শিরোনাম

দেশ অচলের কর্মসূচি!

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম  |  ০০:০৩, নভেম্বর ০৪, ২০১৮

সাত দফার মূল দাবিগুলো মেনে নেয়নি সরকার। অসন্তুষ্ট বিএনপি। খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়, সংসদ ভেঙে দেয়া, সরকারের পদত্যাগ, সেনা মোতায়েনসহ মৌলিক বিষয়গুলোতে আসেনি সমাধান। তবে হাল ছাড়েনি বিএনপি। দলের জনপ্রিয়তা ও তৃণমূলকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন আঙিকে ছক তৈরি করছে দলটি। এ ক্ষেত্রে দুপথেই হাটছে তাঁরা। একদিকে ড. কামালকে হাতে রেখে গতানুগতিক বৈঠক, সভা-সমাবেশগুলো অব্যাহত রাখবে, অন্যদিকে দেশ অচলের মতো কর্মসূচিও অব্যাহত রাখবে। গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপে ফল না পেয়ে পল্টন ও গুলশানে দলের নীতিনির্ধারকদের নিয়ে সিরিজ বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিএনপির জনপ্রিয়তা আছে, মাঠপর্যায়ে লাখো নেতাকর্মী আছে, আন্দোলন করার মতো সব শক্তিই আছে, তাহলে কেন ২০১৪ সালের মতো নির্বাচনের সুযোগ দিবে বিএনপি? মাঠপর্যায়ের অনেক নেতাই এমন প্রশ্ন তোলেন। একপর্যায়ে পুরনো পথেই হাঁটবেন বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অক্টোবরের ১৫ তারিখ থেকেই বিএনপির আগের যে ছক ছিলো এখনো সেটিকে আপডেট করেই তফসিল ঘোষণার পরপর এ কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়। আন্দোলনের প্রথম ধাপে নেয়া হয়েছে মানববন্ধন, গণঅনশন, গণসংযোগ, দ্বিতীয় ধাপে নেয়া হয়েছে লংমার্চ-রোডমার্চ, অবরোধ এবং তৃতীয় ধাপে হরতালের মতো চূড়ান্ত কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমে হরতালের মতো কর্মসূচি নেয়া হয়নি। তাৎক্ষণিক তফসিল ঘোষণার ইঙ্গিতের পর হরতালের সিদ্ধান্তও নেয়া হয়। এ কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে চাপে রাখার পাশাপাশি ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আলোচনার পথও খোলা রাখবেন তারা। ৬ নভেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জোট জনসভা করবে। ওখানে বড় ধরনের ইঙ্গিত দেয়া হবে। এরপর বিএনপির দলীয় সিদ্ধান্তে স্বীয় কর্মসূচিগুলো আসবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিএনপি যে আশা নিয়ে সংলাপে গিয়েছিলো তা পূরণ হয়নি। বরং হাল্কা সৌজন্য নাস্তা খাওয়ার গোপন ছবিগুলো তুলে ঐক্যফ্রন্টের নেতাকর্মীদের দেশের মানুষের কাছে হেয় করা হয়। সংলাপে সাত দফা দাবি পূরণের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য না আসায় বিএনপি নিজেদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে আন্দোলনের পথেই হাঁটছে। এছাড়া ড. কামালও খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে শক্ত অবস্থান রাখেননি। তবুও ড. কামালকে এ মুহূর্তে তারা হাতে রাখবেন। এ নিয়ে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এবং পল্টন দলীয় কার্যালয়ে চলে একের পর সিরিজ বৈঠক। বৈঠক সূত্র জানায়, বিএনপি এখন স্পষ্ট! সরকার সহজেই দাবি মেনে নেবে না। ফলে আন্দোলন ছাড়া বিকল্প আর কোনো পথ নেই। তাছাড়া দলীয় মাঠ জরিপেও তৃণমূলের নেতারা যে আন্দোলনের মনোভাবে আছেন এবং ঘোষণার অপেক্ষায় আছেন তা ব্যাখ্যা করা হয়। নির্বাচনকে সামনে রেখে হওয়া আন্দোলনের প্রস্তুতি ও তৈরি হওয়া রূপরেখা নিয়ে ফের আলোচনা করেন তারা। এ ক্ষেত্রে আন্দোলনের কৌশলে বেশ কয়েকটা প্রস্তাব আনা হয়, এর মধ্যে ঢাকাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। অতীতে ঢাকার আন্দোলনে দলের বড় পদবীর নেতাদের ব্যর্থতার কথাও উঠে আসে। তাই এবার রাজধানীকে টার্গেট করে ১০-১৫ জনের আলাদা গ্রুপ করা হয়েছে। বৈঠক সূত্রের দাবি কারা ভালো ভূমিকা রাখবে, এর একটি তালিকা লন্ডনে তারেক জিয়াকেও পাঠানো হয়েছে। যারা ভালো ভূমিকা পালন করবে তাদের জন্য দলে ভালো বিবেচনা থাকবে। আর যারা ব্যর্থ হবে তাদেরও তেমন মূল্যায়ন হবে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে। এ মুহূর্তে বিএনপির জনপ্রিয়তার পাশাপাশি সব শ্রেণির মানুষের সহানুভূতি রয়েছে। তাই আন্দোলন হলে সফলতার এমন দিকগুলোও তুলে ধরা হয়। সেই আলোকেই তিনভাবে সরকারকে চাপে রাখতে আন্দোলনের ছক তৈরি করা হয়। এর মধ্যে আন্দোলনের প্রথম ধাপে নেয়া হয়েছে মানববন্ধন, গণঅনশন, গণসংযোগ, দ্বিতীয় ধাপে নেয়া হয়েছে লংমার্চ-রোডমার্চ, অবরোধ এবং তৃতীয় ধাপে হরতালের মতো চূড়ান্ত কর্মসূচিও নেয়া হয়েছে। তবে সবকিছুর মাঝে আলোচনার পথও খোলা রাখবেন তারা। ৬ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভার পাশাপাশি আগামী ৯ নভেম্বর রাজশাহীতে জনসভার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এর বাইরে ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে আরও কর্মসূচি আসতে পারে তা নিয়েও আলাপ-আলোচনা হয়েছে। আন্দোলনের পাশাপাশি জোট শক্তিকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এ নিয়ে গতকাল একটি অনুষ্ঠানে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক ডাকসু ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ। এ সময় উপস্থিত সকলে করতালির মাধ্যমে আহ্বানের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। কাদের সিদ্দিকী এ বিষয়ে দু-একদিনের মধ্যে তার মন্তব্য জানাবেন। এদিকে গতকাল একটি অনুষ্ঠানে ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ যে ব্যর্থ হয়েছে এ নিয়ে মুখ খুলেছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি বলেছেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সংলাপে গিয়েছে, অনেক দাবি দাওয়া দিয়েছে; সরকার কোনো দাবিই মানতে পারে নাই। সে জন্য সংলাপ ব্যর্থ হয়েছে। সংলাপে আমরা যাবো, কোনো দাবি দাওয়া দিব না। আমরা গিয়ে আসন চাইবো, আমাদের কত আসন দিবেন? আমাদের মনমতো না হলে চলে আসবো। আন্দোলন প্রসঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা শওকত মাহমুদ বলেছেন, একতরফা নির্বাচনের জন্য সরকার সংলাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। তবে সরকারকে মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের মানুষ আন্দোলনে বিশ্বাসী, তারা সব ফ্যাসিস্ট সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত। বাংলাদেশে আরেকবার আন্দোলন হবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্য। আর তা হবে এক দফার আন্দোলন। তার জন্য লাগাতার আন্দোলন থাকবে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, ‘নির্বাচনকালীন সময়ে নিরপেক্ষ কাউকে দিয়ে নির্বাচন পরিচালনার ব্যবস্থা করেন। নতুবা দেশে অরাজকতা সৃষ্টি হতে পারে। যা জনগণ ও আওয়ামী লীগের জন্য শুভকর হবে না। খালেদা জিয়াকে মুক্তি না দিয়ে দেশের মাটিতে শেখ হাসিনা নির্বাচন করতে পারবে না এমন হুমকি দিয়ে বিএনপির এই নেতা বলেছেন, ‘দেশের জনগণ একবার জেগে উঠলে কারো জন্য সেটা শুভকর হবে না। তখন কাউকে থামানো সম্ভব হবে না।’ ঐক্যফ্রন্টের আন্দোলন প্রসঙ্গে জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেছেন, সাত দফার দাবি আদায় না হলে আন্দোলন হবে। সেই আন্দোলনে যদি দেশে অন্য কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয় তাহলে এর দায় সরকারকেই নিতে হবে। ঐক্যফ্রন্টের আরেক নেতা সুব্রত চৌধুরী বলেছেন, দেশের এই ক্লান্তিকালে আমরা আমাদের আদর্শ বাস্তবায়নে মাঠে থাকবো, আন্দোলন চলবে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, সন্তান না কাঁদলে মাও দুধ দেয় না, আন্দোলনে না নামলে সরকারও দাবি মেনে নেবে না। এখন আন্দোলই একমাত্র পথ।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত