যুৎ আওতাধীন জনগোষ্ঠী ছিল ৪৭ শতাংশ। ২০১৮ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৯৫ শতাংশ। অর্থাৎ বিদ্যুতের আওতায় এসেছে ৪৮ শতাংশ জনগোষ্ঠী। গত ১০ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে ১৫ হাজার ৪৮৮ মেগাওয়াট। ২০০৬ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট, যা ২০১৮ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৪৩০ মেগাওয়াটে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১০০টি। ২০০৬ সালে ছিল ২৭টি, ২০১৮ সাালে এসে দাঁড়িয়েছে ১২৭টি। ২০২৩ সালের মধ্যে প্রতিটি মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনাসহ ২৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।সরকার সাফল্য দেখিয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা কাটিয়ে ১ কোটি ১৮ লাখ ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্রসীমা জয় করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। যা মোট বাংলাদেশের ৮০.৫১ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় আরেকটি বাংলাদেশের সমান। বিশাল এ সমুদ্রসীমায় ইতোমধ্যে ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্র সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে আগামী ৫ বছরের অগ্রাধিকার প্রকল্প নিয়েছে সরকার। সরকারের বিগত সময়ে রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে ৩২ বিলিয়ন ডলার। ২০০৯ সালে বৈদেশিক রিজার্ভ ছিল ১ বিলিয়ন ডলার; ২০১৮ সালে হয়েছে ৩৩ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৫.৪৪ বিলিয়ন ডলার। ২০০৯ সালে রপ্তানি আয় ছিল ১.২৬ বিলিয়ন ডলার; আওয়ামী লীগের ১০ বছরের শাসনামলের ২০১৮ সালে হয়েছে ৩৬.৭ বিলিয়ন ডলার। ২০৩০ সালে মাথাপিছু আয় ৫৪৭৯ ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কর্মপরিকল্পনা হাতে নেয়া হচ্ছে। দারিদ্র্যের হার কমেছে ৯.৭ শতাংশ। ২০০৬ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪১.৫ শতাংশ। ২০১৮ দারিদ্র্যের হার নেমে এসেছে ২১.৮ শতাংশে। আগামী ৫ বছরে অর্থাৎ ২০২৩ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১২ শতাংশে এবং অতি দারিদ্র্যের হার ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি রয়েছে সরকারের। কাজটি কঠিন হলেও বাস্তবায়ন করতে বদ্ধপরিকর সরকারের উচ্চপর্যায়। আওয়ামী লীগের ১০ বছরের শাসনামলে গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে ৬ বছর। ২০০৬ সালে গড় আয়ু ছিল ৬৫.৪ বছর; ২০০৯ সালে ছিল ৬৬.৮ বছর; ২০১৮ সালে হয়েছে ৭২.৮ বছর। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান এগিয়েছে ৪৬ ধাপ। ২০০৬ সালে অবস্থান ছিল ৯১তম, ২০০৯ সালে ৯৩তম; ২০১৮ সালে হয়েছে ৪৭তম। গত ১০ বছরে রেমিটেন্স আয় বেড়েছে ৫২.৩ কোটি ডলার। রেমিটেন্স আয় ২০০৬ সালে ছিল ৪৮ কোটি ডলার; ২০০৯ সালে ৯৭ কোটি ডলার; ২০১৮ হয়েছে ১৪৯.৩ কোটি ডলার। ওই সময়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ বেড়েছে ১২৬.৯০ কোটি ডলার। বৈদেশিক বিনিয়োগ ২০০৬ সালে ছিল ৪৫.৬ কোটি ডলার, ২০০৯ সালে হয় ৯৬.১ কোটি ডলার; ২০১৮ সালে এসে দাঁড়িয়েেেছ ২৫৮.৮০ কোটি ডলার। এ ছাড়া উল্লিখিত সাফল্যের মধ্যে আরও রয়েছে যোগাযোগ উন্নয়নে ৫২ হাজার ২৮০ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন, ৪১৭ কিলোমিটার জাতীয় সড়ক চারলেনে উন্নীত করা, ৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ, ৩৩০ কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মাণ, ১১৭টি নতুন রেলগাড়ি যোগ করা, ১ লাখ ২০ হাজার ভূমিহীন পরিবারকে জমি দান, ১ লাখ ৬০ হাজার পরিবারকে পুনর্বাসন, বয়স্ক ভাতাভোগী ৪০ লাখে উন্নীত করা, ২৬ হাজার ১২৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ, ১ কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোনে উপবৃত্তি প্রদান, ২৭১টি কলেজ জাতীয়করণ, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। গত মেয়াদে বেশকিছু ঈর্ষান্বিত সাফল্য এনেছে বাংলাদেশ। আর এ কারণে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা কুড়িয়েছেন বেশকিছু আন্তর্জাতিক পুরস্কার। এর মধ্যে রয়েছে ২০১৪ সালে শিক্ষা খাতের উন্নয়নের জন্য ইউনেস্কোর ‘ট্রি অব পিস’ সম্মাননা, ২০১৫ সালে দারিদ্র্যবিমোচনে ‘সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড’, পরিবেশ রক্ষা জাতিসংঘের ‘ চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ পুরস্কার, আইসিটি খাতের উন্নয়নের জন্য ‘আইটিইউ অ্যাওয়ার্ড’, ২০১৬ সালে জাতিসংঘের ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড’, ‘প্লানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ পুরস্কার, ২০১৮ সালে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য ‘গ্লোবাল উইমেন্স লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড এবং মানবতায় দৃষ্টান্ত দেখিয়ে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ খেতাবে ভূষিত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত দুই মেয়াদে সরকারের সাফল্য ও অভিজ্ঞতার আলোকে আগামী ৫ বছরের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। নির্বাচনি ইশতেহারে তুলে ধরা এ পরিকল্পনার বেশকিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এর মধ্যে রয়েছে গ্রামে শহুরে সেবা নিশ্চিত করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স কার্যকর, ১ কোটি ৫০ লাখ তরুণের কর্মসংস্থান, পদ্মা সেতুসহ চলমান মেগাপ্রকল্প মানসম্মত বাস্তবায়ন, শিশু ও বয়স্কদের বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত, নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূল, দারিদ্র্য ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ৯৫ শতাংশ শিশুর মাধ্যমিক শিক্ষা, লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত ও নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সূত্র মতে, গ্রামে শহুরে সেবা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। প্রতিটি মন্ত্রণালয় গ্রামকেন্দ্রিক পরিকল্পনা নিতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী ধারাবাহিকভাবে মন্ত্রণালয়ে অফিস করে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের রোডম্যাপ ঠিক করছেন। প্রতিটি মানুষ যাতে গ্রামে বসেই সর্বোচ্চ শিক্ষাগ্রহণ ও চিকিৎসাসেবা নিতে পারে তা নিশ্চিত করা। গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেট সেবা আরও গতিশীল করা হবে। পাকা রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে গণকবরস্থান নির্মাণ, শহরের আদলে আবাসিক নগরী গড়তে উদ্যোগ নেয়া হবে। উদ্যোক্তা তৈরিতে বিনা জামানতে ঋণ দেয়া হবে। প্রতিটি জেলায় যুব স্পোর্টস কমপ্লেক্স ও মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করা। সম্প্রতি এলজিইডি মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে উপজেলাভিত্তিক মাস্টার প্ল্যান তৈরির নির্দেশনা দেন।সরকারের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব মো. কামাল উদ্দিন তালুকদার জানান, গ্রামে শহুরে সেবা নিশ্চিত করার বড় ভূমিকা রয়েছে আমাদের বিভাগের। আমরা ইতোমধ্যে সে লক্ষ্যে গ্রাম উন্নয়নের সবদিক বিবেচনায় রেখেই কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছি। তৃণমূলে সব ধরনের নাগরিক সেবার জন্য আমরা কাজ করছি। সরকারের প্রতিশ্রুতির অন্যতম হচ্ছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ। সরকার গঠনের পর থেকেই মন্ত্রিসভার সদস্যরা জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ বিষয়ে কড়াকড়ি নির্দেশনা দিয়েছেন। বিশেষ করে প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সতর্ক করা হয়েছে।বিশ্লেষকদের মতে, টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। তৃতীয়বারের মতো আবারো নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে দলটি। সঙ্গত কারণেই যারা ক্ষমতায় থাকে তারা বিভিন্ন কায়দায় সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে এবং অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে। এসব অবৈধ পন্থায় সুবিধাভোগীর সংখ্যা আরও বাড়ছে, এ ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়বে। তবে অন্যান্য দুর্নীতিবাজদের ন্যায় দলের নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে এ নীতি কার্যকর হবে বলে সরকারের একাধিক মন্ত্রী জানিয়েছেন। তারা জানান, শুধু প্রশাসন নয় সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি থাকবে জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও মাদকের বিরুদ্ধে। সন্ত্রসী-গডফাদারদের এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা চিহ্নিত করে আইনের শাসন নিশ্চিত করা হবে।জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আমার সংবাদকে বলেন, প্রশাসনে দুর্নীতি করার আর সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে। প্রশাসন হবে জনমুখী ও জনকল্যাণমুখী। সমাজের সাধারণ মানুষও সম্মানের সাথে সব ধরনের সেবা পাবে, সেটা নিশ্চিত করা হবে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে এসে কঠোর বার্তা দিয়েছেন। প্রশাসনের সব দপ্তরে বেতন-ভাতাসহ সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। কেউ দুর্নীতি করলে ছাড় পাবে না। জনপ্রশাসনকে সম্পূর্ণভাবে দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করতে হবে। এখন দুর্নীতি করার আর কোনো সুযোগ নেই। এই বার্তাটি জনপ্রশাসনের তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান বলেন, শেখ হাসিনা সরকার কখনো দল বিবেচনায় আনে না। দুর্নীতিবাজ যেই হোক একই নীতি কার্যকর হবে। সরকারের আরেকটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ২০২৩ সালে বেকারত্বের হার ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা। ইশতেহার অনুযায়ী আগামী ৫ বছরে অর্থাৎ ২০২৩ সালের মধ্যে ১ কোটি ৫০ লাখ কর্মসংস্থান কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, প্রশাসনের খালি পদগুলো অধিকাংশ পূরণ করা হবে। ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে, সেখানে বিরাট অংশের তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এ ছাড়া সরকারের যেসব মেগা প্রজেক্ট চলমান রয়েছে, সেগুলো সম্পন্ন হলে সেখানেও কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। সরকারের গত ১০ বছরের মাতৃত্বকালীন ছুটি বেড়েছে ২ মাস। ২০০৬ সালে ছিল ৪ মাস; ২০০৯ সালেও ৪ মাস; ২০১৭ সালে ৬ মাস। আগামী ৫ বছরের বেতন-ভাতাসহ নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ৪ মাস বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। গড়ে তোলা হবে নিরাপদ কর্মপরিবেশ।শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ান জানান, শেখ হাসিনা সরকার শ্রমিকবান্ধব, সেটা ইশতেহারেও ফুটে উঠেছে। ইশতেহার বাস্তবায়নে আমাদের মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি, কোনো কিছু অসম্পূর্ণ থাকবে না ইনশাল্লাহ। দেশের মাটিতেই প্রতিটি নাগরিকের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চায় সরকার। ১ বছরের নিচে এবং ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে সকলকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছে ইশতেহারে। বিভাগীয় শহরে স্থাপন করা হবে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। বিভাগীয় শহরে ১০০ শয্যার ক্যান্সার ও কিডনি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হবে। সারাদেশে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর ভবনসহ আধুনিক সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে ইশতেহারে। শিশু ও বয়স্কদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার রোডম্যাপ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে ইশতেহারের বাকি প্রতিশ্রুতিগুলো নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। সরকারের গত ১০ বছরে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে ৫৩ লাখ মেট্রিক টন। ২০০৯ সালে খাদ্য উৎপাদন ছিল ৩৪৭ লাখ মেট্রিক টন; ২০১৮ হয়েছে ৪০০ লাখ মেট্রিক টন। কৃষি উৎপাদন বাড়লেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হবে নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা করা। কঠিন হলেও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় সরকার। ইতোমধ্যে খাদ্যে ভেজাল দেয়াকে এক ধরনের দুর্নীতি আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। খাদ্য দিবসের এক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে সেখানে সফলতা অর্জন করেছি, আমরা মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছি। খাদ্যে ভেজাল দেয়াও এক ধরনের দুর্নীতি, এই দুর্নীতির বিরুদ্ধেও আমরা অভিযান অব্যাহত রেখেছি। বিষ খেয়ে আমাদের দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হোক এটা আমরা চাই না। এদিকে, নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ শুরু করেছে মন্ত্রণালয়। নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে রেস্তোরাঁয় গ্রেডিং পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এ প্লাসকে সবুজ, এ গ্রেডকে নীল, বি গ্রেড হলুদ এবং সি গ্রেডে কমলা রংয়ের স্টিকার থাকবে। এ প্লাস মানে উত্তম, এ মানে ভালো, বি মানে মোটামুটি এবং সি মানে- অনিরাপদ। যারা সবুজ পাবে তাদের অফিসিয়াল রিনিউয়াল মেয়াদ ১ বছর। নিয়মিত মনিটরিং করা হবে। মান কমে গেলে কমবে গ্রেড এবং গ্রেড সি বা হলুদে এলে সিলগালা করে দেবে কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, দায়িত্ব নিয়েই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কাজ শুরু করেছি। নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা চ্যালেঞ্জ বলে থেমে থাকলে তো হবে না। শুরু করতে হবে, সারা বিশ্ব এটা নিয়ে কাজ করছে। আমরাও শুরু করলাম। ইচ্ছা থাকলে সব সম্ভব। সততা আর ইচ্ছা থাকলে এটা কোনো চ্যালেঞ্জ নয়। বিশ্বব্যাপী নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে কাজ করছে। আমরাও সেদিকে যাচ্ছি এবং সফল হবো ইনশাল্লাহ।ইশতেহার অনুযায়ী, আগামী ৫ বছরে ৯৫ শতাংশ শিশুর মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করবে সরকার। শহরের নিম্নবিত্তের, আধা মফস্বল শহর এবং গ্রামের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্কুল ফিডিং চালু করা হবে। মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে কর্মময় শিক্ষা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হবে। নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় শিক্ষার সুযোগসহ সকল বই বিনামূল্যে বিতরণ করবে সরকার। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সকল স্তরের বই ছাপানোসহ তাদের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীতে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি জানিয়েছেন, শিক্ষা খাত নিয়ে ইশতেহারে উল্লিখিত সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হবে। ইতোমধ্যে শিক্ষার মান উন্নয়নে পাঁচটি বড় সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সমস্যাগুলো হচ্ছে পাঠ্যপুস্তকের কারিকুলাম পরিবর্তন, প্রশ্নফাঁস রোধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, শিক্ষা প্রশাসন কার্যকর ও কোচিং বাণিজ্য। আগামী ৫ বছরের সরকারের উল্লেখযোগ্য পরিকল্পনার মধ্যে আরও রয়েছে পদ্মা সেতুর দুপাড়ে সিঙ্গাপুরের আদলে শিল্পনগরী গড়ে তোলা, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পকে গ্রামভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি গুচ্ছশিল্প কাঠামোয় সংযুক্ত করা, ঢাকা ঘিরে এলিভেটেড রিংরোড এবং ইস্টার্ন বাইপাস নির্মাণ করা, ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে এবং এক্সপ্রেসওয়ে রেললাইন নির্মাণ করা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, দিনাজপুর, পটুয়াখালী, খুলনা এবং কলকাতা পর্যন্ত বুলেট ট্রেন সার্ভিস সম্প্রসারণ করা, ঢাকা শাহজালাল বিমান বন্দরে থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ, নতুন রাডার স্থাপন ও জেট ফুয়েল সরবরাহের জন্য পাইপলাইন নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা, বাগেরহাটে খান জাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণ অগ্রাধিকার ভিক্তিতে শেষ করা, কক্সবাজারে সুপিরিয়র বিমান অবতরণ ক্ষমতাসম্পন্ন বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠা করা, ঢাকায় পাতাল রেল, মেট্রোরেল, সার্কুলার রেলপথ এবং নব্য ও প্রশস্ত নৌপথ নির্মাণ করা, ৫ বছরে ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ খনন করা, ঢাকার আশপাশের ৪ নদীকে দখলমুক্ত ও দূষণমুক্ত করে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা রয়েছে সরকারের কর্মপরিকল্পনায়।ইতোমধ্যে ঢাকার আশপাশের নদীগুলোকে দখলমুক্ত করার অভিযান শুরু হয়েছে। বুড়িগঙ্গা দখলমুক্ত করার চলমান অভিযানে আড়াই শতাধিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। টিনের তৈরিস্থাপনা থেকে শুরু করে ৫ তলা বহুতল ভবন গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। দখলদাররা নদীর জায়গায় অবৈধভাবে স্থাপনা বানিয়ে বছরের পর বছর তা ভোগ দখল করে আসছিল। তাই নদীর জায়গা নদীকে ফিরিয়ে দিতেই বিআইডব্লিউটিএর এ পদক্ষেপ।নৌপরিবহন সচিব মো. আব্দুস সামাদ জানান, শিগগিরই প্রকল্পের মাধ্যমে অবৈধ দখলমুক্ত এলাকার পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। নদীর তীর বরাবর একটি ওয়াকওয়ে, সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য বাগান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ব-দ্বীপ বা ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করার লক্ষ্যপূরণে কাজ করবে সরকার।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত