শিরোনাম

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আন্দোলনে বিএনপি ও বামজোট

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম  |  ০০:১৯, জানুয়ারি ১২, ২০১৯

ভোট ডাকাতি অনিয়মের নানা চিত্র এবার ডকুমেন্ট আকারে আদালত ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরবে বিএনপি-বামজোট। এর আগে নানা অনিয়ম, কারচুপি ও সহিংসতার অভিযোগ এনে গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট ও বামজোটগুলো। গত ৩-৪ দিন বিএনপি তাদের প্রার্থীদের মাধ্যমে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনভিত্তিক অনিয়মের চিত্র তথ্য-উপাত্ত দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জমা নিচ্ছেন। নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে মামলার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রার্থীদের কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই এ তথ্য জমা নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে দলটি। এ নিয়ে খুব শিগগিরই মামলা করা হবে বলেও জানিয়েছেন দলের নেতারা। এদিকে গতকাল নির্বাচনে ভোট ডাকাতি ও কেন্দ্র দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেছেন বাম গণতান্ত্রিক জোটের প্রার্থীরা।গতকাল শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাম গণতান্ত্রিক জোটের উদ্যোগে আয়োজিত গণশুনানিতে বাম জোটের প্রার্থীরা ভোটের রাতে ও ভোটের দিনের যত অভিযোগ তুলে ধরেন। সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হওয়া গণশুনানি চলে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। গণশুনানিতে ১৩১ জন প্রার্থী নির্বাচনের দিনে অনিয়মের কথা তুলে ধরেন। বিএনপি ও বামজোটের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগামী ৩-৪ দিনের মধ্যে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা বিদেশ সফর করবেন। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশে ভোট ডাকাতির ভিডিও চিত্র এবং নানান ডকুমেন্ট নিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করবেন তারা। এ ছাড়াও নির্বাচনের আইনগত বৈধতা প্রশ্নে আদালতে বিচার চাওয়ার বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরবেন। তাই বিদেশ সফরের আগেই বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়া ভোট জালিয়াতির চিত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে। দলীয় প্রার্থীদের মাধ্যমে শতশত ভিডিও চিত্র বিএনপি সংগ্রহ করেছে বলেও জানা যায়। ড. কামাল ও মির্জা ফখরুল কখন দেশের বাইরে যাবেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঐক্যফ্রন্টের মিডিয়া উইং কর্মকর্তা লতিফুল বারী হামিম আমার সংবাদকে জানান, ড. কামাল হোসেন ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের বাইরে যাচ্ছেন কিনা তার জানা নেই। লতিফুল বারী হামিম বলেন, ড. কামাল হোসেন আন্তর্জাতিক ল ইয়ার, তিনি সবসময় দেশের বাইরে সফর করেন এটা নতুন কিছু নয়। আর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের একটি শীর্ষ রাজনৈতিক দলের নেতা। বহু কারণে তাকে দেশের বাইরে যেতে হয়। তবে আগামী শপ্তাহে এ দুজন ভোট চিত্রের ভিডিও নিয়ে দেশের বাইরে যাচ্ছেন বলে ঐক্যফ্রন্টের একটি সূত্র আমার সংবাদকে নিশ্চিত করেছেন। এর আগেই অভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করছে বিএনপি। টাকা দিয়ে ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও প্রশাসন থেকে ভোট জালিয়াতির ভিডিও কিনতেছে দলটি। বিএনপির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রের দাবি, ভোট জালিয়ায়তির ইঙ্গিত পেয়ে বিএনপি ক্ষমতাসীন দলের অর্থলোভী ও প্রশাসনের বড় একটি সিন্ডিকেটকে আগ থেকেই টার্গেট করে। যারা ভোটের দিন কেন্দ্রে থাকবে। এ জন্য তাৎক্ষণিক অর্থবরাদ্দ করে দলটি। যারা ভোটের রাতে ও ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে সরকারি দলের বেজ পড়ে থাকবে আর অনিয়মের চিত্র গোপনে তুলে রাখবে। পরে বিএনপির কাছে গোপন ভিডিওগুলো হস্তান্তর করবে। সে সেটাপেই বিএনপি এরই মধ্যে কয়েকশ ভিডিওচিত্র ওদের মাধ্যমে হাতে পেয়েছে বলে জানা গেছে। এসব ডকুমেন্টের ভিত্তিতেই আদালতে যাবে বিএনপি। এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন জানান, উচ্চ আদালতে নির্বাচনে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে ও একাদশ জাতীয় নির্বাচন বাতিলের আবেদন জানিয়ে শিগগিরই মামলা করা হবে বলে জানান। তিনি বলেন, যিনি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি আইনসম্মতভাবে হননি, তার পদটি বাতিল করে যিনি আবেদন করেছেন তাকে সংসদ সদস্য ঘোষণা করা যেতে পারে অথবা পুরো নির্বাচনটিই বাতিল চেয়ে পুনঃতফসিল ঘোষণার দাবি করা যেতে পারে।এ নিয়ে খুব শিগগিরই দেশি ও আন্তর্জাতিক আদালতে শরণাপন্ন হবে ঐক্যফ্রন্ট ও সরকারবিরোধী দলগুলো। তাই এর আগেই বাম গণতান্ত্রিক জোট, বামফ্রন্ট, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও সরকারের বাইরে থাকা সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করতে চায়। এদিকে নির্বাচনের পর থেকে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারছে না স্বজনরা। এ নিয়ে দলীয় কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং করে অভিযোগও করেছেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তবে বিএনপির দপ্তর সূত্র জানান, খালেদা জিয়ার সঙ্গে দলের সিনিয়র নেতাদের সাক্ষাতের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অনুমতি চাওয়া হয়েছে। সাক্ষাতের অনুমতি মিললে দলের পরবর্তী প্রদক্ষেপ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কারাগার থেকে খালেদার নির্দেশনা নিয়েই বিএনপি মাঠে নামবে বলে দাবি সূত্রের। অন্যদিকে দেশের প্রশ্নবিদ্ধ এ নির্বাচনকে পজেটিভ আকারেও নিচ্ছেন রাজনৈতিক অঙ্গনের বড় একটি অংশ। নির্বাচনে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টে বামজোটের প্রার্থীরা হারলেও ভোটের চিত্র দেশবাসীকে একটি বড় বার্তা দিয়েছে। দলীয় সরকারের অধীনে যে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না তা স্পষ্ট হয়েছে। ভবিষ্যতে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার কোনো যুক্তিই এখন ধোপে টিকবে না। দেশের সচেতন মানুষ যে সব তরুণ ভোটাররা প্রথম বছরেই ভোট প্রয়োগের অধিকার বাস্তবায়ন করতে পারেনি তাদের কাছে এ ধরনের নির্বাচন কখনোই আর গ্রহণযোগ্যতা আসবে না।গতকাল প্রেস ক্লাবে গণশুনানির বক্তব্যে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম বলেন, গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন নিয়ে বহু অভিযোগ আছে। এটি নজিরবিহীন একটি ভুয়া ভোটের নির্বাচন। বাম গণতান্ত্রিক জোট এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৩১টি আসনে ১৪৭ জন প্রার্থী অংশ নেয়। দিনব্যাপী গতকালের ওই গণশুনানি অনুষ্ঠানে বাম দল থেকে নির্বাচনে অংশ নেয়া ৮০ জন প্রার্থী তাদের নির্বাচনি এলাকায় ভোটের সময়কার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি এবারের জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসন থেকে কোদাল মার্কা নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। গণশুনানিতে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগের দিন রাতেই কেন্দ্র ভেদে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ ভোট সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরে ফেলা হয়েছে। আমরা যারা প্রার্থী ভোট দিতে গিয়েছিলাম, দেখেছি, একটা ভোটকেন্দ্রে ভোটারের তেমন কোনো ভিড় নেই অথচ নয়টা বা সাড়ে নয়টার মধ্যেই ব্যালট বাক্স ভরে গেছে।’ জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে এর মতো কলঙ্কজনক নির্বাচন আর নেই। এটা আমাদের উপলব্ধি করার কথা। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে একটা নির্বাচন হলো, কিন্তু সেই নির্বাচনে জনগণকে অংশ নিতে দেয়া হলো না। সম্পূর্ণভাবে প্রশাসনের কর্তৃত্ব কাজ করেছে।’ তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে থেকেই পুরো একটা একতরফা পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। বিরোধী প্রার্থীদের ওপর হামলা-মামলা-গ্রেপ্তার করে এই পরিবেশ তৈরি করা হয়। মানুষ যাতে ভোটকেন্দ্রে আসতে না পারে, ভয় পায় সে জন্য আগে থেকেই একটা পরিবেশ তৈরি করা ছিল। এটাই তাদের লক্ষ্য ছিল। ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী শম্পা বসু মই মার্কায় নির্বাচনে অংশ নেন। তিনি গণশুনানিতে অভিযোগ করেন, ‘সকালে সেগুন বাগিচা হাইস্কুল ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখি, কেন্দ্রে কোনো ভোটার নেই। অথচ ব্যালট বাক্স ভোটে ভর্তি হয়ে আছে। প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করতেই বললেন, মাত্র ১০০টি ভোট পড়েছে। কিন্তু ব্যালট বাক্স ভর্তি এত ভোট কোথা থেকে এলো?’পঞ্চগড?-২ আসনের বাম দলের প্রার্থী আশরাফুল আলম ভোটের দিনে বিভিন্ন অনিয়মের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভোটের দিনে সরকারি দলের লোকজন ভোটকেন্দ্রে জবর দখল করে রেখেছিল। কাউকে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেয়নি। বিরোধী দলের কোনো পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। ঠিকমতো গণসংযোগ করতে দেয়নি। গাইবান্ধা-১ আসনের প্রার্থী গোলাম রাব্বানী বলেন, ভোট গ্রহণের আগের রাতে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যালট পেপারে সিল মেরে রাখা হয়েছিল। ওই দিন বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের কাউকে ভোটকেন্দ্রের আশপাশে যেতে দেয়া হয়নি। ভোট গ্রহণের আগের রাতে ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি-ধমকি দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পাবনা-১ আসনের প্রার্থী জুলহাসনাইন বাবু বলেন, ভোটের জন্য ঠিকমতো প্রচারণা করতে দেয়া হয়নি। সবসময় আমাদের নেতাকর্মীদের হুমকির মধ্যে রাখা হয়েছে। প্রতি পদে পদে বাধা দেয়া হয়েছে আমাদের। বামজোটের প্রার্থীরা আরও অভিযোগ করেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক কলঙ্কিত নির্বাচন। এমন কলঙ্কজনক নির্বাচন দেশের ইতিহাসে আর হয়নি। নজিরবিহীন ভুয়া ভোটের এই নির্বাচনের আগের দিনই বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রশাসনের সহায়তায় ভোট ডাকাতি হয়েছে। অথচ নির্বাচনের দিন প্রশাসন এসব অনিয়ম ঠেকাতে নিষ্ক্রিয় ছিল। অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সরকার বাম গণতান্ত্রিক জোটসহ বিরোধী দল ও জোটগুলোর কোনো দাবিই মানেনি। সরকার পদত্যাগ করেননি, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠিত হয়নি, জনগণের সমর্থনহীন বিতর্কিত সংসদ বিলুপ্ত করা হয়নি, অকার্যকর ও সরকারি দলের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশনে পরিবর্তন আনা হয়নি। সর্বোপরি নির্বাচনের টাকার খেলা বন্ধসহ অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের ন্যূনতম কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এর পাশাপাশি বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, হয়রানি, হুমকি শাস্তি দেয়া অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে দেশের অধিকাংশ এলাকায় বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে বলে অভিযোগ করেন প্রার্থীরা। তারা অভিযোগ করে বলেন, দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর সংলাপের ফল হিসেবে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের অনুষ্ঠানে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া কিন্তু সরকার ও সরকারি দল সুষ্ঠু নির্বাচনের যুক্তিপূর্ণ ও ন্যায়সঙ্গত কোনো দাবিই মানেনি।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত