শিরোনাম

রহস্যময় পথে ঐক্যফ্রন্ট

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম  |  ০০:০৪, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৮

৬৯ দিন। সরকারবিরোধী জোট ঐক্যফ্রন্টের বয়স। ভোটের বাকি ২৬ দিন। যতই নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে ততই ফ্রন্টের পথ রহস্যময় হচ্ছে। সরকারের সংসার থেকে অপরাধের কলঙ্ক নিয়ে যারাই পথভ্রষ্ট হচ্ছে ফ্রন্ট তাদের সবাইকে বুকে টেনে নিচ্ছে। ক্ষোভে বিস্ফোরণের শক্তিটা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে নিচ্ছে বিএনপি। রাজনৈতিক চরিত্রে স্বার্থবাদী, দুর্নীতিগ্রস্ত সবাইকে ঘরে এনে পুরস্কৃতও করা হচ্ছে! চলছে খালেদাকে কারগারে রেখে হাজার হাজার প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়ে মন রক্ষার দারুণ রাজনীতি। দণ্ডপ্রাপ্ত তারেক জিয়াকে প্রতিদিনই অনলাইনে সংযোগ করে নতুন সংকট মোকাবিলায় নতুন নতুন সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। গণমাধ্যমের পাতায় তারেকের সিদ্ধান্তে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা বিরক্ত এমন সংবাদও এসেছে। নির্বাচনের ঠিক এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠে আর ফ্রন্টের নেতারা আদালতে। এমন পরিস্থিতিতে গণহারে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থিতা বাতিল হচ্ছে, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকার অভিযোগ, প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা গণমাধ্যমে ব্রিফিংয়ে এসে শুধু এমন নালিশ দিয়েই নিস্তেজ ভূমিকা পালন করছে ঐক্যফ্রন্ট। কিন্তু কার্যত ভূমিকার আড়ালে ঐক্যফ্রন্টের চলন গতিকে আওয়ামী লীগসহ দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সন্দেহের চোখে দেখছেন। এর আগে ২০ দলের সমন্বয়ক কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের ভাষ্য ছিলো বর্তমান পরিস্থিতিতে ২০ দলীয় জোটের পক্ষে নির্বাচনে থাকা সম্ভব হবে না। এদিকে গতকাল বিএনপির দিকে ইঙ্গিত করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, তারা (বিএনপি) নির্বাচন থেকে সরে গেলেও নির্বাচন সরবে না। এদিকে গতকাল থেকেই ঐক্যফ্রন্টে যোগ হয়েছে নতুন ঠিকানা! ঐক্যফ্রন্টে আসা সব দলেরই রয়েছে মানসম্মত অফিস। একাধিকও রয়েছে দু-একটি দলের। এতদিন ঐক্যফ্রন্টের সব প্রোগ্রাম কখনো গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে, কখনো ড. কামালের বাসায়, কখনো আসম আবদুর রবের বাসায়, মতিঝিল চেম্বারে ড. কামাল হোসেন এবং মওদুদ আহমেদের অফিসে অনুষ্ঠিত হলেও হঠাৎ করেই গতকাল স্বভূমিতে উঠেন তারা! নেয়া হয় রাজধানীর ৩৭/২ পুরানা পল্টন জামান টাওয়ারের চতুর্থ তলায় ঐক্যফ্রন্টের নতুন অফিস। এদিকে একমাসও সময় নেই ২৬ দিন পরই জাতীয় নির্বাচন। ৬৯ দিন চলতে পারলে এ ক্ষণিকের সময়ের জন্য কেন ঐক্যফ্রন্টের ঠিকানা দরকার হলো এ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সচেতন মহলের মাঝে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে অতিতেও বহু জোট হয়েছে নির্বাচনের আগে কিন্তু এবার এ জোটের গতিপথ ভিন্ন বলে মত। অনেকেরই প্রশ্ন এ জোটের স্থায়িত্ব কতদিন? নির্বাচনের আগ পর্যন্ত নাকি নির্বাচনের পরেও চলবে।সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর সাথে কথা বলে জানা যায়, গত ২৯ আগস্ট বেইলি রোডে ড. কামাল হোসেন এবং বি. চৌধুরী ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ঘোষণার মাধ্যমে ঐক্যপ্রক্রিয়া শুরু হয়। সে হিসেব ধরে আজ পর্যন্ত ফ্রন্টের বয়স ৬৯ দিন। এরই মধ্যে কেউ সরেছে কিউ হয়েছে যুক্ত। নানাভাবে ঐক্যফ্রন্ট নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে। সিলেট, চট্টগ্রাম, ঢাকা, রাজশাহীতে জনসভার মাধ্যমে সরকারকে অনেক হুঙ্কারের কথা জানিয়েছে। এ ৬৯ দিনে ড. কামাল হোসেন এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে প্রায় ঐক্যফ্রন্টের শতাধিক বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে। কূটনৈতিক-সম্পাদক পরিষদসহ অনেকের সঙ্গে। কিন্তু কেউ ঐক্যফ্রন্টের দৃশ্যত চাওয়া জানতে পারেনি। ড. কামালের চাওয়া কী তাও স্পষ্ট হওয়া যায়নি। তিনি নির্বাচনেও অংশ নেননি, পার্লামেন্টেও থাকবেন না তাহলে কেন তিনি ফ্রন্টের প্রধান নেতা? শেখ হাসিনাকে কেন ক্ষমতা থেকে নামাতে চান? এর কোনো উত্তর ঐক্যফ্রন্ট থেকে পাওয়া না গেলেও রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে খালেদা জিয়াই প্রধানমন্ত্রী হবেন বিকল্প হিসেবে রয়েছে তারেক জিয়ার নামও। হাসিনার পরিবর্তন হলে তারেক জিয়া দেশে ফিরে আসবেন। বিএনপির নেতৃত্বের হাল ধরবেন। কেননা তারই ভাষ্য হলো... সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য যাকে নেতা নির্বাচিত করবেন তিনিই প্রধানমন্ত্রী হবেন। সে হিসেব করলে সিদ্ধান্ত যেহেতু বিএনপির হাতে প্রধানমন্ত্রী বানানোর ক্ষমতাও তাদের হাতে। বিএনপি অবশ্য কখনোই চাইবে না তারেক জিয়াকে রেখে ড. কামালকে নেতৃত্বে। তাছাড়া এবার নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের সময় বিএনপির খোলসও স্পষ্ট যে ড. কামালের মতামত বিএনপিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ! তাহলে ড. কামাল কেন শেখ হাসিনার পতনের জন্য কথা বলছেন? অসমর্থিত সূত্রের ভাষ্য, ফ্রন্টে ড. কামালের ভূমিকা আমেরিকার লবিস্ট ফার্মের মতো। টাকার বিনিময়ে ফ্রন্টকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। বিএনপিকে উজ্জীবিত রাখতে চাইছেন। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঐক্যফ্রন্টকে আরও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বিএনপিকে হাতে রাখতে হবে। আওয়ামী লীগের সাথে লড়তে হলে ড. কামালকে লাগবে। এ নির্বাচনের মাধ্যমেই যে আওয়ামী লীগে ধস আসবে, আর বিএনপি বিজয় লাভ করবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই নির্বাচনের পরও ড. কামালকে সামনে রেখে বিএনপি আন্দোলন চালিয়ে যেতে চাইলে বিএনপিতে ড. কামালের প্রয়োজন। দীর্ঘ ৬৯ দিন অতিথি হয়ে আজ এখানে, কাল ওখানে এমনভাবে ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক চললেও শেষ পর্যায়ে শক্তিশালী রূপরেখা প্রয়োজনে এবার স্ব ঘরে স্বস্তির বাসের সূচনা। এদিকে এবার একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি শক্তভাবে লড়তে চান। তাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে ঐক্যর বিকল্প নেই। দলের শীর্ষ নেতাদের মত, কোনোভাবেই এবার ফ্রন্ট নির্বাচনের মাঠ ছাড়বে না। ফ্রন্টের সিদ্ধান্তর আলোকে আগামী ১০-১২ ডিসেম্বর সিলেট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় গণসংযোগ শুরু করবেন। এতে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা থাকবেন। পর্যায়ক্রমে আসবে আন্দোলের রূপরেখাও। গতকাল ঐক্যফ্রন্টের নতুন কার্যালয়ের উদ্বোধন শেষে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, জনগণ সক্রিয় থাকলে ৩০ ডিসেম্বর একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটবে। আমরা নির্বাচনে অংশ নেয়ায় সরকার একটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। তিনি বলেন, সরকার মনে করেছিল এবারো ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো ভোটারবিহীন একটি নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতায় থেকে যাবে। কিন্তু জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে আসার কারণে তারা (সরকার) এখন দুশ্চিন্তায় পড়েছে। ড. কামাল হোসেন বলেন, ৩০ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণ হবে। জনগণকে সেই ভোট পাহারা দিতে হবে। কারণ, বর্তমানে দেশের মালিকানা মালিকদের (জনগণ) হাতে নেই। তাই দেশের মালিকান পুনরুদ্ধার করতে জনগণকেই মাঠে থাকতে হবে। নির্বাচনের দিন বা তার আগে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনগণকে আরও সক্রিয় থাকতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো অপচেষ্টা চালানো হলে তা মোকাবিলা করতে হবে। সাম্প্রতিক ইস্যু নিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ গতকাল বলেছেন, আমরা বিভিন্নভাবে জানতে পেরেছি যে, নির্বাচনের দিন ভোট গ্রহণ শুরু হওয়া থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আওয়ামী ক্যাডাররা পরিকল্পিতভাবে ‘গোলমাল’ করবে। সেই সুযোগে আওয়ামী মনা প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং অফিসাররা ভোট নেয়া বন্ধ করে অন্য ফন্দি-ফিকির করবে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘নির্বাচন ক্রমেই প্রহসনে পরিণত হতে চলছে। নির্বাচনি ব্যবস্থা এবং নির্বাচন কমিশনকে নিয়ন্ত্রণে রেখে আবার ক্ষমতায় যেতে চায়। সেজন্য বিরোধী দলের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন-নিপীড়ন এবং যত রকম কৌশল আছে সরকার প্রয়োগ করছে। মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর থেকে গ্রেপ্তারের পরিমাণ বেড়ে গেছে। গতকাল পর্যন্ত ১ হাজার ৯৭২ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে।’
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত