শিরোনাম
কোটার আন্দোলন নিয়ে দূতাবাসগুলোর বিবৃতি

বিভক্ত দেশের রাজনৈতিক দল ও বিশেষজ্ঞরা

প্রিন্ট সংস্করণ॥জাকির হোসেন  |  ০০:১৯, জুলাই ১২, ২০১৮

কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে ঢাকায় অবস্থিত বিভিন্ন দেশের দূতাবাসগুলোর বিবৃতি নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছে দেশের রাজনৈতিক দল ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলেছে, কোটা সংস্কার আন্দোলন আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এখানে তারা মতামত বা হস্তক্ষেপ করতে পারে না। বিএনপি বলেছে, খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখেছেন এখন ভয় হচ্ছে কোটা সংস্কারের আন্দোলনে বিভিন্ন দূতাবাস কথা বলছেন, নাগরিকসমাজ কথা বলছেন, না জানি কখন এই নাগরিকসমাজের ব্যক্তিদেরও পিটুনি দেয়। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরাও পক্ষে-বিপক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ড. সাম্মী আহমেদ বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এখানে তারা মতামত বা হস্তক্ষেপ করতে পারে না। আমরা তো তাদের দেশের ভেতরের কোনো ঘটনায় সংহতি জানাই না, আমরা এটা পারিও না। ঠিক তেমনি তারা সেটা পারেন না। দূতাবাসগুলো শিষ্টাচারবহির্ভূত কাজ করেছে।আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য অ্যাম্বাসেডর মোহাম্মদ জমির বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে দূতাবাসগুলো বলেছে, সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে, কি
হয়নি। এ ব্যাপারে তাদের অভিমত প্রকাশ করেছে। কিন্তু এটা করা অবশ্যই উচিত নয়। এটা আমাদের গায়ে নেওয়ার কিছু নেই, তারা যাই বলুক। আমাদের দেশের মঙ্গলের জন্য যা করার আমরা তাই করবো। এসময় দূতাবাসগুলোর প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে প্রবীণ এ কূটনীতিক বলেন, কোটা আন্দোলনে বিভিন্ন জাতের লোক অনুপ্রবেশ করেছে। অনুপ্রবেশ করে তারা সহিংসতার মাধ্যমে সবকিছু করতে চান। না হলে ভিসির বাড়িতে ঢুকে আগুন লাগানো গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের জিজ্ঞেস করা উচিত, যখন ভিসির বাসভবনে আক্রমণ হলো, তখন আপনারা মন্তব্য করেননি কেন? তিনি আরও বলেন, তারা মানবাধিকারের কথা বলছেন। ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আমরা যে সারা বিশ^কে মানবাধিকার দেখিয়েছি, তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিক না। বাংলাদেশ মানবাধিকার বিষয়টা যতটা বোঝে, অন্যরা তা বোঝে না। তাবাসগুলোর বিবৃতি নিয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখেছেন এখন ভয় হচ্ছে কোটা সংস্কারের আন্দোলনে বিভিন্ন দূতাবাস কথা বলছেন, নাগরিকসমাজ কথা বলছেন না জানি কখন এই নাগরিকসমাজের ব্যক্তিদেরও পিটুনি দেন। তিনি আরও বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন একটা যৌক্তিক দাবি। এ নিয়ে শুধু বিএনপির বক্তব্য নয়, আওয়ামী লীগ ছাড়া সব রাজনৈতিক দলই কথা বলেছে। কোটা সংস্কারের আন্দোলনের পক্ষে সব মানুষের কথা, সব রাজনৈতিক দলের কথা। দেশের সব মানুষের যুক্তির পক্ষেই বিএনপি কথা বলেছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন প্রেক্ষাপটে এ সরকার আন্দোলনকারীদের মতপ্রকাশের অধিকারকে দলীয় পেটোয়াবাহিনী দিয়ে হামলা চালিয়ে সংকুচিত করে ফেলছেন। এটাতো ফ্যাসিবাদী চরিত্র! পিটিয়ে আন্দোলন দমন করা হচ্ছে। এই ফ্যাসিবাদী সরকারকে ঠেকাবে কে? জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান আমার সংবাদকে বলেন, এ বিষয়ে বিদেশি দূতাবাসগুলোর বিবৃতি দেওয়া উচিত নয়। আমাদের দেশের রাজনৈতিক বৈরিতার সুযোগ নিচ্ছে তারা। পৃথিবীর কোনো দেশে এরকম বিবৃতি দেয় না। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার বিষয়েও তারা বিবৃতি দিতে পারে না। আমেরিকা, লিবিয়ায় যেসব ঘটনা ঘটছে সেখানে তো তারা বিবৃতি দেন না। তিনি আরও বলেন, আমিও হামলাকারীদের বিচার চাই। রাষ্ট্র আমাদের, সমাজ আমাদের। আমরাই এর বিচার করবো।তবে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, মানবাধিকার রক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এসব বিবৃতিকে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। দূতাবাসগুলোর বিবৃতিকে কোটা সংস্কার দাবির সাথে যুক্ত করতে চাইছেন না সাবেক এই রাষ্ট্রদূত। তার ধারণা, মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা এবং ছাত্রদের ওপর সহিংসতার বিষয়টিকে দূতাবাসগুলো বড় করে দেখেছে। তাদের বক্তব্যটা ঠিক কোটাকে কেন্দ্র করে নয়। ছাত্ররা যারা মতামত প্রকাশ করতে চেয়েছে তাদের ওপর বেশ কবার হামলা হয়েছে। তাদের ওপর হামলা করাটা আমার ধারণা দূতাবাসগুলোর নজরে লেগেছে। হয়তো সেজন্যই তারা উদ্বেগটা প্রকাশ করেছে।এদিকে কোটা-বিরোধী ছাত্রদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস বিবৃতি দেয়ার একদিন পরই সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস এবং নরওয়ে দূতাবাসও বিবৃতি দিয়েছে। এসব বিবৃতি তাদের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত হয়েছে। নরওয়ে দূতাবাসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মতপ্রকাশের অধিকারের ওপর ধারাবাহিক হামলার বিষয়টি নিয়ে তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সকল বাংলাদেশির মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রতিবাদ করার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা করার অধিকার রয়েছ এমন কথা উল্লেখ করেছে নরওয়ের দূতাবাস। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ড দূতাবাস তাদের বিবৃতিতে ঢাকা এবং অন্য শহরে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ওপর সাম্প্রতিক হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, যেসব নীতির ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সমাবেশের ওপর এ ধরনের হামলা সেসব নীতির পরিপন্থি। নেদারল্যান্ডস দূতাবাস উল্লেখ করেছে মত প্রকাশ এবং সমাবেশ করার অধিকার সার্বজনীন মানবাধিকার।গত ৯ জুলাই ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস তাদের ফেসবুক পাতায় প্রকাশ করা এক বিবৃতিতে বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যারা বাংলাদেশের গর্বিত গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নেতা তাদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ওপর আক্রমণ সেই সব মূলনীতির বিরোধী, যার ওপর আমাদের মতো দেশগুলো প্রতিষ্ঠিত। এতে আরও বলা হয়, বাক স্বাধীনতা, জমায়েতের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারের মতো যে মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো যারা প্রয়োগ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার তাদের সাথে সংহতি প্রকাশ করছে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত