শিরোনাম
প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটের ক্রুর মাদক নেয়ার অভিযোগ

ডিজিএম রঞ্জুর হাত ধরেই অন্ধকার জগতে মাসুমা

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল লতিফ রানা  |  ০০:২৯, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮

বাংলাদেশ বিমানের কাস্টমার সার্ভিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) নুরুজ্জামান রঞ্জুর হাত ধরেই কেবিন ক্রু সৈয়দা মাসুমা মুফতি মাদকাসক্তসহ অন্ধকার জগতে প্রবেশ করেছেন। বিমানে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে এদের বিষয়ে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছেন।অপরদিকে কেবিন ক্রু মাসুমা মুফতির অন্ধকার জগতের খোঁজে মাঠে নেমেছেন একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। মাসুমা মুফতি ও নুরুজ্জামান রঞ্জুর বাসভবনসহ রাজধানীর উত্তরা গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকার মদের বার ও অন্ধকার জগত, খোলামেলা জীবনযাপন ও আড্ডাস্থলের দিকে কড়া নজর রাখা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বিমানের আরও বেশ কয়েকজন কেবিন ক্রু ও কর্মকর্তা মাসুমার অন্ধকার জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। তাদের বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে জানা গেছে। মদ্যপান করার তথ্য গোপন করে প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে দায়িত্ব পালনের জন্য কেবিন ক্রু মাসুমা মুফতিকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিমান বাংলাদেশ এয়ালাইন্স। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কাস্টমার সার্ভিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) নুরুজ্জামান রঞ্জুকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এরপর গত (২৫ সেপ্টেম্বর) মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক ক্ষুদেবার্তায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিমান বাংলাদেশের গণসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শাকিল মেরাজ। এ ঘটনায় দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করার কথা জানিয়েছেন তিনি। শাকিল মেরাজ সাংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, ভিভিআইপি ফ্লাইটে ওঠার আগে পরীক্ষাকালে ওই ক্রুর শরীরে মদ্যপানের উপস্থিতি পাওয়া যায়। বিমানের চিফ মেডিকেল অফিসার-সিএমওর ফাইনাল স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ধরা পড়ে মদ্যপানের উপস্থিতি। অ্যালকোহলের টেস্ট পজিটিভ হওয়ায় অভিযুক্ত কেবিন ক্রু সৈয়দা মাসুমা মুফতিকে ভিভিআইপি ফ্লাইট থেকে বহিষ্কার করা হয়। বাংলাদেশ বিমানের এক সূত্র জানায়, ঘটনার আগেরদিন একজন কেবিন ক্রু বা বিমানবালা মদ্যপান করার প্রমাণ পাওয়ার পরও কিভাবে তাকে পরদিন আবার ড্রিমলাইনারে ডিউটি দিয়ে সিঙ্গাপুরে ফ্লাইট দেয়া হলো সেটা আসলেই অবাক করা ব্যাপার। এর রহস্য খুঁজছেন গোয়েন্দা সংস্থাও। আর মাসুমাকে নিয়ে খতিয়ে দেখতে গিয়েও বেরিয়ে আসছে তার অজানা তথ্য। সূত্র জানায়, সুন্দরী চেহারা এবং আকর্ষণীয় হওয়ায় মাসুমাকে দিয়ে সব সময় বিজনেস ক্লাসে ডিউটি করানো হতো। আর সেই সুযোগে তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। এদের মধ্যে কার কার সঙ্গে তিনি অভিজাত এলাকায় রাতের খোলামেলা পার্টিতে যোগ দেন তারও খোঁজ নেয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটের আগের রাতে এ ধরনের কোনো পার্টিতে অংশগ্রহণ করেছেন কিনা তার খোঁজ নেয়া হচ্ছে। আবার কোথায় কী ধরনের মাদক গ্রহণ করেছেন তারও অনুসন্ধান ও তার প্রতি কড়া নজরদারি করা হচ্ছে। এছাড়া মাসুমা মুফতির বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসার দিকে গোয়েন্দা সংস্থা কড়া নজর রাখছে। ঢাকায় থাকাকালীন মাসুমা মুফতি কাদের সঙ্গে মেলামেশা করেন, কাদের সঙ্গে রাতে আড্ডা দেন তাদেরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেড়িয়ে আসছে বলে একাধিক গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, বিমানের কেবিন ক্রু বা বিমানবালারা তাদের শরীর স্লিম রাখার নামে ইয়াবার প্রতি আসক্তি হচ্ছে। তারা এখন বিভিন্ন নামিদামি মদের বারে গিয়ে ইয়াবা সেবন করছেন। আর তাদেরকে সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তিরা নানা ধরনের সহযোগিতা করে আসছেন। কে এই

মাদকসেবী বিমানবালা সৈয়দা মাসুমা মুফতি : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানের একাধিক কর্মী জানান, সৈয়দা মাসুমা মুফতি স্টুয়ার্ড হিসেবে কর্মরত। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ মহিলা কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করার পরপরই ২০০১ সালের মে মাসে বিমানে যোগ দেন। ব্যক্তিজীবনে বিবাহিত মাসুমা এক কন্যা সন্তানের জননী। তবে স্বামীর সঙ্গে তার স্বাভাবিক সম্পর্ক নেই বলে জানা গেছে। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে তিনি পৃথকভাবেই জীবনযাপন করছেন। নিজের মতোই পশ্চিমাধাঁচের খোলামেলা জীবনযাপনে অভ্যস্ত তিনি। মাসুমা মুফতি নিয়মিতই মাদকসেবন করতেন। তার মদ্যপান ও মাদকসেবনের বিষয়টি সহকর্মীদের কাছে ছিল অনেকটা ওপেন সিক্রেট। বিষয়টি ঊর্ধ্বতনদের না জানিয়ে এতদিন চেপে রেখেছিলেন, বিমানের কাস্টমার সার্ভিসের প্রভাবশালী কর্মকর্তা নুরুজ্জামান রঞ্জু।

কে এই নুরুজ্জামান রঞ্জু : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে কর্মরত অবস্থায় নুরুজ্জামান রঞ্জুর বিরুদ্ধে একাধিকবার নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠে। গত ২০১৪ সালে এক নারী কেলেঙ্কারির ঘটনার পর কিছুদিনের জন্য শাস্তি হিসেবে চিফ পার্সার থেকে রঞ্জুকে ফ্লাইট পার্সার করা হয়েছিল। কিন্তু খুঁটির জোরে পগার পার হয়ে তিনি আবার স্বপদে বহাল হন। পরে নিজের প্রভাব কাজে লাগিয়ে ডিজিএম হিসেবে পদোন্নতিও পেয়েছেন। এ ঘটনার পর বাংলাদেশ বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী শাহজাহান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, মাদক গ্রহণকারী এবং তার তথ্য ধামাচাপার চেষ্টাকারী দুজনকেই সাসপেন্ড করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে, দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। হোটেল কন্টিনেন্টালে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের আয়োজনে পর্যটন দিবস উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানের গেট খোলা নিয়ে সৃষ্ট অনিয়ম এবং মদ্যপ অবস্থায় কেবিন ক্রুর ভিভিআইপি ফ্লাইট করার চেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গাফিলতির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার পর। বিমানের এক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। অপরদিকে বিমানের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে বিতর্কের জন্ম দেয়া কেবিন ক্রু সৈয়দা মাসুমা মুফতি ও কাস্টমার সার্ভিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) নুরুজ্জামান রঞ্জুকে গ্রাউন্ডেড করা হয়েছে। সূত্র আরও জানায়, লন্ডনের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীকে বহন করা বিজি-০০১ ফ্লাইট ছাড়ার আগমুহূর্তে ডোপ টেস্টে বিমানের কেবিন ক্রু সৈয়দা মাসুমা মুফতির শরীরে অ্যালকোহলের উপস্থিতি পাওয়া যায়। চিফ মেডিকেল অফিসার (সিএমও) কর্তৃক ডোপ টেস্ট করানো হলে পজিটিভ রিপোর্ট আসে এবং তাকে ফ্লাইট থেকে বহিষ্কার করা হয়। আর এই বিষয়টি কাউকে না জানাতে এবং চাপিয়ে যেতে তিনি সিএমওকে প্রভাব খাটানো হয়। আর লন্ডনে গিয়েও তিনি অধীনস্ত সব ক্রুকে বিষয়টি গোপন রাখতে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। তারপরও বিষয়টি ফাঁস হলে এবং মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গড়ালে মুফতি এবং রঞ্জুকে গ্রাউন্ডেড করা হয়। ফ্লাইটে চিফ পার্সার হিসেবে ছিলেন কাস্টমার সার্ভিসের ডিজিএম নুরুজ্জামান রঞ্জু। ঘটনা ধামাচাপা দিতে গিয়েই তিনি ফেঁসে যাচ্ছেন। আর দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধেও। লন্ডনে পৌঁছার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানের ওয়ান-এল গেট খোলার বদলে আগে টু-এল গেট খুলে দিয়ে সাধারণ যাত্রীদের প্রথমে বের হতে সুযোগ করে দেন নুরুজ্জামান রঞ্জু। যে কারণে ২০ মিনিটের মতো বেশি সময় ফ্লাইটে থাকতে হয় প্রধানমন্ত্রীকে। বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্তারা বিষয়টিকে সঙ্গত কারণে স্বাভাবিকভাবে নেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছেন। আর এ বিষয়ে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও এএম মোদাদ্দেক আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি। বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন সচিব মহিবুল হক সাংবাদিকদের বলেন, বিমানের কাছ থেকে আমরা ঘটনার লিখিত একটি রিপোর্ট চেয়েছি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিমানবালা চট্টগ্রামের মেয়ে সৈয়দা মাসুমা মুফতিকে নিয়ে ওঠেছে আলোচনার ঝড়। রেওয়াজ অনুযায়ী ভিভিআইপি ফ্লাইটে ওঠার আগে পরীক্ষাকালে (ডোপ টেস্ট) ওই ক্রুর শরীরে মাদক সেবনের প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কেবিন ক্রু (বিমানবালা) সৈয়দা মাসুমা মুফতির অন্ধকার জীবনের খোঁজখবর নিতে মাঠে নেমেছেন গোয়েন্দারা। একটি গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র জানায়, বিমানবালা মাসুমা মুফতির বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসার দিকে তাদের কড়া নজর রয়েছে। আবার একই এলাকায় থাকেন তার বস নুরুজ্জামান রঞ্জু। ঢাকায় থাকাকালীন মাসুমা মুফতি কাদের সঙ্গে মেলামেশা করেন, কাদের সঙ্গে রাতে আড্ডা দেন, সেই খবরও পেতে শুরু করেছেন তারা। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, সুন্দর চেহারা এবং আকর্ষণীয় ফিগারের কারণে মাসুমাকে দিয়ে সব সময় বিজনেস ক্লাসে ডিউটি করানো হতো। আর সেই সুযোগে তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় ধনাঢ্য ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন মাসুমা। এদের মধ্যে কার কার সঙ্গে তিনি অভিজাত এলাকায় রাতের পার্টিতে যোগ দেন এবং প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটের আগের রাতে এ ধরনের কোনো পার্টিতে অংশগ্রহণ করেছেন কিনা তার খোঁজ নেয়া হচ্ছে। আর কোথায় কী ধরনের মাদক গ্রহণ করেছেন তারও অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। ঘটনার দিন কোন পরিস্থিতিতে মাসুমা মুফতি মদ্যপ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে ডিউটি করার সাহস দেখালো- গোয়েন্দাদের এই প্রশ্নের জবাবে যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারছে না বিমান কর্মকর্তারা। ফলে গোয়েন্দাদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর ফিরতি ফ্লাইটেও বিমানের যেসব স্টাফ ডিডটি করবেন তাদের সবার ডোপ টেস্ট করার পরামর্শ দেয়া হয়। আর সেটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে বাংলাদেশ বিমানের এক সূত্রে জানা গেছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত