শিরোনাম

রোহিঙ্গাদের পাচারে সক্রিয় সিন্ডিকেট ফাঁদে পা দিচ্ছে বাংলাদেশিরাও

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল লতিফ রানা  |  ০০:১৪, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৯

সুমদ্রপথে মানবপাচার থামছেই না। কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে সমুদ্রপথে মানবপাচার চলছেই। দেশি-বিদেশি মানবপাচার চক্র এখন বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের পাচারে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। মাছ ধরার নৌকায় ঝুঁকিপূর্ণ পথে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের পাচার করা হচ্ছে। শুধু রোহিঙ্গারাই নয়, মালয়েশিয়ায় কাজের আশায় পাচার চক্রের ফাঁদে পা দিচ্ছে বাংলাদেশিরাও। গত বৃহস্পতিবার রাতে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া থেকে সমুদ্রপথে পাচারকালে ৫০ জনকে উদ্ধার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এ নিয়ে চলতি বছরে প্রায় ৭০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন দালালকেও বিজিবি আটক করেছে।অপরদিকে ইন্দোনেশিয়ায় এক সার্টার লাগানো দোকান থেকে ২৫০ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করেছে সেদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব বাংলাদেশি সমুদ্রপথে দালালের মাধ্যমে পাচারের শিকার হন। মালয়েশিয়ায় কাজ দেয়ার কথা বলে পাচারকারীরা তাদের সেখানে আটকে রেখেছিল বলে সেদেশের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছে। জানা গেছে, গত ৭ জানুয়ারি অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির সময় কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার শামলাপুর উপকূল থেকে ১৫ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। বিজিবির টেকনাফস্থ ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. আছাদুদ-জামান চৌধুরী স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া ৩০ রোহিঙ্গাকে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচার করার সময় বিজিবির সদস্যরা উদ্ধার করে। এসময় দুজন স্থানীয় দালালকেও আটক করা হয়েছে। আর উখিয়ার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে পাচারের সময় ২০ রোহিঙ্গাকে পুলিশ উদ্ধার করে। স্থানীয় সূত্র জানায়, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গা নাগরিকদের স্বজনদের আহ্বানে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা। ইতোমধ্যে বেশকিছু রোহিঙ্গা পাচার হয়ে গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিবাসন নেতা জানান, বর্ষা মৌসুমের শেষেই সমুদ্রপথে মানবপাচার শুরু হয়। গত ২০১৫ সালে সমুদ্রপথে মানবপাচারের ভয়াবহতা প্রথম প্রকাশ পায়। ওই বছরের মাঝামাঝি মালয়েশিয়ার সীমান্তের কাছে থাইল্যান্ডের গভীর জঙ্গলে মানব পাচারকারীদের কিছু ক্যাম্প ও অভিবাসীদের গণকবর আবিষ্কারের পর পাচারের শিকার মানুষের চরম মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়টি সারাবিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এরপর পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপের মুখে পড়তে হয়। ফলে কিছুটা হলেও নিষ্ক্রিয় ছিল আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রগুলো। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যাপকহারে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নেয়ার পর আবারো তারা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সরকারের দক্ষ কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় মালয়েশিয়ার পার্শ্ববর্তী দেশ ইন্দোনেশিয়ায় চালু হয় অন অ্যারাইভাল ভিসা। ভ্রমণ পিপাসু বাংলাদেশিদের নির্বিঘ্নে ভিসা ছাড়াই দেশটিতে ভ্রমণ করার সুযোগ তৈরি হয়। আর সেই অন অ্যারাইভাল ভিসাকে পুঁজি করে মানব পাচারকারীদের নিরাপদ রুট গড়ে উঠছে। ইন্দোনেশিয়ার বালি ও মেদান দ্বীপকে ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে নৌকা এবং ঢাকা থেকে সরাসরি বিমানে জাকার্তায় নেমে চলে যাচ্ছে সোরাবাইয়া, বালি, বাতাম এবং মেদানে। আবার ইন্দোনেশিয়ার মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেয়ার পর তাদেরকে জড়ো করা হয় ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায়। এজন্য সুযোগের অপেক্ষায় পাচারকারীদের রাখা হয় দীর্ঘদিন। অনেকেই খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করতে হয়। আর সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের ফলে দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধী অবস্থা অবস্থান করছে এসব মানুষ। আর দীর্ঘদিন আটকে থেকেও ইন্দোনেশিয়ার মেদান শহর থেকে গ্রেপ্তার হতে হলো মালয়েশিয়ায় পাচারের অপেক্ষায় থাকা প্রায় দুই শতাধিক বাংলাদেশিকে। এর আগে অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় প্রবেশের চেষ্টাকালে ২০১৮ সালের এপ্রিলে ৩১ বাংলাদেশিকে আটক করে মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন ও মেরিন পুলিশ। যাদের বয়স আনুমানিক ১৫ থেকে ৫১ বছর। এদের ১০ জন বাংলাদেশি আর ৩১ জন মিয়ানমারের নাগরিক।বাংলাদেশে নিরাপদ অভিবাসন সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে সাগরপথে মানবপাচারের ঘটনায় দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। শুধু তাই নয়, শ্রমবাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ সমস্যার সমাধান করতে হলে বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার পথ সহজ করতে হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বেশি সেখান থেকে লোক পাঠানোর সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কর্মী প্রেরণ ও মানবপাচার রোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর জন্য কর্তৃপক্ষের জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে তারা জানিয়েছেন।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত