শিরোনাম
কুচক্রীমহলের ইন্ধনের শঙ্কা

পোশাক শ্রমিকদের বেপরোয়া আন্দোলন

প্রিন্ট সংস্করণ॥হাসান-উজ-জামান  |  ০০:৫০, জানুয়ারি ১০, ২০১৯

পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের তৃতীয় দিনে তাদের দাবি বাস্তবায়নে মন্ত্রীর আশ্বাসের পরও গতকাল চতুর্থ দিনে ফের রাস্তা অবরোধ করেছে তারা। দিনে দিনে শ্রমিক আন্দোলনের নামে সহিংস ঘটনার পেছনে কোনো কুচক্রীমহলের ইন্ধন রয়েছে বলে আশঙ্কা করেছেন সংশ্লিষ্টরা। শ্রমিক সংগঠনের দুই নেতার গার্মেন্ট আন্দোলন নিয়ে ফোনালাপ ফাঁসে এ সন্দেহের দানা যেন আরও ঘনীভূত হয়। গত মঙ্গলবার পুলিশের সাথে শ্রমিকদের ব্যাপক সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটে। এরই প্রেক্ষিতে যেকোনো ধরনের নাশকতারোধে গতকাল সকাল থেকেই বিজিবি মোতায়েন ছিলো সাভার ও আশুলিয়ায়। কারখানাগুলোর সামনে পুলিশের জলকামানসহ সাঁজোয়া যান রয়েছে। এর মধ্যেও আন্দোলনে উত্তাল ছিলো ওইসব এলাকা। হয়েছে দফায় দফায় সংঘর্ষ। এতে আহত হয়েছে অন্তত ২০ জন। বেশকটি কারখানা ভাঙচুর হয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে শতাধিক কারখানা ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এদিকে গতকাল বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সী জানিয়েছেন, আগামী এক মাসের মধ্যে গার্মেন্ট শ্রমিকদের সমস্যা সমাধান করা হবে। তিনি গার্মেন্ট শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। শ্রমিকদের সকল ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করে তাদের পাশে থেকে সার্বিক সহায়তা করে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো। কিন্তু শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের যৌক্তিকতা রয়েছে বলে উল্লেখ করলেও তাদের সাথে এখনো সরাসরি কোনো সংগঠন মাঠে নামার কথা স্বীকার করেনি। সরকারি মজুরি কাঠামো বৃদ্ধি, বাস্তবায়নের দাবি ও সাভারে পুলিশের গুলিতে সহকর্মী নিহতের ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল বুধবার চতুর্থদিনের মতো আন্দোলনে শ্রমিকরা। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে মিরপুরের কালশীর ২২তলা ভবনের সামনে ও সাড়ে ৯টা থেকে সাভারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে পোশাক শ্রমিকরা। এতে করে ওই এলাকার সড়কে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ বাধা দিতে গেলে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় পুলিশের লাঠিচার্জে অন্ততঃ ১০ জন আহত হয়। গাজীপুরের কাশিমপুর বোর্ড বাজারসহ আশপাশের এলাকার শ্রমিকরা মহাসড়কে বিক্ষোভ করে। গাজীপুরা এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবরোধ করতে চাইলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ওই সময় ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবরোধ করায় কিছুক্ষণের জন্য যান চলাচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় পুলিশ বাধা দিলে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা বিভিন্ন কারখানায় ভাঙচুর চালায়। ভাঙচুর করে বেশকিছু যানবাহন। পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে দিগন্ত সোয়েটার কারখানা, কস্ট কোস্ট কারখানা, বডি ফ্যাশনসহ শতাধিক কারখানা ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। শিল্প পুলিশ-১-এর পরিচালক সানা শামীনুর রহমান জানান, বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা সকাল ৯টা থেকে বাইপাইল আবদুল্লাহপুর মহাসড়কের এশিয়া এবং সাভারের হেমায়েতপুরের নরসিংহপুর এলাকা প্রায় এক ঘণ্টা অবরোধ করে রাখে। গাজীপুর মহানগরের কোনাবাড়ি চান্দনা চৌরাস্তা টঙ্গী কাশিমপুরসহ শিল্প এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর জানান, পোশাক শ্রমিকদের বিশৃঙ্খলা রোধে গাজীপুরের টঙ্গী, গাজীপুরা, হোতাপাড়া, কোনাবাড়ী ও মৌচাক এলাকায় ৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বুধবার সকাল থেকে বিজিবি সদস্যরা টহল দেয়। স্থানীয় কয়েকটি কারখানার কর্মকর্তারা জানান, কারখানা কর্তৃপক্ষ সরকার নির্ধারিত বেতন-ভাতা শ্রমিকদের দিচ্ছে। কিন্তু বহিরাগত কিছু শ্রমিক বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের জোরপূর্বক কারখানা থেকে বের করে সড়কে গ-গোল করছে। ভুল ধারণা থেকে শ্রমিকরা অযৌক্তিকভাবে এ আন্দোলন করছে। শ্রমিক বিক্ষোভের মুখে সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পল্লবী থানার পরিদর্শক (অপারেশন) ইমরানুল হাসান প্রিন্স জানান, সকাল থেকে রাস্তা অবরোধ করে তাদের ন্যায্য বেতনের দাবিতে আন্দোলন করে শ্রমিকরা। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির মালিকরা শ্রমিকদের আশ্বস্ত করলে বেলা ১টায় তারা অবরোধ প্রত্যাহার করে। এর পরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। শুরু হয় যান চলাচল। বেতন কাঠামোতে বৈষম্য দূর করাসহ বিভিন্ন দাবিতে ৬ জানুয়ারি থেকে আন্দোলনে নামে পোশাক শ্রমিকরা। এরই প্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার শ্রম ভবনে আয়োজিত পোশাক শ্রমিক-মালিক ও সরকারের ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়। এতে গত ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া পোশাক শ্রমিকদের বেতন কাঠামোতে কোনো বৈষম্য বা অসঙ্গতি থেকে থাকলে চলতি জানুয়ারি মাসের মধ্যেই তা সংশোধন করা হবে। ফেব্রুয়ারিতে সংশোধিত গ্রেডিংয়েই বেতন পাবেন তারা। বৈঠকে এ সমস্যা সমাধানে কমিটি গঠনেরও সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এর পরেও গতকাল আন্দোলন অব্যাহত করে শ্রমিকরা। এদিকে শ্রমিকদের সাথে কোন কোন সংগঠন একাত্মতা প্রকাশ করেছে তা জানা যায়নি। একাধিক কারখানা মালিক বলেছেন, এর পেছনে কোনো কুচক্রীমহলের ইন্ধন আছে। যারা নিজেদের স্বার্থে কিংবা রাজনৈতকি মাঠ ঘোলা করতে শ্রমিকদের উসকে দিচ্ছেন। সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট এবং আওয়াজ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক নাজমা আক্তার গতকাল আমার সংবাদকে বলেন, শ্রমিকদের দাবিগুলো সঠিক, যুক্তিসঙ্গত এবং সময়ের দাবি। তবে আন্দোলনের প্রক্রিয়া ঠিক নয়। রাস্তায় নয়। শ্রমিকদের আন্দোলন হওয়া উচিত নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানভিত্তিক। রাস্তায় বিশৃঙ্খলা, ভাঙচুর, নৈরাজ্য, ত্রাস সৃষ্টি করা শ্রমিকের কাজ নয়। এতে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলনও সঠিক নয়। একদিন উত্তরা-আবার পরে দিন গাজীপুর। এটা আন্দোলন নয়। নাজমা আরও বলেন, যেহেতু শ্রমিকদের নিয়ে আন্দোলন করি সেহেতু আমার সংগঠনের পক্ষ থেকেও শ্রমিকদের সাথে এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার কথা। কিন্তু আমি ভাঙচুরের আন্দোলনের সমর্থক নই। তাহলে কোন সংগঠন শ্রমিকদদের সাহস ও ইন্ধন দিচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি শ্রমিক আন্দোলনের মুখপাত্র গোয়েন্দা সংস্থার নই। গোয়েন্দা সংস্থা ভালো বলতে পারবে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত