বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি অর্থ পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়লো

প্রিন্ট সংস্করণ॥ মো. হাসান আরিফ  |  ০২:৫১, জানুয়ারি ১১, ২০১৯

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির বিষয়টি ফিলিপাইনের আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। এতে চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত পেতে আইনি ভিত্তি মজবুত হলো বাংলাদেশের। চলতি মাসের মধ্যেই মামলা দায়ের করার কথা রয়েছে। এই জন্য ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। তাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই মামলা করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার হস্তান্তর করতে সহায়তা করায় ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের (আরসিবিসি) সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতোকে ৩২ থেকে ৫৬ বছরের কারাদ-ের আদেশ দিয়েছেন দেশটির আদালত। একই সঙ্গে তাকে ১০ কোটি ৯০ লাখ ডলার জরিমানাও করা হয়েছে। যা বাংলাদেশের চুরি যাওয়া অর্থের তুলনায় ২ কোটি ৮০ লাখ ডলার বেশি।বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরিসহ অর্থ পাচারের ৮টি অভিযোগ আনা হয়েছিল মায়া সান্তোস দেগুইতোর বিরুদ্ধে। প্রতিটি অভিযোগের জন্য মায়ার চার থেকে সাত বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়। গতকাল আদালত এই দন্ডাদেশ দেন বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাইবার চুরির ঘটনা বলে মনে করা হয়। এ চুরিতে প্রথম সাজা পেলেন মায়া। এই অবৈধ অর্থপাচার প্রতিরোধে ব্যর্থতার কারণে ২০১৬ সালের আগস্টে আরসিবিসিকে রেকর্ড পরিমাণ প্রায় ১শ কোটি পেসো অর্থাৎ ১ কোটি ৯১ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানা করে ফিলিপিন্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আরসিবিসির সাবেক কোষাধ্যক্ষ এবং যে শাখাটি থেকে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছিল সেখানকার পাঁচজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে। রিজার্ভ চুরির বিষয়ে বাংলাদেশের সিআইডি ইতোমধ্যে একটি মামলা নিয়েছে এবং সিআইডি এ সংক্রান্ত তদন্ত শুরু করে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। এ বিষয়ে ফিলিপিন্সে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়াম রয়টার্সকে বলেছেন, তারা আশা করছেন শিগগিরই একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে এই মামলাটি দ্রুত বিচারের মুখোমুখি হবে। জানা গেছে, এরইমধ্যে ম্যানিলা জাঙ্কেট অপারেটর থেকে চুরি করা অর্থের মাত্র দেড় কোটি ডলার উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়ার জন্য আলোচনা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ ও আইন মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তারা এই মুহূর্তে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, এই মাসের মধ্যেই মামলা দায়ের করার কথা রয়েছে। সেজন্য ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সচিব, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটের প্রধানসহ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিউ ইয়র্কে অবস্থান করছেন। সেখানে তারা এই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে মামলা করবেন বলে জানান তিনি। মামলা করার পর বাংলাদেশ ব্যাংক তার সমস্ত অর্থ ফেরত পাবে বলে তিনি আশাবাদী। তবে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কবে নাগাদ পুনরুদ্ধার হতে পারে সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে কিছু জানাতে পারেননি। জানা গেছে, মূলত অর্থ উদ্ধারের লক্ষ্যেই এই মামলা করা হচ্ছে। মামলার রায় ঘোষণার পরই অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে। তবে চলতি মাসের মধ্যে নাহলে ফেব্রুয়ারির মধ্যেই মামলা করার সময় চূড়ান্ত করা হয়েছে। নিউ ইয়র্কে এই অর্থ চুরির পেছনে জড়িত পক্ষগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করার বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আরসিবিসির মুখপাত্র থে ডায়েপ এক বিবৃতিতে বলেছেন, দেগুইতোর বিরুদ্ধে দ-াদেশ দেয়া হয়েছে কারণ তিনি একজন অসৎ কর্মকর্তা ছিলেন এবং এই রায় ব্যাংকে তার যে অবস্থান তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর আরসিবিসি ব্যাংক পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। তবে দেগুইতো এখন কারাগারে নেই কারণ তিনি জামিন চেয়ে যে আবেদন করেছিলেন সেটা তার বিরুদ্ধে দন্ডাদেশ চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকবে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন দেগুইতোর এক আইনজীবী জোয়াকুইন হিজোন। তার অপর আইনজীবী, দেমেত্রিও কাস্টোডিও রয়টার্সকে বলেন, দেগুইতোর বেকসুর খালাসের জন্য তারা গতকাল বৃহস্পতিবারের এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করবেন। এছাড়া নিউজ চ্যানেল এএনসির সাথে আলাদা সাক্ষাৎকারে কাস্টোডিও বলেন, এমন অনেক লোক আছে যার এই ঘটনার জন্য দেগুইতোর মতো ব্যাংক কর্মকর্তার চাইতেও বেশি দায়বদ্ধ। কেননা, ব্যাংক পরিচালনার এই বিষয়টিতে তার কিছু করার নেই। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক (ফেড) থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। এর মধ্যে একটি মেসেজের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কায় একটি ‘ভুয়া’ এনজিওর নামে ২০ মিলিয়ন ডলার সরিয়ে নেয়া হলেও বানান ভুলের কারণে সন্দেহ হওয়ায় শেষ মুহূর্তে তা আটকে যায়। বাকি চারটি মেসেজের মাধ্যমে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার সরিয়ে নেয়া হয় ফিলিপিন্সের মাকাতি শহরে রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকের জুপিটার স্ট্রিট শাখায়। পরে ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের মাকাতি শাখার মাধ্যমে তা ক্যাসিনো ও বিভিন্ন ব্যক্তির হাতে চলে যায়। অর্থ পাচারের এই কাজে আরসিবিসির মাকাতি শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে সরাসরি জড়িত ছিলেন মায়া সান্তোস দেগুইতো। ফিলিপাইনের মাকাতি শহরের আরসিবিসি শাখার মাধ্যমে ওই অর্থ ফিলিপাইনে আসার পর তা মুদ্রা লেনদেনকারী ফিলরেম নামের এক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চলে যায় তিনটি ক্যাসিনোর কাছে। সিএনএন ফিলিপাইনের প্রতিবেদনে বলা জয়, মায়া সান্তোস দেগুইতো যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক থেকে অর্থ আনা এবং তা চারটি অজ্ঞাত ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে জমা করার বিষয় নিজে তদারকি করেছিলেন বলে আদালত রায়ে উল্লেখ করেছেন। ফিলিপাইনের মাকাতি শহরের আরসিবিসি শাখার মাধ্যমে ওই অর্থ ফিলিপাইনে আসার পর তা মুদ্রা লেনদেনকারী ফিলরেম নামের এক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চলে যায় তিনটি ক্যাসিনোর কাছে। এভাবে হাতবদল হয়ে সবশেষে ফিলরেমের মাধ্যমে ওই আট কোটি ডলার ফিলিপাইন থেকে আবার অন্য দেশে পাচার হয়ে যায়। এতে ওই ব্যাংকের তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতো সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ পায় ডিওজে। এ জন্য আরসিবিসি থেকে বরখাস্ত হন তিনি। গত বছরের আগস্টে ফিলিপাইন সরকার তাকে এ কারণে গ্রেপ্তারও করে। মায়া সান্তোস দেগুইতো সব সময় অর্থ পাচারের ঘটনার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করে এসেছেন। তার দাবি, আরসিবিসির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাকে কিছু কাজ করতে হয়েছে। আদালত গতকাল ২৬ পৃষ্ঠার রায়ে বলেন, অর্থ লেনদেনে তার কিছুই করার ছিল না বলে মায়া আদালতে যে কথা বলেছেন, তা একেবারে নির্জলা ও বড় ধরনের মিথ্যা। ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এই সাইবার জালিয়াতির ঘটনা জানাজানি হলে ফেব্রুয়ারির শুরুতে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের মানুষ বিষয়টি জানতে পারে ঘটনার এক মাস পর, ফিলিপিন্সের একটি পত্রিকার খবরের মাধ্যমে। বিষয়টি চেপে রাখায় সমালোচনার মুখে গভর্নরের পদ ছাড়তে বাধ্য হন আতিউর রহমান; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষপর্যায়ে আনা হয় বড় ধরনের রদবদল। এর মধ্যে একটি ক্যাসিনোর মালিকের কাছ থেকে দেড় কোটি ডলার উদ্ধার করে বাংলাদেশ সরকারকে বুঝিয়ে দেয়া হলেও বাকি অর্থ উদ্ধারে এখনো তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। বাংলাদেশের রিজার্ভ থেকে চুরি যাওয়া অর্থ ফিলিপিন্সে ঢোকার বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে দেশটির সিনেট কমিটি তদন্ত শুরু করে। ওই ঘটনায় সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার পর আরসিবিসি তাদের শাখা ম্যানেজার দেগিতোকে বরখাস্ত করে।