শিরোনাম
সরকারের নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি

অভিভাবকদের জিম্মি করে চলছে ভর্তি বাণিজ্য

প্রিন্ট সংস্করণ॥রাসেল মাহমুদ  |  ০০:৩৩, জানুয়ারি ১০, ২০১৯

নতুন বছর আসলেই শুরু হয় স্কুল ভর্তি প্রক্রিয়া। এ সময় শিক্ষার্থীরা নতুন ক্লাসে উঠার আনন্দে বিভোর থাকে। উচ্ছ্বাস আর আনন্দে মুখর থাকে শিশু শিক্ষার্থীরা। তবে শিশুরা যতটুকু আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের সাথে নতুন ক্লাসে ভর্তি হয়, ঠিক ততটাই উৎকণ্ঠায় থাকেন অভিভাবকরা। বছরের শুরুতে সন্তানের স্কুল ভর্তির আনন্দ অনেকাংশে ফিকে হয়ে যায় বাবা-মার। কারণ প্রায় প্রতি বছরই রাজধানীর স্কুলগুলো শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ফি আদায় করে থাকে। এ বছরও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। এবারো রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তিতে অতিরিক্ত ফি নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্কুল ভর্তির ক্ষেত্রে সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেও তা মানছে না রাজধানীর অধিকাংশ স্কুল। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত ফি নিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করছে। এমনকি সরকারের নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। আর প্রতিষ্ঠানগুলোর এই স্বেচ্ছাচারিতায় বিপাকে পড়েছেন অভিভাবকরা।জানা যায়, চলতি বছরের বেসরকারি স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তি নীতিমালা প্রকাশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নীতিমালায় বলা হয়, ঢাকা মহানগরে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তিতে ৫ হাজার টাকার অতিরিক্ত ফি আদায় করা যাবে না। এই ফি আংশিক এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মাসিক বেতন, সেশন চার্জ ও উন্নয়ন ফিসহ বাংলা মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৮ হাজার টাকা এবং ইংরেজি ভার্সনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা। প্রতিষ্ঠানগুলো এর থেকে বেশি টাকা নিতে পারবে না। নীতিমালায় আরও বলা হয়, একই প্রতিষ্ঠান থেকে বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের এক শ্রেণি থেকে পরের শ্রেণিতে ভর্তিতে সেশন চার্জ নেয়া গেলেও পুনঃভর্তি ফি নেয়া যাবে না। ভর্তি ফরম এবং ভর্তি ফি বাবদ সরকার নির্ধারিত অর্থের অতিরিক্ত অর্থ আদায় করলে এমপিও বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাছাড়া মফস্বল এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে সেশন ফিসহ সর্বোচ্চ ভর্তি ফি হবে ৫০০ টাকা, পৌর (উপজেলা) এলাকায় ১ হাজার টাকা, পৌর (জেলা সদর) এলাকায় ২ হাজার টাকা এবং ঢাকা ছাড়া অন্যান্য মেট্রোপলিটন এলাকায় সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারের নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভর্তির সময় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা। তারা বলছেন, কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারের নীতিমালার তোয়াক্কা না করে নিজেদের ইচ্ছেমতো ফি নির্ধারণ করছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে ক্লাসভেদে ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা বেশি করে নিচ্ছে। সরকার নির্ধারিত ফির মানি রিসিপ্ট দিলেও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাকি টাকার কোনো কাগজপত্র দিচ্ছে না। বেতন, পরীক্ষার ফি ছাড়াও বিভিন্ন উন্নয়নের জন্য অতিরিক্ত এসব টাকা নেয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন অভিভাবকরা। আর এসব অতিরিক্ত ফি-কে বলা হচ্ছে সেশন চার্জ।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ফি আদায় করছে রাজধানীর ধানম-িতে অবস্থিত এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান কাকলী হাই স্কুল এন্ড কলেজ। এই প্রতিষ্ঠানটি ভর্তি বাবদ প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ১৫ হাজার ৪০০ টাকা নিচ্ছে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী এই প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত ফি নিচ্ছে ১০ হাজার ৪০০ টাকা। এছাড়া অতিরিক্ত ফি আদায় করছে যাত্রাবাড়ীর শামসুল হক খান স্কুল। এ স্কুলটি ভর্তি ফি হিসেবে শিক্ষার্থী প্রতি আদায় করছে ১৪ হাজার ৪০০ টাকা। খিলগাঁও ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল নিচ্ছে ১৭ থেকে ১৮ হাজার। অতিরিক্ত ফি আদায় করছে ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলও। এ প্রতিষ্ঠানটিও শিক্ষার্থী প্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা বেশি আদায় করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ রয়েছে সেন্ট যোসেফ স্কুল, বকশীবাজারের অগ্রগামী শিশুনিকেতন স্কুল এবং জুনিয়র ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের বিরুদ্ধেও। এসব প্রতিষ্ঠান ছাড়াও অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ রয়েছে অন্যান্য একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফি-ই নেয়া হচ্ছে। তবে অতিরিক্ত যে টাকা নেয়া হচ্ছে তা স্কুল উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ। অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছরই একইভাবে বছরের শুরুতেই অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে থাকে। তাছাড়া সারাবছরই বিভিন্ন অজুহাতে আদায় করা হয় অর্থ। এতে বছরজুড়ে প্রতিষ্ঠানভেদে কোটি টাকার বাণিজ্য চলছে। যা শিক্ষা খাতের জন্য লজ্জার এবং অরাজকতার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এই বাণিজ্য এখনই বন্ধ করা না গেলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির অভিভাবকরা বিপদে পড়বেন। বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনও।ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, নতুন ভর্তির ক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠানে সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে ক্লাসভেদে ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা বেশি করে নিচ্ছে। অতিরিক্ত যে টাকা নিচ্ছে তার কোনো কাগজপত্র দিচ্ছে না। আবার নতুন বছর শুরুর সাথে সাথে বেতনও বাড়ানো হয়েছে। সেন্ট যোসেফ স্কুলের শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবার অভিভাবক বলেন, এ প্রতিষ্ঠানে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য ২২ হাজার টাকার বেশি নেয়া হচ্ছে। ভর্তির সময় স্কুল থেকে খাতা, ব্যাগ, ড্রেস বাধ্যতামূলক কিনতে হয়।অগ্রগামী শিশুনিকেতন স্কুলের একাধিক শিক্ষার্থীর অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে ক্লাসভেদে ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা বেশি করে নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। স্কুলের বইয়ে লেখা হচ্ছে মাসিক বেতন, পরীক্ষার ফি এবং কম্পিউটার-প্রজেক্টর ফি। রাজধানীর স্কুলপর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সংগঠন ‘অভিভাবক ঐক্য ফোরাম’-এর সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, প্রতি বছর ভর্তির ফি আর সেশন ফির নামে যেভাবে কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছে তা রীতিমতো অরাজকতার পর্যায়ে চলে গেছে। বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একজন শিক্ষার্থী এক ক্লাস থেকে অন্য ক্লাসে যাবে এটা নিয়ম। কিন্তু ভর্তি ও সেশন ফির নামে যে অতিরিক্ত টাকা নেয়া হয়, তা ঠিক নয়। এখন এটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। এটা বন্ধে সরকারকে কঠোর হতে হবে। তাছাড়া শিক্ষা আইনে এ বিষয়ে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন।জুনিয়র ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. হাবিবুল্লাহ খান বলেন, প্লে থেকে নার্সারিতে ভর্তি ফি বেতনসহ ২৮ থেকে ৩০ হাজার এবং প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি ফি ৩৫ হাজার টাকা। সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি কেন নিচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছুই করার নেই। সরকারের নির্দেশনামতো এত কম ফি নিলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা তো তাও কম নিচ্ছি, অন্যরা আরও বেশি ফি নিচ্ছে।মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মাধ্যমিক শাখার পরিচালক অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, ভর্তি ফি আদায়ের বিষয়টি পর্যবেক্ষণে ১১টি টিম কাজ করছে। অতিরিক্ত ফি নিয়ে কেউ পার পাবে না। সবাইকেই বাড়তি টাকা ফেরত দিতে হবে।মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের চেয়ারম্যান মু. জিয়াউল হক বলেন, কোনো মাধ্যমেই যদি আমাদের কাছে অভিযোগ আসে আমরা তখনই তা খতিয়ে দেখি। কিন্তু সমস্যা হয়ে যাচ্ছে, অভিযোগ প্রমাণ করার জন্য যে কাগজপত্র দরকার তা অনেকাংশেই আমরা পাই না।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত