শিরোনাম

পাঁচ বছরে বেসরকারি বিদ্যুৎ ক্রয়ে ৭৫ হাজার কোটি টাকা

প্রিন্ট সংস্করণ॥মো. হাসান আরিফ  |  ০০:২৬, অক্টোবর ১৯, ২০১৮

গত পাঁচ বছরে সরবরাহকৃত বিদ্যুতের প্রায় অর্ধেক জোগান নিতে হয়েছে বেসরকারি খাত থেকে। আর এজন্য ব্যয় করতে হয়েছে ৭৫ হাজার কোটি টাকা। এই ব্যয় আরও কম হতো যদি না সরকারকে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হতো। মোট ব্যয়কৃত অর্থের প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়েছে। যা শতাংশের হিসাবে ৩৬ শতাংশ। যদিও সরকারি খাতে এ ধরনের কোনো ব্যয় নেই। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। আর এ বিদ্যুৎ কেনায় মোটা অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি)। পিডিবির হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৭-১৮ পর্যন্ত পাঁচ অর্থবছরে দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় ২৪ হাজার ৯৬১ কোটি ৯৫ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এর মধ্যে বেসরকারি খাত থেকে কেনা হয় ১১ হাজার ২০০ কোটি চার লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ। আর এজন্য পিডিবিকে বেসরকারি খাতে পরিশোধ করতে হয় ৭৪ হাজার ৫৬৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল ২৬ হাজার ৭৬১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, যা মোট ব্যায়ের প্রায় ৩৬ শতাংশ। এ বিষয়ে পিডিবির চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদের ভাষ্য, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ কেনা হয়। চুক্তির ভিত্তিতেই ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করার নিয়ম রয়েছে। তাই চার্জ পরিশোধ করা হয়। তাছাড়া প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স প্রদানের আগে এ নিয়ে দ্বিপক্ষীয় দর কষাকষি করা হয়। জানা গেছে, মূলত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে মূলধন ব্যয়ের হিসাব করেই এ ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। এছাড়া কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা, অবস্থান, জ্বালানি পরিবহণ ব্যবস্থাসহ সব কিছুই বিবেচনা করা হয়। এদিকে কয়েক বছর ধরে বেসরকারি খাতে একের পর এক নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দিচ্ছে সরকার। পাশাপাশি পুরোনো মেয়াদোত্তীর্ণ রেন্টাল-কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলোর চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। ফলে ক্যাপাসিটি চার্জ আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল আলম বলেন, বেশিরভাগ বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স দেয়ার সময় ঠিকমতো দর কষাকষি করা হয়নি। এছাড়া চুক্তিতেও সমস্যা আছে। ফলে কেন্দ্র বসিয়ে রেখেও ক্যাপাসিটি চার্জ নিচ্ছেন উদ্যোক্তরা। আর চুক্তি অনুযায়ী সরকারও তা পরিশোধ করতে বাধ্য। এজন্য বেসরকারি খাতের কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এত বেশি। এগুলো বন্ধ না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব নয় বলেও তিনি বলেন। জানা গেছে, গত অর্থবছর জুন শেষে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়ায় ১৪ হাজার ১১৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে স্থাপন করা হয়েছে পাঁচ হাজার ২১৩ মেগাওয়াট। বেসরকারি এসব কেন্দ্র থেকে কেনা হয় দুই হাজার ৫২৩ কোটি ৩৪ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ। এতে ব্যয় হয় ১৬ হাজার ৬৯২ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জই পরিশোধ করা হয় ছয় হাজার ২৪১ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা উৎপাদন ব্যয়ের ৩৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ১৪ হাজার ৯৪ মেগাওয়াট। এর মধ্যে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ছিল পাঁচ হাজার ৪৫৯ মেগাওয়াট। এ খাত থেকে সে সময় কেনা হয়েছিল দুই হাজার ৪৪৫ কোটি ২৮ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ। এতে ব্যয় হয় ১৪ হাজার ৭৩৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হয় পাঁচ হাজার ৭৬৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, যা উৎপাদন ব্যয়ের ৩৯ দশমিক ১২ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ছিল পাঁচ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াট। আর সরকারি-বেসরকারি ও আমদানি মিলিয়ে সে সময় দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ১২ হাজার ৩৩৩ মেগাওয়াট। এই অর্থবছর বেসরকারি খাত থেকে দুই হাজার ৪১৩ কোটি ৬৪ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ কেনা হয়। এতে ব্যয় হয়েছিল ১৪ হাজার ১৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হয় পাঁচ হাজার ৩৭৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। মোট ব্যয়ের মধ্যে এর হার ছিল ৩৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ছিল চার হাজার ৪৪৮ মেগাওয়াট। আর সামগ্রিকভাবে এ সক্ষমতা ছিল ১০ হাজার ৭৬৯ মেগাওয়াট। সে অর্থবছর বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয় এক হাজার ৯৫৪ কোটি ৫২ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এতে ব্যয় হয় ১৪ হাজার ৯০৬ কোটি ১১ লাখ টাকা। আর ক্যাপাসিটি চার্জ চার হাজার ৬৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৩১ দশমিক ২৯ শতাংশ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ছিল চার হাজার ৯৬ মেগাওয়াট। আর সামগ্রিকভাবে এ সক্ষমতা ছিল ১০ হাজার ৫১৬ মেগাওয়াট। ওই অর্থবছরে বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয় এক হাজার ৮৬৩ কোটি ২৫ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এতে ব্যয় হয় ১৪ হাজার ২১৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। আর ক্যাপাসিটি চার্জ চার হাজার ৭১৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৩৩ দশমিক ১৭ শতাংশ।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত