শিরোনাম

ভাঙছে বি. চৌধুরীর তৃতীয় সংসারও

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম  |  ০০:০২, অক্টোবর ১৬, ২০১৮

রাজনীতিতে ক্ষোভের কারণে তৃতীয় সংসারও ভাঙছে সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারা। এর আগে বিএনপি, এলডিপির সঙ্গে সংসার ভাঙার পর বেশকিছু সময় যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন তিনি। এখন সেই যুক্তফ্রন্টও ভেঙে যাচ্ছে। বিএনপিকে ক্ষমতায় আনা যাবে না, জামায়াতকে বাদ দিতে হবে, ১৫০ আসন ছেড়ে দিতে হবে, দুই বছর ক্ষমতা চাই, রাষ্ট্রপতি হওয়ার স্বপ্ন বিকল্পধারার এমন আপত্তিকর শর্তের কারণে অবশেষে বাপ-ছেলেকে ঐক্যফ্রন্টে না রাখার সিদ্ধান্ত নেন ড. কামালের নেতৃত্বে থাকা ঐক্যফ্রন্ট। এর ফলে এখন বিকল্পধারার বড় একটি অংশ ড. কামালের ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আজ অথবা আগামীকাল তলবি সভা করে এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন এ অংশের নেতারা। এদিকে বিকল্পধারাকে বাদ দিয়ে ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ গঠনে ‘স্বস্তি’ মিলেছে ২০ দলীয় জোটে। তৃণমূল থেকে বিএনপির শীর্ষ নেতারাও এতে সন্তুষ্ট। ২০ দলীয় জোটের শরিক ১৯ দল এবং নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক তিন দলের মধ্যে সমন্বয় করে নির্বাচনে আসন বণ্টন এবং নানামুখী চাপের মধ্যে ঐক্য সংহত রাখার ব্যপারেও ঐক্যবদ্ধ তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সুষ্ঠু নির্বাচন এবং নির্বাচনকালীন সরকার কী ধরনের হবে এ নিয়ে ঐক্যফ্রন্ট নতুন কর্মসূচির শিগগিরই একটা রূপরেখা তুলে ধরবে। এছাড়াও দুর্গাপূজার পর দেশব্যাপী আসছে ঐক্যফ্রন্টের সিরিজ কর্মসূচি। আজ অথবা আগামীকাল বুধবারের মধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নতুন কর্মসূচি আসবে এবং অক্টোবরের মধ্যেই সম্পন্ন করা হবে কর্মসূচি। সরকারকে সময় বেঁধে দিয়ে শিগগিরই ঘোষণা করা হবে ‘আন্দোলন এবং নির্বাচনে’র রোডম্যাপ। এছাড়া বিদেশি কূটনীতিক ও বিভিন্ন দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করার পরিকল্পনাও করেছে নতুন এই জোট। সেখানে জোটের ‘৭ দফা দাবি ও ১১ দফা লক্ষ্যে’র প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হবে। এ নিয়ে সচেতন মহল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তুমুল ঝড় বইছে। এদিকে বিএনপির ঘরে ড. কামালের নতুন ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে আওয়ামী লীগের ঘরেও চিন্তাভাবনা ও হিসাব-নিকাশ চলছে। জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া শুরুর পর দিন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘অসময়ে নীরব সু সময়ে সরব আসম আবদুর রব’ আর ‘আওয়ামী লীগের পক্ষে লিখতে গেলে মান্না জুড়ে দেয় কান্না’। দলীয় শীর্ষ প্রধান থেকে আসা এমন মন্তব্যের পর তখন এই ঐক্যপ্রক্রিয়া নিয়ে তেমন চিন্তিত ছিলো না আওয়ামী লীগ। কিন্তু এখন বি. চৌধুরীকে বাদ দিয়ে নতুন ঐক্য হওয়ায় এ নিয়ে আওয়ামী লীগও ভাবছে। ধারণা করা হচ্ছে এই ঐক্যের পেছনে দেশি ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে। এ নিয়ে গতকাল ফের আওয়ামী লীগের সভানেত্রী বলেছেন, খুনি ও দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে ঐক্য গড়েছেন ড. কামাল হোসেন গং। নৌকা থেকে নেমে ধানের শীষে হাল ধরেছেন তিনি। সঙ্গে জুটেছে আরও কিছু খুচরা, আধুলি। এই জগাখিচুড়ির ঐক্য দিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি তরি পার হতে পারবে না। এ নিয়ে উপযুক্ত জবাব দেয়ার কথাও জানান তিনি। এদিকে মাঠপর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিকল্পধারার সাংগঠনিক অবস্থা নড়বড়ে, দলের চেয়ারম্যান বি. চৌধুরীর নিজের জেলা মুন্সীগঞ্জ এবং তার নিজ নির্বাচনি আসনেও নেই কমিটি। মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নানের নিজের জেলা লক্ষ্মীপুরেও কোনো কমিটি নেই। কেন্দ্রীয় কমিটিতে ৭১ জন সদস্যের নাম থাকলেও কার্যত সক্রিয় আছেন ১৭-২০ জন। এখন এর মধ্যে ১৭ জনই দলত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন বিকল্পধারার কেন্দ্রীয় সমবায়বিষয়ক সম্পাদক আক্তারুজ্জামান বাবুল, যোগাযোগবিষয়ক সম্পাদক খন্দকার জোবায়ের, কৃষকধারার আহ্বায়ক চাষী এনামুল, প্রচার সম্পাদক প্রকৌশলী জুন্নু প্রমুখ। তাদের অনেকেই বলছেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত দলের প্রেসিডেন্ট বি. চৌধুরীর নয়। এটা তার ছেলে মাহী বি. চৌধুরীর ইচ্ছাপূরণের সিদ্ধান্ত। তারা এই সিদ্ধান্তকে ‘গণবিরোধী’ মনে করছেন। কারণ মানুষ চেয়েছিল, দেশে জাতীয় ঐক্য হোক। কিন্তু ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য মাহী এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই দলের কর্ণধার হিসেবে পরিচিত মাহী বি. চৌধুরীর অসাংগঠনিক সিদ্ধান্তে ইতোমধ্যেই অনেক গুণীজন দল ত্যাগ করেছেন। অনেককে বহিষ্কার করা হয়েছে। এভাবে রাজনীতি চলতে পারে না। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আজকালের মধ্যে তলবি সভা ডেকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যুক্ত হয়ে দেশের কল্যাণে কাজ করবেন। এ বিষয়ে যুক্তফ্রন্টের অন্যতম শীর্ষ নেতা নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এই জোট গঠনের উদ্দেশ্য থেকে বিকল্পধারা সরে গেছে। তার দল নাগরিক ঐক্য ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডি এবং সম্প্রতি যুক্তফ্রন্টে যোগ দেয়া সোনার বাংলা পার্টি এবং বাংলাদেশ জনদল ঘোষিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যুক্ত হয়েছে। সুতরাং একটি মাত্র দল (বিকল্পধারা) থাকায় এখন যুক্তফ্রন্টের কার্যকারিতা নেই। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কর্মসূচির বিষয়ে তিনি বলেন, পূজার পর আন্দোলনের কর্মসূচি দেবেন। দাবি-দাওয়ার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে সারাদেশে ছুটে বেড়াবেন তারা।এদিকে একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর দল বিকল্পধারাকে বাইরে রেখেই ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন এই জোটে বিকল্পধারাকে বাদ দেয়া হয়েছে, নাকি তারা নিজেরাই আসেনি এ বিষয়ে কথা বলেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, জোট গড়ার বৈঠকগুলোতে ‘কিছু বিষয়ে চাপ সৃষ্টি করে সমস্যা তৈরি করছিল’ বিকল্পধারা। তবে এখানে কোনো ষড়যন্ত্র নেই, নিজেদের সিদ্ধান্তেই তারা জোটে আসেনি। বিএনপি, গণফোরাম, নাগরিক ঐক্য ও জেএসডিকে নিয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ৭টি দাবি ও ১১টি লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। এসব বিষয় সামনে রেখে এই জোটের নেতারা আগামীতে নানা কর্মসূচি দেয়ারও কথা জানান। বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমরা প্রথম থেকেই লক্ষ্য করেছিলাম যে কতগুলো বিষয়ে অযথা চাপ তৈরি করে একটা সমস্যা তৈরি করা হয়েছে। যাই হোক, আমরা এ বিষয়ে বেশি কথা বলতে চাই না। আমরা আশা করি, তারা ঐক্যে ফিরে আসবেন। তারা এলে আমরা আরও বেশি উপকৃত হতাম, আমাদের ঐক্য এবং গণতন্ত্রের আন্দোলন আরও জোরদার হতো। আমরা আশা করি যে তারা এ লক্ষ্যের সাথে জড়িত হবেন।’ঐক্যফ্রন্ট কোন প্রক্রিয়ায় এগোবে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার কাছে জানতে চাইলে তিনি আমার সংবাদকে বলেন, আমরা দুর্গাপূজার পর দেশব্যাপী গণসংযোগে নামবো। আমাদের ঘোষিত দাবি ও লক্ষ্যগুলোকে জনগণের কাছে তুলে ধরে প্রচারণা চালাব। ড. কামাল হোসেনও রাস্তায় নামবেন। দেশের জনগণ পরিবর্তন চাইছেন। আমরা যে লক্ষ্য দিয়েছি আশা করি দেশের মানুষ আমাদের ডাকে সাড়া দেবেন। মাঠে নামলেই তার প্রমাণ হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। দেশের সাধারণ মানুষের দাবিতে সরকার দাবি অবশ্যই পূরণ করবে। পর্যায়ক্রমে আরও কর্মসূচি আসবে বলে তিনি জানান।জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম উদ্যোক্তা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আমার সংবাদকে বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য আইনের শাসন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। এখানে সবাই বলছে, জামায়াতকে এ জোটে রাখা হবে না। আমাদেরও একই সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্তে এ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়েছে। এখানে তো জামায়াত থাকছে না, আর জামায়াতের নিবন্ধনও নেই। ফলে এ নিয়ে বিতর্ক করে সময়ক্ষেপণ করার কোনো যৌক্তিকতা আছে বলে আমরা মনে করি না। এ জোট অবশ্যই সফল হবে।এ বিষয়ে এলডিপির সভাপতি ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম আমার সংবাদকে বলেন, বিকল্পধারার আপত্তিকর আবদার নিয়ে আমি প্রথম থেকেই বলে আসছিলাম। যাদের দুটি আসন নেই তারা ১৫০ আসন দাবি করে। আসলে তাদের দাবিগুলো যে কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সে সন্দেহ প্রথম থেকেই ছিল, এখন সেটা স্পষ্টতই বোঝা গেল। বি. চৌধুরী আজ জামায়াতকে বাদ দেয়ার শর্তজুড়ে দিয়েছেন। অথচ তিনি জামায়াতের সঙ্গে একই মন্ত্রিসভায় বসেছেন। তাদের সমর্থন নিয়ে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। আর এখন জামায়াতকে বাদ দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। তিনি গোস্ত খাবেন আর ঝোলকে হারাম বলবেন এটা কী করে হয়।২০ দলীয় জোটের শরিক দল লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার ঐক্যে বিকল্পধারা নেই বলে যে বক্তব্য দিয়েছে তা রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট হয়েছে বিএনপিকে বা কোনো দলকে ক্ষমতায় আনার জন্য নয়। আজ গোটা দেশ একদিকে আর আওয়ামী লীগ সরকার একদিকে। তাই বৃহত্তর ঐক্য থেকে যারা সরে যাবে তারা নিজেরাই হারিয়ে যাবে। বিকল্পধারা আজ যে কথা বলছে এটা আওয়ামী লীগের কথার সাথে মিলে যায়। তাই দেশের মানুষ তাদেরকে সরকারের দোসর হিসেবে চিহ্নিত করবে। দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে যারা ঐক্য থেকে দূরে থাকবে তারা ভবিষ্যতে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে হারিয়ে যাবে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত