শিরোনাম

আটকে আছে আনসার কর্মকর্তাদের পদোন্নতি

প্রিন্ট সংস্করণ॥কাওসার আজম  |  ১১:১৮, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৯

১৯৭৮ সালে থানা ভিডিপি অফিসার/সহকারী অ্যাডজুটেন্ট হিসেবে যোগ দেন চার শতাধিক কর্মকর্তা। দীর্ঘ দিন একই পদে চাকরি করে তাদের অধিকাংশই এখন অবসরে। দীর্ঘ কর্মজীবনে থানার পরিবর্তে হয়েছেন উপজেলা কর্মকর্তা। পরিবর্তিত নাম হয়েছে আনসার ভিডিপি কর্মকর্তা। ৪০ বছরে তৃতীয় শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত হওয়ার মর্যাদা পেয়েছেন তারা। পদোন্নতি বলতে এটাই জুটেছে তাদের। ওই ব্যাচের কিছু কর্মকর্তা দীর্ঘ ৪০ বছরে এখনো একই পদে চাকরি করছেন। ২০১১ সালে মাঝখানে দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত হওয়ার পথ উন্মোচন হলেও জ্যৈষ্ঠতা নির্ধারণ জটিলতায় আনসারের নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের প্রথম শ্রেণির পদে পদোন্নতি আটকে যায়। ‘সার্কেল অ্যাডজুটেন্ট ও উপজেলা আনসার কর্মকর্তা’ এ দুই পদের কর্মকর্তারাই জ্যেষ্ঠতা দাবি করায় এ জটিলতা সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ সাত বছর এটিও উচ্চ আদালতের রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। কথা হয় বগুড়ার শেরপুরের এ কে এম আসাদুজ্জামানের সাথে। ১৯৭৮ সালের ৯ অক্টোবর থানা আনসার ভিডিপি অফিসার/সহকারী অ্যাডজুটেন্ট হিসেবে চাকরি জীবনে প্রবেশ করেন তিনি। চাকরি জীবনের ৪০ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো তিনি একই পদে চাকরি করছেন। থানার পরিবর্তিত পদ উপজেলা আনসার ভিডিপির কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বগুড়ার শাহজাহানপুরে। চোখের সামনে উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের সমমর্যাদার কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেখেছেন আসাদুজ্জামান। তার মতো নন-ক্যাডাররাও হয়েছেন বিভিন্ন দপ্তরের জেলা কর্মকর্তা কিংবা দপ্তরের পরিচালক। চার দশকে রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা পরিবর্তন ঘটলেও পরিবর্তন হয়নি আসাদুজ্জামানদের। চাকরির ২৩ বছরের মাথায় ২০০০ সালে তৃতীয় শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হওয়ার সৌভাগ্য (!) অর্জন করেছেন। ১৯৭৮ সালে থানা কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেয়া বদিউল আলম বর্তমানে এলপিআরে আছেন। লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলা আনসার ভিডিপি অফিসার হিসেবে অবসরোত্তর ছুটিতে থাকা বদিউলের এলপিআর শেষ হয়েছে গতকাল ১০ ফেব্রুয়ারি। কুড়িগ্রামের উলিপুরের বাসিন্দা বদিউল আলম দীর্ঘ ৪০ বছর একই পদে চাকরি করেছেন। তার ভাষ্যমতে, ‘আমাদের সময় থানা বা উপজেলা আনসার ভিডিপি অফিসার, থানার ওসি, সমাজসেবা অফিসার, পাবলিক হেলথ অফিসার,কৃষি কর্মকর্তা একই মর্যাদার (তৃতীয় শ্রেণি) ছিলাম। আমরা বাদে বাকি সব পদই এখন প্রথম শ্রেণির। দীর্ঘ দিনেও যেমন পদোন্নতি হয়নি, তেমনি পদমর্যাদাও বাড়েনি। সারাজীবন একই পদে চাকরি করে অবসরে যাচ্ছি, এটাই আফসোস।’ জানা যায়, ১৯৭৮ সালে চার শতাধিক থানা আনসার ভিডিপি অফিসার/সহকারী অ্যাডজুটেন্ট হিসেবে নিয়োগ পান। তাদের বেশির ভাগই এখন অবসরে। একইপদে দীর্ঘদিন চাকরি করে অবসরে গেছেন তারা। পদোন্নতি না হওয়ায় সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, বঞ্চিত হচ্ছেন এখন যারা আছেন তারাও। জানা যায়, শুধু জাতীয়, স্থানীয় নির্বাচনে আনসার ভিডিপি সদস্যরা ভূমিকা রাখছেন, এমনটি নয়। জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস দমনের চলমান কার্যক্রমেও এ বাহিনীর সদস্যরা ভূমিকা রাখছেন। সূত্রমতে, প্রতিটি উপজেলা আনসার ভিডিপি অফিসে একজন করে কর্মকর্তা ও দুইজন প্রশিক্ষক (একজন নারী, একজন পুরুষ) রয়েছেন। এর বাইরে কোনো অফিস স্টাফ নেই। দৈনন্দিন কাজ সম্পাদনে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাদের। শুধু তাই নয়, ঢাকা মহানগরীতে ২৩ জন উপজেলা আনসার ভিডিপি কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের অফিস পর্যন্ত নেই। স্থানীয় আনসার ক্যাম্পগুলোতে তারা কর্ম সম্পাদন করে যাচ্ছেন। পদোন্নতির পথ খুললেও আটকে আছে জ্যেষ্ঠতা জটিলতায় : ২০০০ সালের ১৩ জুন জারি করা বিসিএস আনসার নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী, সহকারী জেলা অ্যাডজুটেন্ট বা সমমানের পদের দুই-তৃতীয়াংশ সরাসরি বিসিএসের মাধ্যমে এবং এক ভাগ পদ পদোন্নতি দিয়ে পূরণ করতে হবে। তবে পদোন্নতির জন্য অন্তত চার বছর সার্কেল অ্যাডজুটেন্ট হিসেবে চাকরি করতে হবে। সরকারী কর্মকমিশন (পিএসসি), স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং আনসার ও ভিডিপি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৪ সালের আনসারের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী ‘সার্কেল অ্যাডজুটেন্ট ও উপজেলা কর্মকর্তা’ দুটি পদই দ্বিতীয় শ্রেণির। তবে সার্কেল অ্যাডজুটেন্ট পদটি এক ধাপ ওপরে ছিল। কিন্তু ২০১০ সালের ১০ মার্চ নতুন বিধিমালায় দুটি পদই সমমান করা হয়। এর পরই জ্যেষ্ঠতা নিয়ে জটিলতা শুরু হয়। এ দুটি পদই প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।২০০৫ সালের ১০ নভেম্বর আনসারে যোগ দেয়া ৭৬ জন সার্কেল অ্যাডজুটেন্টের দাবি, চার বছর চাকরির পর ২০০৯ সালের ১০ নভেম্বর তারা সহকারী জেলা অ্যাডজুটেন্ট পদে পদোন্নতির যোগ্য হন। বিগত ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পদোন্নতির জন্য ১৩৪ জন সার্কেল অ্যাডজুটেন্টের জ্যেষ্ঠতার তালিকায় তারাও ছিলেন। কিন্তু উপজেলা কর্মকর্তারা তাদের চেয়ে জ্যেষ্ঠতা দাবি করায় পদোন্নতি আটকে যায়। অন্যদিকে ৩৫০ জন উপজেলা আনসার-ভিডিপি কর্মকর্তার দাবি, তারা ১৯৭৮ ও ১৯৮১ সালে যোগ দিয়েছেন, কাজেই বর্তমান সার্কেল অ্যাডজুটেন্টদের চেয়ে তারা জ্যেষ্ঠ।আনসার অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০১১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর অধিদপ্তরের দ্বিতীয় শ্রেণির ৪৩৫ কর্মকর্তার জ্যেষ্ঠতার তালিকা করা হয়। এতে ২০০৫ সালে যোগ দেয়া ৭৬ সার্কেল অ্যাডজুটেন্টকে উপজেলা কর্মকর্তাদের চেয়ে কনিষ্ঠ করা হয়। এর বিরুদ্ধে আদালতে যান সার্কেল অ্যাডজুটেন্টরা। এর পর থেকে সব আটকে আছে। কয়েকজন সার্কেল অ্যাডজুটেন্ট বলেন, বিসিএস নিয়োগ বিধিমালায় সার্কেল অ্যাডজুটেন্ট থেকেই পদোন্নতি দিয়ে সহকারী জেলা অ্যাডজুটেন্ট করতে বলা হয়েছে। সেখানে উপজেলা কর্মকর্তাদের কথা উল্লেখ নেই। আবার নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের নিয়োগ বিধিমালায় বলা আছে, বিভিন্ন পদের মধ্যে সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা তালিকা করার সময় ওই পদে যারা আগে যোগ দিয়েছেন, তারাই জ্যেষ্ঠ হবেন। যেহেতু তারা ২০০৫ সালে সার্কেল অ্যাডজুটেন্ট হয়েছেন, কাজেই ২০১০ সালে উপজেলা কর্মকর্তাদের পদ সমমানের করা হলেও তারাই জ্যেষ্ঠ। আনসার অধিদপ্তর সেটি না মানায় তারা আদালতে গেছেন।আনসারের কর্মকর্তারা জানান, জ্যেষ্ঠতা জটিলতা ও পদোন্নতি আটকে থাকায় এ দুই পদের কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশার পাশাপাশি মনস্তাত্তিক দ্বন্দ্ব চলছে। এ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও বিব্রত। জটিলতার বিষয়ে জানতে চাইলে আনসার ও ভিডিপি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল কাজী শরীফ কায়কোবাদের ফোনে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও রিসিভ হয়নি। অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম আসিফ ইকবাল বলেন, ‘আমি নতুন যোগদান করেছি। এসব বিস্তারিত কিছু বলতে পারব না।’ এ ব্যাপারে পরিচালক (প্রশাসন) হিরা মিয়া বলেন, জ্যেষ্ঠতার বিষয়টি নিয়ে মামলা বিচারাধীন আছে। যেহেতু বিষয়টি আদালতে আছে, সেখানে নিষ্পত্তি হোক। আদালত যে রায় দেবেন, আমরা দ্রুত তা বাস্তবায়ন করব। এ ব্যাপারে আর কিছু বলতে চান না তিনি। ৪০ বছর একই পদে চাকরি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৯৭৮ সালে সম্ভবত প্রায় ৪০০ জন থানা ভিডিপি অফিসার/সহকারী অ্যাডজুটেন্ট হিসেবে যোগ দেন। যাদের অধিকাংশই অবসরে গেছেন। দীর্ঘদিনে অনেক সরকার গেছে, সমাধান হয়নি। বর্তমান সরকার আমাদের বাহিনীর জন্য অনেক কিছু করেছে। এই বিষয়টিও বর্তমান সরকার দেখবেন বলে বিশ্বাস করি। তিনি এ-ও বলেন, নিয়মিত দায়িত্বেও মধ্যে আরো কিছু দায়িত্ব বেড়েছে। যেমন জঙ্গি ও সন্ত্রাস দমনে আমাদের সদস্যরা অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছেন। আনসার ভিডিপিতে মাঠপর্যায়ে অফিসার সঙ্কট রয়েছে। এর সমাধানও প্রয়োজন। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ( আনসার ও সীমান্ত) মো. সাহেদ আলী বলেন, ‘আমি নতুন দায়িত্বে এসেছি। তাদের বিষয়ে খুব বেশি বলতে পারব না।’ জানা যায়, আগামীকাল মঙ্গলবার গাজীপুরের সফিপুরে আনসার একাডেমিতে আনসার ও গ্রাম রক্ষা বাহিনীর ৩৯তম জাতীয় সমাবেশে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিগত বছর বীরত্বপূর্ণ এবং সেবামূলক ক্যাটাগরিতে বিশেষ অবদানের জন্য প্রায় ১০০ জনকে আনসার ভিডিপি সদস্যকে পদক দেবেন। আনসার ভিডিপির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বাহিনীর সমস্যাগুলো কেটে যাবে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত