শিরোনাম

পেপার মিল মালিকদের সিন্ডিকেট: দুর্দিনে প্রিন্ট মিডিয়া

প্রিন্ট সংস্করণ॥বেলাল হোসেন  |  ০০:১৭, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮

বছরের পর বছর কালজয়ী প্রিন্ট মিডিয়া। কালের বিবর্তনে প্রিন্ট মিডিয়া এখন চরম হতাশায় ভুগছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অনেক সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠান। নিউজ প্রিন্ট কাগজের মূল্য বৃদ্ধি। সরকারি বিজ্ঞাপনের হার কমে যাওয়া এবং প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার প্রতি বেশি ঝুঁকে যাওয়ায় বেহাল অবস্থায় পড়েছে প্রিন্ট মিডিয়াগুলো।সম্প্রতি বিশ্ববাজারে কাগজের দাম বাড়ায় দেশি পেপার মিল মালিক ও আমদানিকারকরা বিশেষ সুযোগ সন্ধানে আছে বলে অভিযোগ করছেন সংবাদপত্রের মালিক-প্রকাশকরা। তারা বলছেন, কাগজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সরকারের বিশেষ তদারকি দরকার। তা না হওয়ায় এই সিন্ডিকেটের কাছে চরম অসহায় হয়ে পড়েছে প্রিন্ট মিডিয়াশিল্প। অপরদিকে শিক্ষার্থীদের অপরিহার্য উপকরণ বই থেকে শুরু করে খাতা এমনকি ফটোকপির মূল্যও বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। গত ২-৩ মাস আগে ৬৫ গ্রাম দেশি অফসেট প্রিন্ট পেপার বিক্রি হয়েছে ১৮০ টাকা প্যাকেট, এখন এর খুচরা বাজার মূল্য ২৩০ টাকা। এছাড়াও ভালো মানের ৮০ গ্রাম অফসেট প্রিন্ট পেপার আগে ছিলো ৩৪০ টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৪০০ টাকা। ফলে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন শিক্ষার কাজে ব্যয় বেড়ে গেছে।প্রিন্ট পত্রিকায় ব্যবহৃত কাগজের দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানীর নয়াবাজারের প্রত্যাশী ট্রেড সেন্টারের ম্যানেজার মিজানুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, বিদেশি ভালোমানের নিউজ প্রিন্ট কাগজের দাম বেড়ে গেছে। এখন আমরা আমদানি করছি না। দেশি নিউজ প্রিন্ট কাগজ বিক্রি করছি। এগুলো আগে ৩৫ টাকা কেজি ছিলো, বর্তমানে বাজার মূল্য ৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে। দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি হওয়ায় দেশি মিল মালিকরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়াও অফসেট প্রিন্ট পেপার ৩ মাস আগে প্রতি টন ৮০ হাজার টাকা দরে বিক্রি হতো, বর্তমানে বেড়ে তা প্রতি টন ১ লাখ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। নয়াবাজারের রেজা এন্টারপ্রাইজে কর্মরত সুমন জানান, গত কয়েক মাসের ব্যবধানে কাগজের দাম বেড়ে গেছে। দেশি নিউজ প্রিন্টের চাহিদা এখন বেশি। বড় পেপার মিল মালিকরা যে কাঁচামাল ব্যবহার করছেন তা বাইরে থেকে আনতে খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমাদের কাছে দাম বেশি ধরছেন। এখানে আমাদের কিছু করার নাই। বাজার ঠিক রেখে বিক্রি করা হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, রাজধানীর বিভিন্ন প্রিন্ট পত্রিকাগুলো নয়াবাজার থেকে সংবাদপত্র ছাপানোর কাগজ ক্রয় করে। তবে বর্তমানে দাম বেড়ে যাওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে প্রিন্ট মিডিয়াশিল্প।বিশেষ সূত্রে জানাগেছে, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় উভয় বাজারেই কাগজের দাম বাড়তি। গত পাঁচ মাসের ব্যবধানে প্রতি টন দেশি কাগজের দাম মানভেদে বেড়েছে ২০ থেকে ২৩ হাজার টাকা। চলতি বছরের এপ্রিলে যে কাগজের দাম টনপ্রতি ছিল ৬৫ থেকে ৬৮ হাজার টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০ থেকে ৯৫ হাজার টাকায়। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আগে যে কাগজ আমদানি করতে ৮৫০ থেকে ৯০০ মার্কিন ডলার লাগতো এখন লাগছে ৯২০ থেকে এক হাজার ডলার। দেশে সাধারণত চীন, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া থেকে বেশি কাগজ আমদানি হয়। এসব দেশে কাগজ উৎপাদনের মূল কাঁচামালের (পাল্প) দাম বেড়ে যাওয়ায় আমাদের দেশেও দাম বাড়তি। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার সুযোগ নিয়েছে দেশের মিল মালিকরা। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে দাম বাড়িয়েছেন বলে অভিযোগ করছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।এ বিষয়ে জানতে চাইলে দৈনিক মানবজমিন’র প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী আমার সংবাদকে বলেন, আমাদের পত্রিকা শিল্পে কোনো সাপোর্ট নাই। খুব চালেঞ্জ-এর মুখে আছি। এই চালেঞ্জ মোকাবিলা করা খুব কঠিন। আবার নতুন করে ওয়েজ বোর্ড ঘোষণা হয়েছে। প্রিন্টিং খরচ বেড়েছে, কাগজের দাম বেড়েছে। জীবন যাত্রার মান বেড়েছে। আমাদের টিকে থাকাই কঠিন। তিনি বলেন, আমরা যারা আছি খুব কষ্ট করে টিকে আছি। অনেক সংবাদ পত্র বন্ধ হওয়ার পথে। সরকারের উচিত এই শিল্পের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার পাশাপাশি সহযোগিতা করা। আমার সংবাদের প্রকাশক ও সম্পাদক হাশেম রেজা বলেন, আগে সরকারি বিজ্ঞাপন দিয়ে কিছুটা চলা যেতো। এখন ইজিপি, ই-টেন্ডার হওয়ার কারণে আগের ৮০ ইঞ্চির বিজ্ঞাপন এখন হয়েছে ১৬ ইঞ্চি। ফলে সংবাদপত্রশিল্পে টিকে থাকাই বড় চালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক মাসে ধারাবাহিকভাবে পেপার মিল মালিকরা বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে কাগজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। এখন দেশের বড় বড় সংবাদপত্র আজ হুমকির মুখে। অনেক সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে গেছে। আরও কিছু সংবাদপত্র বন্ধের পথে। তিনি বলেন, এই শিল্পের দিকে সরকার সুনজর না দিলে আমরা বর্তমানে বাজারে টিকে থাকতে পারবো না। বর্তমানে অনলাইনে পাঠক সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় একদিকে যেমন উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে কমে গেছে মুদ্রণ, একইসঙ্গে কমে গেছে বিজ্ঞাপনের হার। এতে করে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে পত্রিকাগুলো। এদিকে সংবাদপত্রশিল্পের সাথে জড়িতরা বলছেন, সরকারি বিজ্ঞাপনের হার কমে যাওয়া, এরপরও বছরের পর বছর সরকারি বিজ্ঞাপনের বিল বাকি থাকা- এই শিল্পের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এসবের চেয়ে বড় সংকট হলো কাগজের দাম বেড়ে যাওয়া। নিউজ প্রিন্টের দাম অত্যাধিক বেড়েছে। ফলে প্রিন্ট মিডিয়ার টিকে থাকাই মুশকিল হয়ে পড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের বেশকিছু পেপার মিল বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণে সহজেই কাগজ আমদানি করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে দেশের বাজারেও কাগজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন মিল মালিকরা। ফলে মুদ্রণশিল্প বেকায়দায় পড়েছে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত