শিরোনাম

বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে এ কেমন ভোগান্তি

প্রিন্ট সংস্করণ॥আফছার আহমদ রূপক  |  ০০:৩৮, জুলাই ১২, ২০১৮

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের স্বেচ্ছাচারিতা ও অদক্ষতা মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এফএনএসি নামক একটি টেস্ট করাতে এসে বিভাগটির চিকিৎসকদের কাছে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগীরা। বাড়ছে রোগযন্ত্রণাও। বিশেষ করে দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীরা দিনের পর দিন কষ্টের পাশাপাশি বাড়তি খরচ জোগাতে গিয়ে হচ্ছেন নিঃস্ব। সব হাসপাতালে এফএনএসি পরীক্ষাটি একবার করার পরই রিপোর্ট দেওয়া হয়। অথচ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে প্রায়ই রোগীদের দুইবার পরীক্ষা করানোর পর রিপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। ফলে ঢাকার রোগীদের কম কষ্ট হলেও ঢাকার বাইরের রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এছাড়া অতিরিক্ত টাকাও খরচ হচ্ছে। একবার পরীক্ষার ফি এবং আরেকবার যাতায়াত ভাড়া ও ঢাকায় এসে থাকা-খাওয়ার খরচÑ এ ধরনের হয়রানি কয়েক বছর ধরে চললেও নেই কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথা। আর এতে চরম বিরক্তি প্রকাশ করেছেন রোগীরা। এমনই এক রোগী জসিম উদ্দিন। হবিগঞ্জের বাসিন্দা জসিম জানান, প্যাথলজি বিভাগে কয়েকদিন আগে তিনি এফএনএসি পরীক্ষা করাতে এসে দুর্ভোগের কবলে পড়েন।তার ঘাড় ও গলার অংশে টিউমার দেখা দিলে নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এফএনএসি পরীক্ষার জন্য প্যাথলজি বিভাগে পাঠান। চিকিৎসকরা তার পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি চলে যেতে বলেন এবং ৪-৫ দিন পর রিপোর্ট নিতে বলেন। জসিম বাড়ি ফেরার দুদিন যেতে না যেতেই প্যাথলজি বিভাগ থেকে ফোন করে বলা হয়, এফএনএসি পরীক্ষা আবার করতে হবে এবং দ্রুত আসতে হবে। নিরুপায় হয়ে জসিম হবিগঞ্জ থেকে আবার ঢাকায় আসেন এবং দ্বিতীয়বার তার এফএনএসি নেওয়া হয়। আর তাতে আরও ৪-৫ দিন পিছিয়ে যায় তার রোগ শনাক্তকরণে। এতদূর থেকে আসার খরচ ও কষ্ট তো আছেই। জসিম আমার সংবাদকে বলেন তিনি একজন ক্ষুদ্র কৃষক। একই পরীক্ষা বারবার করার কারণে এ হাসপাতালের প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন এবং আর্থিক ও শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এভাবে কেবল জসিমই নন, প্যাথলজি বিভাগে অসংখ্য রোগী একাধিকবার এফএনএসি পরীক্ষা করাতে এসে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন এবং প্রশ্ন করছেন ছোটোখাটো হাসপাতাল-ক্লিনিকে একবারেই এফএনএসি পরীক্ষা করা সম্ভব হলেও এতবড় মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে বারবার কেন?বিশেষজ্ঞ প্যাথলজিস্টদের মতে, ক্যান্সার-যক্ষ্মাসহ বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ের জন্য শরীরের বিভিন্ন স্থানে টিউমার ও অন্যান্য সমস্যায় আক্রান্ত স্থানে সুঁই দিয়ে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়ে থাকে এফএনএসির মাধ্যমে। এফএনএসি একটি কঠিন পরীক্ষা। ঠিকমতো সঠিক জায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা না গেলে নির্ভুল রিপোর্ট হবে না। তাই বলে একই এফএনএসি বারবার পরীক্ষা করা লাগবে কেন। যে চিকিৎসক এ বিষয়ে দক্ষ তাকে দিয়েই তো পরীক্ষাটি করানো উচিত। তারপর আবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের তো সুনাম রয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উল্লিখিত প্যাথলজি বিভাগটিতে এফএনএসির ভুল রিপোর্ট দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এমনই একটি ঘটনা ঘটেছিল গত বছরের নভেম্বর মাসের শেষদিকে। ৭০ বছরের বৃদ্ধ আব্দুল আহাদের ঘাড়ের টিউমারের এফএনএসি পরীক্ষা করানো হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে। এখান থেকে ক্যানসার হয়নি বলার পর ডাক্তারের পরামর্শে আহাদের এক আত্মীয় তাকে নিয়ে এফএনএসি করান ধানম-ির আনোয়ারা মেডিকেল সার্ভিস সেন্টার থেকে। এ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা এফএনএসি করে ক্যানসার হয়েছে বলে জানান। কয়েকমাস পর ক্যানসারে মারা যান আব্দুল আহাদ। তবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির অভিযোগ এফএনএসি নিয়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফেরদৌসী বেগমের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি আমার সংবাদকে বলেন, ব্লাইন্ডভাবে এফএনএসি করার ফলে অনেক সময় সঠিক স্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ করা না হলে সঠিক রিপোর্ট আসে না। তাই কখনো তিনবারও এফএনএসি করতে হয়। রোগীর ভালোর জন্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামেরও একটা ব্যাপার আছে। পোস্ট গ্রাজুয়েশন স্টুডেন্টদের ওপর নির্ভরতা বেশি হওয়ার কারণে একাধিকবার এফএনএসি পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন হয় কিনা এবং অন্য হাসপাতালে একবার এফএনএসি করেই রিপোর্ট দেওয়া সম্ভব হয় কীভাবে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এখানে বেশি রোগী আসে তাই এমন দু-একটি ঘটনা হতে পারে। স্টুডেন্ট দিয়ে পরীক্ষা করানোর একটি ব্যাপার তো আছেই। তার কথার কিছুটা মিল পাওয়া গেছে প্যাথলজি বিভাগ থেকে একজন রোগিনীর স্বজনকে ফোন দেওয়ার পরই। ওই রোগিনীর চোয়ালের মাংস (বায়োপসি) পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়েছিল প্যাথলজি বিভাগে। দুদিন পর তার স্বজনের কাছে জানতে হওয়া হয় ক্লিনিকেল ডাক্তার অর্থাৎ যিনি রোগিনীকে দেখার পর বায়োপসি করাতে পাঠিয়েছেন তিনি কি সন্দেহ করেছেন। বিষয়টি এমন মনে হলো যে, যদি ক্লিনিকেল ডাক্তার ক্যানসার বলেন তাহলে প্যাথলজি বিভাগও ক্যানসার হয়েছে বলে রিপোর্ট দিতে সুবিধা হবে। অথচ দক্ষ প্যাথলজিস্ট কখনো রোগীর স্বজনকে এমন প্রশ্ন করেন না। তিনি স্লাইট দেখেই রোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন অনায়াসে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত