শিরোনাম

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণে নতুন সিন্ডিকেট

প্রিন্ট সংস্করণ॥কাওসার আজম  |  ০০:১৫, ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০১৯

সিন্ডিকেট ও নানা অনিয়মের অভিযোগে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার স্থগিত রয়েছে গত সেপ্টেম্বর থেকে। বাংলাদেশের অন্যতম বড় এই শ্রমবাজার ফের কবে চালু হবে, সেটি নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি এখনো। তবে বাজারটি নিয়ন্ত্রণে নিতে আরেকটি সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠেছে। গতকাল ফোমেমা নামে মালয়েশিয়ার একটি বেসরকারি মেডিকেল চেকাপ সংগঠনের প্রতিনিধি দল ঢাকা সফরে এসেছে। যার মূলে রয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ান ব্যবসায়ী দাতো শ্রী আবু হানিফ মো. আবুল কাশেম। বাংলাদেশ থেকে যেসব কর্মী মালয়েশিয়ায় যাবে, তাদের মেডিকেল চেকাপের জন্য মেডিকেল সেন্টার স্থাপন করে শ্রমবাজারটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাচ্ছেন তিনি। যেটি আগে একক নিয়ন্ত্রণে ছিল বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আরেক মালয়েশিয়ান ব্যবসায়ী দাতো আমিন নুরের। সফররত মালয়েশিয়ার বেসরকারি মেডিকেল চেকাপ সংগঠন ফোমেমার প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের বেশকিছু মেডিকেল সেন্টার বা ডায়গনস্টিক সেন্টার পরিদর্শন করবেন। তাদের সফর শিডিউলে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ, বায়রার নেতাদের সাথে বৈঠকের কথা উল্লেখ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জনশক্তি রপ্তানিতে ‘জিটুজি প্লাস’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আগে থেকেই দাতো আমিন নুরের সিনারফ্ল্যাক্স ও বেস্টিনেট এবং দাতো হানিফের রিয়েল টাইম শ্রমবাজারটি নিয়ন্ত্রণে নিতে নানামুখি তৎপরতা শুরু করে। এই দুজনের হয়ে বাংলাদেশের জনশক্তি ব্যবসায়ীরাও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত দাতো আমিন নুরের সিনারফ্ল্যাক্স অনলাইন সিস্টেম ‘এসপিপিএ’ এবং বেস্টিনেট কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার দায়িত্ব পায়। বাংলাদেশের ১০ জন রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকের সমন্বয়ে প্রায় দুই বছর একচেটিয়া ব্যবসা করেন দাতো আমিন নুর। শ্রমিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় ও সিন্ডিকেটের অভিযোগে মালয়েশিয়া সরকার অনলাইন সিস্টেম ‘এসপিপিএ’ বাতিল ঘোষণা করে। নতুন সিস্টেম চালু না হওয়া পর্যন্ত ‘জিটুজি প্লাস’ পদ্ধতিতে শ্রমিক নেয়া গত সেপ্টেম্বর থেকে স্থগিত রেখেছে। মাঝখানে মালয়েশিয়ায় ও বাংলাদেশে উভয় দেশের মধ্যে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের মধ্যে দুটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কবে নাগাদ বাজারটি চালু হবে তা স্পষ্ট করেনি মালয়েশিয়া। কিন্তু, স্থগিত এই বাজারটি দখলে নিতে জনশক্তি ব্যবসায়ী ও মালয়েশিয়ার একটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে পড়েন। গতকাল সকালে ৭ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফরে আসেন। এতে ফোমেমার কর্তৃপক্ষসহ রয়েছেন বিতর্কিত ব্যবসায়ী দাতো আবু হানিফও। বিতর্কিত ব্যবসায়ী দাতো আমিন নুরের বেস্টিনেটের ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা এফডব্লিউসিএমএস-এর পরিবর্তে ফোমেমা প্রবর্তন করতে চাচ্ছেন তারা। এরই অংশ হিসেবে ফোমেমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঢাকায় ৩ দিনে ৪৫টি মেডিকেল সেন্টারও পরিদর্শন করবেন। মূলত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার দায়িত্ব ফোমেমার কাছে ন্যস্ত করে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি নিয়ন্ত্রণে আরেকটি সিন্ডিকেট তৈরির চেষ্টা হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন এ খাত সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জিটুজি প্লাস চুক্তির আলোকে বিগত দিনে একচেটিয়া ব্যবসা করেছেন ১০ রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক। যার মূলে ছিলেন দাতো শ্রী আমিন নুর। এবার আমিন নুরের পরিবর্তে দাতো আবু হানিফকে সামনে রেখে আরেকটি সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠেছে। যারা এই শ্রমবাজারটিতে একচেটিয়া ব্যবসা করতে চাচ্ছেন। মালয়েশিয়ার বেসরকারি ওই প্রতিনিধি দলের সফর সূচি অনুযায়ী জানা যায়, তারা গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। সেখান থেকে গুলশানের একটি ফাইভ স্টার হোটেলে নেয়া হয়। বিকালে ওই হোটেলেই একটি শ্রমবাজার ও শ্রমিকদের হেল্থ চেকাপ সংক্রান্ত প্রক্রিয়া নিয়ে সেমিনার আয়োজন করা হয়। সেখানে একটি প্রেজেন্টশনও দেয়া হয়। এই প্রতিনিধি দলের চারদিনের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আজ সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, বেলা ১১টায় প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে তাদের বৈঠক হবে বলে সূচিতে উল্লেখ রয়েছে। এরপর দুপুর আড়াইটায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যাবেন এই প্রতিনিধি দল। বেলা ২.৩০ থেকে বিকাল ৩.৩০টার মধ্যে যেকোনো সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এই দুটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর শিডিউলে মালয়েশিয়ার প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি নেই বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা রাশেদুজ্জামান বলেন, মন্ত্রীর শিডিউলে এ ধরনের কোনো প্রোগ্রাম নেই। প্রতিমন্ত্রীর পিএস আহমেদ কবির জানান, শুনেছি মালয়েশিয়া থেকে একটি বেসরকারি দল বাংলাদেশে আসছে। তবে মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হবে এটা জানা নেই। শিডিউলে নেই। একই কথা বলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র জনসংযোগ কর্মকর্তা পরীক্ষিত চৌধুরীও। বিকাল ৪টায় বায়রা ভবনে বায়রা সভাপতি বেনজীর আহমেদের সভাপতিত্বে একটি বৈঠক হবে। বিষয়টি নিশ্চিত করে সংগঠনের মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান এই প্রতিবেদককে বলেন, ফোমেমার একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসেছে। তারা শ্রমিকদের মেডিকেল সেন্টার কেন্দ্রিক বিষয় নিয়ে কাজ করছে বলে জানি। শ্রমবাজার ফের চালু হওয়ার আগে এটি প্রাথমিক প্রক্রিয়া। এদিকে বিশিষ্ট জনশক্তি ব্যবসায়ী আব্দুল আলীম (এসএ ট্রেডার্স) এই প্রতিবেদককে বলেন, সফররত এই টিম মালয়েশিয়া সরকারের কেউ নন। তারা এখানে (ঢাকা) এসেছে মেডিকেল সেন্টারের অ্যাপ্রুভাল নিতে। তারা প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন বলে শুনেছি। কিন্তু মন্ত্রী এই বেসরকারি টিমকে সাক্ষাৎ দিবেন কি দিবেন না, সেটা তার বিষয়। তবে মালয়েশিয়ার বেসরকারি মেডিকেল চেকাপ সেন্টারগুলোর সংগঠন ফোমেমার ও সফরতদের সামগ্রিক কার্যক্রম তুলে ধরে প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন বলে জানান আব্দুল আলীম।

সিশেলস-এ জনশক্তি প্রেরণে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত
এদিকে গতকাল সকালে রাজধানীর ইস্কাটনস্থ প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে পূর্ব আফ্রিকার দেশ সিশেলস এবং বাংলাদেশের মধ্যে জনশক্তি প্রেরণের বিষয়ে খসড়া চূড়ান্ত করণের লক্ষ্যে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব রৌনক জাহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক (বিএমইটি) মো. সেলিম রেজা, বোয়েসেল-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইয়ামীন আকবরী, মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. ফজলুল করীম, মো. জাহাঙ্গীর আলম, নাসরীন জাহান, মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মনির হোসেন চৌধুরী, ড. মাসুমা পারভীন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের উপসচিব সাগরিকা নাসরিন, বিএমইটির পরিচালক (কর্মসংস্থান) ডিএম আতিকুর রহমান, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের পরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। সভায় ভারপ্রাপ্ত সচিব রৌনক জাহান বলেন, বর্তমান সরকারের দক্ষ ও সফল কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের জন্য নতুন নতুন শ্রমবাজার উন্মুক্ত হচ্ছে। সিশেলস সরকারের চাহিদার ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকার দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের পরিকল্পনা করেছে। এতে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিটেন্স বৃদ্ধির সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত