শিরোনাম
ভিকারুননিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজ

অধ্যক্ষ ও গভর্নিং বডির দুর্নীতির শক্তিশালী সিন্ডিকেট

প্রিন্ট সংস্করণ॥নুর মোহাম্মদ মিঠু  |  ০০:০৯, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৮

*বোর্ড কিংবা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ উপেক্ষা করেই চলছে দুর্নীতি ও অনিয়ম
*গভর্নিং বডির সভাপতি-সদস্যদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়েছে অধ্যক্ষ নাজনীন
*ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ তিন শিক্ষককে বরখাস্ত করেছে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডি
*শনিবার থেকে পূর্ব নির্ধারিত রুটিনে পুনরায় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে

অরিত্রীর মৃত্যুর পূর্বেও বহু আলোচিত ঘটনার জন্মদাতা ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজকে মেয়েদের জন্য ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে অন্যতম মনে করা হতো। ২০১২ সালেও চৈতি রায় নামে নবম শ্রেণির এক ছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনাসহ ভিকারুননিসার ধারাবাহিক অনিয়ম-দুর্নীতির লাগাম না টানাতেই সুনামকে পুঁজি করে কর্তৃপক্ষের করা অবৈধ বাণিজ্যের রেশ টানতে হয়েছে অরিত্রীকে। রাজনৈতিক প্রভাবে পদ দখল করা প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির সদস্যদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মূল শিক্ষা ব্যবস্থাকে এড়িয়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেট করে অবৈধ সব কর্মকা- চালিয়েই যাচ্ছে অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস। অতীতের বিভিন্ন আলোচিত ঘটনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রতিবাদ, সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবোর্ড, শিক্ষা অধিদপ্তর এমনকি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা বা নিয়ম-নীতিকেও পাত্তা দেয়নি ভিকারুননিসা কর্তৃপক্ষের শক্তিশালী এই সিন্ডিকেট। ব্যবসার নেশায় মত্ত হয়েই প্রতিবছর নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে কোটার নাম করে ঘুষ-বাণিজ্যের মাধ্যমে অতিরিক্ত ছাত্রী ভর্তি ছাড়াও চলতি বছরেও প্রতিষ্ঠানটির স্কুল শাখায় আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ২শরও বেশি ছাত্রী ভর্তি করানোর অভিযোগ রয়েছে। অভিভাবকদের অভিযোগের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌসকে এ নিয়ে শোকজ নোটিসও করা হয়েছিলো। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের ওই নোটিসকেও কোনো গুরুত্ব দেয়নি অধ্যক্ষ নাজনীন। শুধু তাই নয়, ২০১৬ ও ২০১৭ সালেও অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তির দায়ে অভিযুক্ত ছিল এই বিদ্যালয়টি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও অধ্যক্ষ নাজনীনসহ সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিগ্রস্ত সিন্ডিকেটের লাগাম টানতে ব্যর্থ হওয়ায় ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্ম দিয়েই যাচ্ছে ভিকারুনিসা কর্তৃপক্ষ। অভিভাবকদের অভিযোগ বাড়তি ছাত্রী ভর্তি করানোর পর নিজেদের বিভিন্ন সমস্যার কারণে তাদের স্কুল থেকে বের করার ধান্দায় মত্ত থাকে তারা। ছাত্রীদের দোষত্রুটিই খুঁজে বেড়ায় সবসময়। ভিকারুননিসাকে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মনে করা হলেও বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। এটি বর্তমানে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শিক্ষকরাও আগের মতো ক্লাসে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ দিয়ে পড়াচ্ছেন না। তাদের মধ্যে কেউ কেউ কোচিং বাণিজ্যে জড়িত। যা চলতি বছরের শুরুর দিকে দুদকের তদন্তে বেরিয়ে আসে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দাবি, বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্টের পেছনে প্রতিষ্ঠানটির তেমন কোনো ভূমিকা নেই। বরং অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের নিরলস প্রচেষ্টা ও মেধাবীরা এখানে ভর্তি হওয়ার কারণেই পরীক্ষায় রেজাল্ট ভালো হচ্ছে। তারা এও বলছেন যে, শিক্ষার নামে ভিকারুননিসা কর্তৃপক্ষের হয়রানিমূলক কর্মকা- বন্ধ ও তাদের বাণিজ্যিক কর্মকা- রোধে গভর্নিং বডিসহ সংশ্লিষ্ট দুষ্টচক্রের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া জরুরি ছিল অনেক আগেই। তা না করায় আজ অরিত্রীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস। অরিত্রীর ঘটনায় সৃষ্ট উত্তালবস্থায় ভিকারুননিসা স্কুলের অধ্যক্ষ ও পরিচালনা কর্তৃপক্ষের বিষয়ে অনুসন্ধান করে জানা যায়, টাকার বিনিময়ে ও তদবিরের মাধ্যমে চলতি শিক্ষাবর্ষেও নির্র্ধারিত আসনের চেয়ে অতিরিক্ত ২০৯ শিক্ষার্থী ভর্তি করেছে কর্তৃপক্ষ। এ ক্ষেত্রে পরিচালনা কমিটির সভাপতিসহ একাধিক সদস্য মূল ভূমিকা রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা অধিদপ্তরে একাধিক অভিযোগ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে কেন অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে এর জবাবও চেয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ১৫ দিনের মধ্যে সে জবাব দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব কামরুল হাসানের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি গত ২৭ মে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষের কাছে পাঠানো হয়। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো জবাব দেয়নি। আর অতিরিক্ত ভর্তিও বাতিল করেনি। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই অতিরিক্ত ২০৯ জনের ভর্তির ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ অভিভাবকদের। তারা বলেছেন, শিক্ষার্থী ভর্তির নামে প্রতিবছরই লাখ লাখ টাকা অবৈধ আয় করেছেন প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা কমিটির কিছু সদস্য। যাদের নেতৃত্বে রয়েছে গভর্নিং বডির সভাপতি ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আশরাফ তালুকদার। অরিত্রীর মৃত্যুর কিছুদিন আগেও প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডি বাতিলের দাবি জানিয়েছিল অভিভাবক ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু। যদিও এ দাবির কোনো পাত্তাই দেয়নি স্কুল কর্তৃপক্ষ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভর্তির আগেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি ভর্তি নীতিমালা জারি করা হয়। এরপরও অযৌক্তিকভাবে সুপারিশের অজুহাত দেখিয়ে নীতিমালা অমান্য করে নামিদামি স্কুলগুলো। ভিকারুননিসা স্কুলও তাই করে। অভিযোগ রয়েছে, গভর্নিং বডির সদস্য মুনসুর আলীসহ সভাপতি ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম আশরাফ তালুকদারের নেতৃত্বেই ভিকারুননিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজে লুটপাট আর অনিয়ম-দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন অধ্যক্ষ নাজনীন বেগম। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক গণমাধ্যমকে বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি যদি এই অনিয়মের সাথে জড়িত থাকে এবং এটি প্রমাণ হয়, তাহলে সেই কমিটি ভেঙে দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে বোর্ডের। অথচ এ প্রতিষ্ঠানটির অনিয়ম-দুর্নীতি বারবার জনসম্মুখে উঠে আসার পরও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি বোর্ড কিংবা মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালেও ভিকারুননিসায় অবৈধভাবে শিক্ষার্থী ভর্তির অভিযোগে দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। কিন্তু ওই কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। গত বছরও ভর্তি নীতিমালা না মানার কারণে অভিযুক্ত হয়েছিল এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া ভর্তি নীতিমালা না মানায় ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন অধ্যক্ষের এমপিও স্থগিত করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ওই বছর ভিকারুননিসা স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ৬৮ লাখ ১৭ হাজার ১০০ টাকা আদায় করেছিল। শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, নির্দিষ্ট সিট থাকার পরও তা না মেনে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করেছে ভিকারুননিসা কর্তৃপক্ষ। পূর্বেও একজন শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে ১০ লাখ টাকা করে নিয়েছে তারা। যে পরিমাণ ছাত্র ভর্তির অনুমোদন তারা পায় তার চেয়েও অনেক বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করে। তাছাড়া আমরা শাখা খোলার অনুমোদন দেই না অথচ তারা শাখা খুলে ফেলে। কোনো গার্ডিয়ান বা শিক্ষার্থীও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চান না, ভয় পান। মন্ত্রী বলেন, আমরা ওই ঘটনার জন্য শুধু তিনজন দায়ী ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছি তা নয়, বরং আমরা সেই সঙ্গে অনেকগুলো অনিয়ম এবং অসঙ্গতিও চিহ্নিত করছি। তার মধ্যে বড় ধরনের অনিয়মে জড়িত রয়েছে বলেও জানা গেছে।  এদিকে গতকাল সরেজমিন ভিকারুননিসা স্কুলের মূল ফটকে গিয়ে দেখা যায়, অভিযুক্ত শিক্ষক ও অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা কিংবা বরখাস্ত হওয়ার খবরেও সন্তুষ্ট নয় ছাত্রীরা। আন্দোলনস্থলে এসে লিখিতভাবে এসব তথ্য না জানানো হলে ৬ দফা দাবি উল্লেখ করে (১. অভিযুক্ত শিক্ষকদের আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, ২. স্কুলে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন বন্ধ করতে হবে, ৩. কথায় কথায় টিসি দেয়ার ভয় দেখানো যাবে না, ৪. মানসিক সুস্থতার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে কাউন্সিলিং করাতে হবে, ৫. ভিকারুননিসার গভর্নিং বডির সব সদস্যকে অপসারণ করতে হবে, ৬. অধ্যক্ষসহ বাকি শিক্ষকদের পদত্যাগের লিখিত আদেশ দেখাতে হবে) তারা বলেন, এসব পূরণ না হলে আন্দোলন চলবেই। এছাড়াও প্রতিটি শাখার সব শ্রেণির সকল ধরনের ক্লাস-পরীক্ষাও স্থগিত রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, অরিত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্তে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৗস, প্রভাতী শাখার প্রধান জিন্নাত আরা এবং শ্রেণি শিক্ষক হাসনা হেনার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় অধ্যক্ষসহ তিন শিক্ষককে বরখাস্ত এবং তাদের এমপিও বাতিলের নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। একইসঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও আত্মহত্যার প্ররোচনাকারী হিসেবে তদন্ত প্রতিবেদনে প্রমাণিত হওয়ায় তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কাছেও চিঠি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। যদিও পল্টন থানায় গত মঙ্গলবার রাতে মামলা দায়েরের পর স্থানান্তর হয়ে সেটি ডিবিতে গিয়েছে মাত্র। এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা যায়নি। এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌসসহ তিন শিক্ষককে বরখাস্ত করেছে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডি। পাশাপাশি গতকাল বুধবারের স্থগিত হওয়া বার্ষিক পরীক্ষা আগামীকাল শুক্রবার নেয়া হবে এবং রোববার থেকে ক্লাস স্বাভাবিকভাবে চলবে। বিষয়টি নিশ্চিত করে গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান গোলাম আশরাফ তালুকদার বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গভর্নিং বডির জরুরি সভায় বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ তিন শিক্ষককে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি সবাইকে চিঠি দিয়ে জানানো হবে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত