শিরোনাম
খুশি হতে পারছেন না শিক্ষকরা

প্রাথমিকে ৬৫ হাজার সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ সৃষ্টি হচ্ছে

প্রিন্ট সংস্করণ॥বেলাল হোসেন/রাসেল মাহমুদ  |  ১১:০৮, অক্টোবর ৩১, ২০১৮

দীর্ঘ আন্দোলনের পর সহকারী শিক্ষকরা অবশেষে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ পেতে যাচ্ছেন। জাতীয় নির্বাচনের আগেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এ পদ সৃষ্টি করতে যাচ্ছে সরকার। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে প্রত্যেক বিদ্যালয়ের সহকারি জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের পদোন্নিত দেওয়া হবে। এতে করে দেশের ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন করে নতুন এই পদে যুক্ত হবেন। তবে এতে খুশি হতে পারছেন না শিক্ষকরা। মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্তে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। জানা গেছে, প্রধান শিক্ষকদের ঠিক একধাপ নিচে বেতনস্কেল বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষকরা যে আন্দোলন করে আসছিলেন তার কিছুটা বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ সিদ্ধান্তমতে সহকারী শিক্ষকরা প্রধান শিক্ষকরে পরের গ্রেডে নয়, সহকারী প্রধান শিক্ষককের নিচের গ্রেডে বেতন পাবেন। এর মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকরে ঠিক পরের গ্রেডে বেতন না পেলেও সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড উন্নীত হচ্ছে। সারাদেশে ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৪ লাখ প্রাথমিক শিক্ষক রয়েছেন। তাদের মধ্যে থেকে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেয়া হবে। এদিকে সহকারী শিক্ষকরা মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তে খুশি হয়নি। বরং এই সিদ্ধান্তকে নতুনভাবে তাদের বঞ্চিত করার প্রচেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা। তবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী শিক্ষকদের দাবি পূরণের মাধ্যমে বেতনস্কেল উন্নীতকরণকে নির্বাচনি উপহার বলেছেন। আগামী এক মাসের মধ্যেই শিক্ষকদের দাবি পূরণ হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন মন্ত্রী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা পেলেও বেতন পান একাদশ/দ্বাদশ গ্রেডে। দশম গ্রেডে তাদের বেতন পাওয়ার কথা থাকলেও তা পান না। আর সহকারী শিক্ষকরা বেতন পান ১৪/১৫তম গ্রেডে। দশম গ্রেডে তাদের বেতন পাওয়ার কথা ছিলো। বর্তমানে সহকারী শিক্ষকরা প্রধান শিক্ষকদের পরের গ্রেডে বেতন চান। অর্থাৎ একাদশ/দ্বাদশ গ্রেডে। এ নিয়ে আন্দোলন হলেও সরকার খুব একটা আমলে নেয়নি। কিন্তু নির্বাচন সামনে থাকায় শ্কিষকদের এসব দাবি আমলে নিয়ে কাজ শুরু করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এসব বিষয়ে জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মাতি নিতে হবে। এজন্য চলতি সপ্তাহে জনপ্রশাসন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিবের আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সচিব পর্যায়ে বৈঠকে ফলপ্রসূ হলে খুব দ্রুত নথির কার্যক্রম শেষ করা হবে। জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, সকল শিক্ষকদের বেতন গ্রেড ঠিকঠাক করার জন্য কাজ শুরু হয়েছে। সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী এক মাসের মধ্যে আমরা কাজগুলো শেষ করতে চাই। এর মাধ্যমে শিক্ষকদের বেতন গ্রেড বাড়বে। সহকারী প্রধান শিক্ষক নামে নতুন একটি পদ সৃষ্টি করা হবে। তিনি বলেন, বেতনভাতা নিয়ে শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন করছেন, আমি নিজে তাদের অনশন ভাঙিয়েছি, প্রতিশ্রুতিও দিয়েছি। সেগুলোই এখন বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছি। এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মো. গিয়াস উদ্দিন আহমেদ আমার সংবাদকে বলেন, প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোর জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। এই সপ্তাহে নথিটি জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে যেতে পারে। তিনিও বলেছেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারি প্রধান শিক্ষকের পদ সৃষ্টি হচ্ছে। এদিকে, মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্তে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শিক্ষকদের মধ্যে দুটি ভাগ হয়েছে। এদের একভাগ বলছেন, সরকার যেটা করতে চাচ্ছে করুক। তাতে ঘুরপথে হলেও সহকারি শিক্ষকদের বেতন একগ্রেড বাড়ছে। আবার অন্যপক্ষ বলছে, সহকারি প্রধান শিক্ষকের পদ সৃষ্টি না করে সহকারি শিক্ষকদের বেতন গ্রেড বাড়িয়ে দেয়া হোক। অনেক শিক্ষকরাই মনে করছেন বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যে অবস্থা, তাতে সহকারী প্রধান শিক্ষকের প্রয়োজন নেই। একটি বিদ্যালয়ের যা কাজ তার প্রায় সবই সহকারী শিক্ষকরা করছেন। অধিকাংশ শিক্ষকরাই বলছেন, পদটি সৃষ্টি হলে সহকারী শিক্ষকদের বৈষম্য স্থায়ী হবে। আর সহকারী প্রধান শিক্ষকরা কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠবেন। তারা বলছেন, সহকারী প্রধান শিক্ষক নয়, বরং ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অফিস সহকারী দরকার। প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমাজের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী রবিউল আমার সংবাদকে বলেন, মন্ত্রণালয় সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ সৃষ্টির যে কথা বলছে, আমরা তাকে সরকারের পলিসি বলে মনে করছি। কারণ আমরা ফিল করছি, এই মুহূর্তে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ পদটি দরকার নেই। এই সিদ্ধান্তে আমরা খুবই মর্মাহত। এখন ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪ লাখের মতো শিক্ষক রয়েছেন। এরমধ্যে প্রত্যেক স্কুলে একজন করে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করে নতুন একটি সমস্যার সৃষ্টি করা হচ্ছে। তবে বর্তমানে সহকারী প্রধান শিক্ষকের চেয়ে বিদ্যালয়গুলোতে অফিস সহকারী বেশি দরকার বলে মনে করেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক অনলাইন সমিতির সভাপতি কাজী আবু নাসের আজাদ। তিনি আমার সংবাদকে বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এখন অনেক কাজ। তাই প্রত্যেক বিদ্যালয়ে একজন অফিস সহকারী খুব দরকার। আমি ব্যক্তিগতভাবে এ মুহূর্তে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সহকারী প্রধান শিক্ষকের প্রয়োজন আছে তা মনে করি না। তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রায় চার লাখ সহকারী শিক্ষকের দাবি, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের পরের ধাপেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণ করা। দেশের বেশিরভাগ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক সংখ্যা গড়ে ছয় থেকে সাত জন। তাই এই স্বল্পসংখ্যক শিক্ষকের জন্য একজন প্রধান শিক্ষক থাকার পর সহকারী প্রধান শিক্ষক পদটি গুরুত্বহীন। বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক মহাজোটের মুখপাত্র কাজী খালেদা আমার সংবাদকে বলেন, সরকার এই মুহূর্তে যদি সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করে তাহলে বর্তমানে যে বৈষম্য চলছে তা স্থায়ী হবে। আমরা সরকারের এ সিদ্ধান্ত ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারছি না। এখন যদি এই পদটি সৃষ্টি করা হয়, সেক্ষেত্রে সহকারী প্রধান শিক্ষকরা এসে সহকারীদের ওপর প্রভাব খাটাবে। তাই আমরা স্ট্রংলি এর প্রতিবাদ করছি। সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা করা হবে উল্লেখ করে এই শিক্ষক নেতা বলেন, ‘আমরা যা চেয়েছি, আমাদের তা না দিয়ে নতুন এক সংকটের মধ্যে ফেলা হচ্ছে। তাই আমরা এ সিদ্ধান্তকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। প্রয়োজন হলে কঠোর কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাবো। প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি আতিকুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, বর্তমানে প্রধান শিক্ষকদের সাথে আমাদের বেতনের যে পার্থক্য তা নিরসন করার জন্য আমরা আন্দোলন করে আসছি। এখন আবার সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করা হচ্ছে। যা গ্রহণযোগ্য নয়। এমনিতই বেতন বৈষম্যের কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান কমে যাচ্ছে। নতুন করে এই পদ সৃষ্টি হলে শিক্ষার মান আরও কমবে। পদটি যেন সৃষ্টি করা না হয় এ জন্য মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা আগেও বলেছি, এখনো বলছি, আমাদের দাবি বেতন বৈষম্য নিরসন করা। নতুন পদ সৃষ্টি নয়। আলোচনা সাপেক্ষে সমস্যার সমাধান না হলে কর্মসূচি ঘোষণা করা ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা থাকবে না। তবে প্রাথমিক গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সূত্রে জানাগেছে, কাজগুলো এমনভাবে করা হচ্ছে যাতে কোনোপক্ষই অসন্তুষ্ট না থাকে।

 

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত