শিরোনাম

‘সেভ শিবির’থেকে কুমিল্লা সিন্ডিকেট!

প্রিন্ট সংস্করণ॥নিজস্ব প্রতিবেদক  |  ০০:৫৯, জানুয়ারি ১০, ২০১৯

ছাত্রশিবিরে গ্রুপিং! দলীয় কোন্দলে জামায়াত কার্যালয়ে তালা! দলীয় প্রোগ্রাম থেকে শীর্ষ নেতাকে বয়কট করার ক্যু অধ্যায় কুমিল্লা শিবিরে বহুদিন থেকে। স্থানীয় রাজনীতির আদর্শে বিব্রত কেন্দ্রীয় শিবিরও। বিগত কয়েক বছর সেন্ট্রাল কমিটি কুমিল্লা সিন্ডিকেটের দাপটেই হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে তৃণমূলের ত্যাগী নেতা, আধ্যাত্মিক যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা অকারণেই সংঠন থেকে ছুটি পেয়ে যাচ্ছে। অনেককে কৌশলগত কারণ দেখিয়ে বিদায় দেয়া হচ্ছে। গতকাল ছাত্রশিবিরের ২০১৯ সেশনের জন্য কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচন ও সেক্রেটারি জেনারেল মনোনয়ন সম্পন্ন করা হয়। অনলাইনে সারা দেশের শিবিরের প্রথম সারির নেতাদের ভোটে কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন মোবারক হোসাইন। সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে মনোনীত হন সিরাজুল ইসলাম। এরপরই জামায়াত ও শিবিরের বড় একটি অংশ থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা। অকারণেই এবার সিনিয়র অনেক শিবির নেতাকে বিদায় দেয়া হচ্ছে! তাদের কয়েকজনের নাম আমার সংবাদ জানতে পারলেও প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কুমিল্লা সিন্ডিকেটে ৪২ বছরের ইতিহাসে ইসলামী ছাত্রশিবিরে এবারো বিতর্কিত কমিটি গঠন করা হয়েছে। যা ছাত্রশিবিরের ঐতিহ্য বিরোধী বলে একটি অংশের দাবি। ইয়াছিন আরাফাত সভাপতি থেকে বিদায় নেয়ার আগেই তারই জেলার মোবারক হোসাইনকে সভাপতি হিসেবে পাকাপোক্ত করে যান। এবং অনেককে কৌশলে বিদায় দিতে বাধ্য করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এতদিন প্রায় অভ্যন্তরীণ কোন্দলমুক্ত থাকলেও এ মুহূর্তে সভাপতি ও সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভক্ত হয়ে পড়েছে মৌলবাদী এই সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এর পেছনে রাজশাহী সিন্ডিকেট কাজ করেছে বলে জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে কুমিল্লা মহানগরী শিবির কয়েকধাপে বিভক্ত রয়েছে। একটি হচ্ছে কুমিল্লা-চাঁদপুর গ্রুপ অন্যটি স্থানীয় গ্রুপ। ২০১৩ সালে দলীয় কোন্দলে শিবিরের কুমিল্লা মহানগরী অফিসে তালা লাগিয়ে দেয় স্থানীয় গ্রুপ। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের ইতিহাসের ক্যু অধ্যায় রচিত হয় স্থানীয় শিবির থেকে। পরে তখনকার শিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল জব্বার ঘটনাস্থলে গিয়ে রফাদফার পরও তালা খুলতে ব্যর্থ হোন। একপর্যায়ে স্থানীয় গ্রুপের তোপের মুখে তালা না খুলেই ঢাকায় ফিরে আসেন জব্বার। সূত্রের দাবি, সেদিনের ক্ষমতা অপব্যবহার আধিপত্যের অন্তরালে ছিলো এখনকার শিবিরের সদ্য বিদায়ী সভাপতি ইয়াছিন আরাফাত ও সেক্রেটারি থেকে সভাপতি হওয়া মোবারক হোসাইন। শিবিরের প্রোগ্রাম থেকে জামায়াত নেতাকে লাঞ্ছিত ও বয়কটের ঘটনাও ঘটে কুমিল্লার স্থানীয় শিবির থেকে। এছাড়া আরও ক্যু অধ্যায় জানা যায়, ২০১০ সালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয় সম্মেলন। তখন সভাপতি পদে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হন মুহাম্মদ রেজাউল করিম। কিন্তু সেক্রেটারি জেনারেলের পদ থেকে ছিটকে পড়েন শিশির মুহাম্মদ মুনির। এ পদে নির্বাচিত হন ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন। শিবিরের বড় একটি অংশ সেক্রেটারি পদে মামুনের আসাকে গ্রহণ করলেও মেনে নিতে পারেননি সভাপতি পদে রেজাউল করিমের দ্বিতীয় মেয়াদে আসাকে। কারণ নির্বাচনের আগে থেকেই ভেতরে ভেতরে সভাপতি পদে শিশির মোহাম্মদ মনিরের আসার সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছিল। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতাকর্মীদেরও এই বিষয়টিতে ব্যাপক সমর্থন ছিল। এছাড়া অনেক আগে থেকেই সভাপতি রেজাউল করিমের পেছনে জামায়াতের কয়েক কেন্দ্রীয় নেতার আশীর্বাদ থাকার অভিযোগ ছিল। ইন্টারনেটের মাধ্যমে মেইল পাঠিয়ে বিদ্রোহী গ্রুপ রীতিমতো সতর্ক করে দেয় জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বকে। বিভিন্ন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত মেইল নম্বরে একটি মেইল পাঠানো হয় ‘সেভ শিবিরের’ ঠিকানা থেকে। যেখানে বলা হয়েছে, ‘প্রিয় সাংবাদিক ভাইয়েরা, শিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল ড. মামুন ভাই পদত্যাগ করেছেন। লাস্ট পরিষদ মিটিংয়ে মামুন ভাই পদত্যাগ করেছেন। তার পদত্যাগের কারণ হলো, বর্তমান প্রেসিডেন্ট রেজাউল করিমের দুর্নীতি, জামায়াত নেতা মুজাহিদ ও রফিকুল ইসলামসহ অনেকের নগ্ন অসাংবিধানিক হস্তক্ষেপ। এই দুর্নীতিবাজ প্রেসিডেন্টের আন্ডারে সেক্রেটারি হয়ে তিনি কাজ করবেন না বলেই পদত্যাগ। সেভ শিবিরের পর্বে বলা হয়, আমরা ইসলামের দুশমন রেজাউল করিমের পদত্যাগ চাই। আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি- আল্লাহ তুমি রেজাউল করিম, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, রফিকুল ইসলাম খানসহ যারা শিবিরের ক্ষতি করল দুনিয়াতেই তুমি তাদের শাস্তি দিও। বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সংঘবদ্ধ সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির। যে সত্য ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল ছাত্রশিবির সে ভিত আজ নড়বড়ে হয়ে উঠেছে। সমাজের সাধারণ মানুষ ও শুভাকাক্সক্ষীদের দোয়া ও সৎ পরামর্শ যেখানে ছাত্রশিবিরকে জনগণের মনের কোঠায় স্থান করে দিয়েছে, আজ সে সংগঠন জনশক্তি ও শুভাকাক্সক্ষীদের কাছে হতে বসেছে প্রশ্নবিদ্ধ। এদিকে গতকাল শিবিরের সদ্য কমিটি নিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, ৯ জানুয়ারি সকাল ১০টায় ছাত্রশিবিরের সহকারী নির্বাচন কমিশনার মতিউর রহমান আকন্দের পরিচালনায় রাজধানীর শহীদ আব্দুল মালেক মিলনায়তনে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সম্মেলনে নবনির্বাচিত কেন্দ্রীয় সভাপতির নাম ঘোষণা করেন ছাত্রশিবিরের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক তসলিম আলম। ছাত্রশিবিরের সংবিধান অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সভাপতি ২০১৯ সেশনের জন্য কার্যকরী পরিষদের সঙ্গে পরামর্শ করে সিরাজুল ইসলামকে সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে মনোনয়ন দেন। নবনির্বাচিত কেন্দ্রীয় সভাপতি ড. মোবারক হোসাইন এর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি, কেন্দ্রীয় শিক্ষা সম্পাদক, সাহিত্য সম্পাদক, দপ্তর সম্পাদক ও ২০১৭-২০১৮ সেশনে সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। উল্লেখ্য, নবনির্বাচিত সভাপতি ড. মোবারক হোসাইন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ, নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ, সিটি ইউনিভার্সিটি থেকে এলএলবি সম্পন্ন করার পর ভারতের রাজস্থানের শ্রী জে জে টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টিং (সিএমএ) বিষয়ে অধ্যয়নরত আছেন। নব মনোনীত সেক্রেটারি জেনারেল সিরাজুল ইসলাম এর আগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সভাপতি, কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি সম্পাদক, বিজ্ঞান সম্পাদক, সাহিত্য সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগে স্নাতক ও একই বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি অন্য আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ-তে অধ্যয়নরত আছেন।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত