শিরোনাম

আলুচাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন মুন্সীগঞ্জের কৃষকরা

প্রিন্ট সংস্করণ॥এনায়েত উল্লাহ  |  ০০:৩৯, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৮

মুন্সীগঞ্জের মানুষের কাছে আলুচাষ হচ্ছে একটি পেশা বা পারিবারিক ঐতিহ্য। কিছু কিছু কৃষকের কাছে এটা পেশা। আর কিছু কৃষকের কাছে তা পারিবারিক ঐতিহ্য। যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এলাকার মানুষ সামাজিকতা বা পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে বর্তমানে আলু চাষ করছে। গত কয়েক বছর যাবত আলুচাষে তেমন লাভ হচ্ছে না বরং লোকসান গুণতে হচ্ছে কৃষকদেরকে। এমনটিই জানিয়েছেন কৃষকরা। মুন্সীগঞ্জের মানুষের কাছে আলু চাষ একসময়কার অর্থকরী ফসল থাকলেও বর্তমানে তারা ন্যায্য মূল্য না পেয়ে আলুচাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে জানান তারা। মুন্সীগঞ্জের ৬টি উপজেলার দিগন্ত বিস্তৃত মাঠে আলুর চাষ হয়ে থাকে। আর মাত্র কিছুদিন পরই শুরু হবে আলু রোপণ। কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, আলু রোপণের আদর্শ সময় হচ্ছে নভেম্বর মাসের শুরুর দিকে। তাই কৃষকরা ইতোমধ্যেই আলু রোপণের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। ছয়টি উপজেলার ৩৮ হাজার ৮শ হেক্টর জমিতে এবার আলুচাষ হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই আলুর ন্যায্য দাম না পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন তারা। তাদের দাবি গত কয়েক বছর যাবত আলু বিক্রিতে তারা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাওয়া এবং সঠিকভাবে তা সংরক্ষণ করতে না পারাই এর মূল কারণ। কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এক কানি (১৪০ শতক) আলুচাষ করতে খরচ হয় প্রায় ৩ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা। যা বিক্রি হওয়ার কথা ডাবল দামে। কিন্তু তা বিক্রিতে সেই দাম আর পায় না কৃষকরা। আলুচাষের লোকসানের বর্ণনা দিতে গিয়ে কৃষকরা জানান, আলুর দাম কম থাকলে এক কানি জমি ভাড়া নিতে হয় ৭০ হাজার টাকায়। আর দাম ভালো থাকলে তা নিতে হয় এক লাখ বিশ থেকে এক লাখ ত্রিশ হাজার টাকায়। জমি পরিষ্কার ও রোপণ বাবদ দিতে হয় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। চাষে দিতে হয় ৭ থেকে ৯ হাজার টাকা। আগাছা পরিষ্কারে যায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। কীটনাশকে যায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। পানি সেচে খরচ হয় ১০ থেকে বারো হাজার। উত্তোলনে খরচ হয় ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা। ৮০ থেকে ৯০ কেজি আলু ধরে এমন একেকটি বস্তা ক্রয় করতে হয় ৬০ থেকে ৮০ টাকায়। পরিবহণে খরচ হয় প্রতি বস্তায় প্রায় ২০ টাকা। এছাড়াও কোল্ড স্টোরেজে রাখতে প্রতি বস্তায় ভাড়া দিতে হয় সাড়ে তিনশ টাকা। তবে কোল্ড স্টোরেজে মাল পরিপূর্ণ হয়ে গেয়ে গেট বন্ধ করে দেয়। আর যদি গেট বন্ধ হয়ে যায় তখন বস্তা ভিতরে ঢুকাতে খরচ হয় প্রতি বস্তায় ৫০ থেকে ৮০ টাকা। সবমিলিয়ে এক কানি জমিতে আলুচাষে খরচ হয় তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা। যা বিক্রি হওয়ার কথা ৭ থেকে আট লাখ টাকায়। কিন্তু গত কয়েক বছরে মূলধন পাওয়াই কঠিন হচ্ছে বলে জানান কৃষক। প্রতি মণ আলু চাষে খরচ হয় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। যা বিক্রি হয় ৪ থেকে ৫শ টাকায়। কখনো কখনো প্রতি মণ আলু বিক্রি হয় ৮শ থেকে ১ হাজার টাকায়। তবে গত কয়েক বছর যাবত এরকম দাম পাওয়া যাচ্ছে না। লোকসানের কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন, কোল্ড স্টোরেজের সুবিধা সঠিকভাবে না পাওয়ায় আলু গোলায় রাখতে হয়। আর গোলায় রাখলে আলু পচে যায়। সে কারণে লস গুণতে হয়। তাছাড়া উৎপাদনে যা থাকে তা সংরক্ষণের পর তা অনেক ঘাটে যায়, যে কারণে সেটাও লসের একটা কারণ। সে কারণে লাভ না হয়ে প্রতি বছর লস হচ্ছে বলে জানান কৃষক। অন্যদিকে দীর্ঘদিন থেকেই কোল্ড স্টোরেজের মালিকরা দাবি করে আসছে যে, কোল্ড স্টোরেজ ব্যবসায় তাদের লস হচ্ছে। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন, আলুর দাম কম থাকাতে কোল্ড স্টোরেজে আলু রাখার পর কৃষকরা তা নেয় না। অন্যদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে খরচ বেড়ে গেছে। এছাড়াও আলুচাষের শুরুর দিকে লাখ লাখ টাকা দাদন (লোন) দিয়ে থাকে কোল্ড স্টোরেজ মালিকরা। আলুর দাম কম থাকায় তা আর ফেরত পায় না বলে দাবি তাদের। তবে কৃষকরা এ বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেননি। তারা বলেন, এক বস্তা (৮৫ থেকে ৯০ কেজি) আলু কোল্ড স্টোরেজে রাখতে খরচ হয় সাড়ে তিনশ টাকা। আর তা বিক্রি হয় সব সময় এর চেয়ে বেশি দামে। সুতরাং লস হলেও কখনো কোল্ড স্টোরেজে মাল ফেলে রাখা হয় না। তাদের দাবি অনুযায়ী আলু চাষ হচ্ছে তাদের ঐতিহ্য। তারা তাদের সামাজিকতা ধরে রাখতে ও ঐতিহ্য ঠিক রাখতে তারা কখনো কোল্ড স্টোরেজে মাল ফেলে রাখেন না। এমনকি লস হলেও তারা ভর্তুকি দিয়ে মাল নিয়ে আসে। কোল্ড স্টোরেজ মালিক অ্যাসোসিয়েশন গত কয়েকমাস পূর্বে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন। যেখানে বলা হয় আলু সংরক্ষণে গত বছর ৭২টি কোল্ড স্টোরেজের লস হয়েছে সাড়ে বারো হাজার কোটি টাকা। এ সম্পদ রক্ষায় তারা সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তবে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া দেননি। আলুচাষে লস নিয়ে মুন্সীগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অফিস বলছে ভিন্ন কথা। মুন্সীগঞ্জের জেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ হুমায়ুন কবির জানান, আলুচাষে লস হচ্ছে ব্যাপারটা ঠিক না। লাভ কম হচ্ছে সেটা বলা যেতে পারে। এই অবস্থায় স্থানীয় পদ্ধতিতে আলু সংরক্ষণ করে ৩-৪ মাস পর বিক্রি করার পরামর্শ দিয়েছেন মুন্সীগঞ্জের কৃষি কর্মকর্তা। জানা যায়, গত দুই মৌসুমে আলুর দাম না পাওয়ায় এ বছর লোকসান কাটিয়ে উঠতে এক বুক আশা নিয়ে ধার-দেনা করে কৃষকরা আলুর আবাদ করার চিন্তা করছে। গত মৌসুমে মুন্সীগঞ্জের আলুচাষিরা তাদের মূলধনই পাননি। ভাড়া পরিশোধ করতে না পেরে কোল্ড স্টোরেজেই আলু ফেলে রেখে চলে আসে বলে কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের দাবি। মুন্সীগঞ্জের প্রধান অর্থকরী ফসল আলু। বারবার লোকসানের পরও মুন্সীগঞ্জের কৃষকরা লাভের আশায় আলু উৎপাদন করে আসছেন। আর আলু সংরক্ষণের জন্য জেলার ৬টি উপজেলায় ব্যক্তি মালিকানাধীন ৭২টি কোল্ড স্টোরেজ (হিমাগার) রয়েছে। এসব কোল্ড স্টোরেজের ধারণক্ষমতা ৫ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন। গেল বছরে জেলায় ১৩ লাখ ৫১ হাজার ১২৯ টন আলু উৎপাদন হয়েছিল এবং এর মধ্যে ৬০ থেকে ৬৫ হাজার মেট্রিক টন আলু বীজ হিসেবে সংরক্ষণ করে কৃষকরা। বাকি আলুর কিছু অংশ কৃষকরা জমিতে বিক্রি করে দেয় এবং কিছু আলু স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ করেন। কিন্তু গেল বছর দাম না পেয়ে কৃষকরা কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করা আলু সেখানে রেখেই চলে আসে। কিন্তু এ বছর কিছু কৃষক প্রবাসী সন্তানের পাঠানো টাকা এবং কেউ কেউ ধার-দেনা করে আলু আবাদ করবেন বলে চিন্ত করছেন। গত বছর জেলায় ৩৮ হাজার ৩শ হেক্টর জমিতে আলু রোপণ করা হয়েছিল, যা ২০১৬ সালের চেয়ে ১ হাজার মেট্রিক টন কম লাগানো হয়েছিল। ২০১৬ সালে আলু রোপণ করা হয়েছিলো ৩৯ হাজার ৩শ হেক্টর জমিতে। এদিকে, আলু রোপণ ও উত্তোলনের সময় রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নেত্রকোণা, ময়মনসিংহসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে কয়েক হাজার শ্রমিক মুন্সীগঞ্জ জেলার বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করে থাকে চুক্তিভিত্তিকভাবে। গত বছর আলুর দাম না পাওয়া এবং আলুর ফলন কম থাকায় উত্তরাঞ্চলের শ্রমিকদের খুব একটা কাজ ছিল না বলে জানান শ্রমিক নেতা শফিক। মুন্সীগঞ্জের কৃষকরা জানান, গত বছর ফলনও কম ছিল, দামও ছিল কম। পাইকাররা জমিতেই তেমন আসেনি। অন্যদিকে, বাজারে আলুর ক্রেতা বা পাইকারও ছিল কম। অনেকেই জমিতে আলু স্তূপ করে রেখে ছিল যা বাড়িতে উঠায়নি। এ অবস্থায় আলুচাষিরা সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন এবং বিদেশে আলু রপ্তানির দাবি তুলেছেন। মুন্সীগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, মুন্সীগঞ্জের আলু রপ্তানি করার মতো না। রপ্তানি করতে হলে তাদেরকে কৃষি অফিসের ফর্মুলা পুরোপুরি মানতে হবে। কৃষি অফিসের ফর্মুলা সঠিকভাবে মানলে তাদের লস কমে আসবে বলে জানায় অফিস সূত্রটি। এ ব্যাপারে ২০১৫ সালে জৈবসার ব্যবহার করে ভালো ফলন উৎপাদনে সরকারি পুরস্কারপ্রাপ্ত সৈয়দ মাহমুদ হাসান মুকুট বলেন, আমি গত বছর সাড়ে ষোলকানি জমি আবাদ করেছি। যা বিক্রিতে আমার প্রায় ১৯ লাখ টাকা লস হয়েছে। লসের কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, গোলায় যে সমস্ত আলু রাখা হয়েছিল তার অধিকাংশই পচে গেছে। আর কোল্ড স্টোরেজে থাকা আলুর ন্যায্য দাম পায়নি। মুন্সীগঞ্জের সবচেয়ে বেশি আলু চাষ হয় সিরাজদিখানে। সেখানে প্রায় ৯ হাজার ৪শ ৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়ে থাকে। এলাকার কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার মোশাররফ হোসেন বলেন, আমার এলাকায় কৃষকরা আলুচাষে ভালো করছে। তবে লসের যে ব্যাপারটা হচ্ছে তাদের কিছু নিজস্ব নীতির কারণে হচ্ছে। তারা আলুচাষে কৃষি অফিসের ফর্মুলা ততটা ফলো করতে চায় না। সে কারণেই তাদের লাভটা কম হয়ে থাকে। আমাদের ফর্মুলা পুরোপুরি মেনে চললে আশা করি তাদের লভ্যাংশ আরও বেড়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, মুন্সীগঞ্জের আলু রপ্তানি হওয়ার মতো না। এটাকে রপ্তানি করতে হলে কৃষি অফিসের নির্দেশনা মানতে হবে। নির্দেশনা মেনে চললেই তা রপ্তানিমুখী করা যাবে। এ ব্যাপারে কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, আমাদের কোল্ড স্টোরেজগুলো গত বছর প্রায় সাড়ে বারো হাজার কোটি টাকা লস করেছে। আলুর দাম কম থাকাতে কৃষকরা কোল্ড স্টোরেজে আলু রেখে পরে আর তা নেয়নি। তাছাড়া চাষের পূর্বে তাদের যে দাদন দেয়া হয় সেটাও পরবর্তী সময়ে আর ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না। সে কারণে প্রতি বছরই আমাদের লস গুণতে হচ্ছে। আমরা এ ব্যাপারে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করি। আলু চাষের সমস্যাগুলোকে সমাধান করে আলুর দাম বাড়াতে পারলে আলুও হতে পারে দেশের অন্যতম রপ্তানি পণ্য। এমনটিই দাবি করেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বর্তমানে কৃষকরা আলু চাষে অতিরিক্ত কীটনাশক ও সার ব্যবহার করছে। যার ফলে মাটির গুণগতমান কমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০ থেকে ২৫ বছর পর এ জমিতে আর কোনো ফসল হবে না। সুতরাং এ ব্যাপারটিতে কৃষি বিভাগকে আরও ব্যাপকহারে হস্তক্ষেপের জন্য আহ্বান জানান তারা। বর্তমানে দেশের চাহিদা মেটাতে আলুর প্রয়োজন হয় ৭০ থেকে ৮০ মেট্রিক টন, সেখানে দেশে উৎপাদন হয় এক কোটি মেট্রিক টনের উপরে। দেশের এই বাড়তি আলু আরও ব্যাপকহারে রপ্তানির ব্যবস্থা করতে পারলে আগামী দিনে পোশাকের মতো আলুও হতে পারে দেশের অন্যতম রপ্তানি পণ্য।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত