শিরোনাম

চিকিৎসায় বাণিজ্যের নেশা পথে বসছে রোগীরা

প্রিন্ট সংস্করণ॥আফছার আহমদ রূপক  |  ০০:০৭, জুন ২২, ২০১৮

মোক্তার হোসেন। বয়স ৩০ বছর। মাছ ব্যবসায়ী। ৬ বছর আগে হিপ (উরুসন্ধি) নষ্ট হয়ে গেলে শরণাপন্ন হন একজন চিকিৎসকের। তিনি প্রাইভেট হাসপাতালে অপারেশনের মাধ্যমে একটি কৃত্রিম হিপ লাগান। বিনিময়ে এক লাখ ৭০ হাজার টাকা অপারেশন খরচ নেন। এরমধ্যে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা নাকি হিপের দাম। এটি কোম্পানি থেকে কেনা হয়েছে। চিকিৎসক এই হিপটির ৩৫ বছর গ্যারান্টি দিলেও ৫ বছর পরই প্রচ- ব্যথা শুরু হয় মোক্তারের এবং খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে থাকেন। দিশেহারা হয়ে আবার গেলেন ওই চিকিৎসকের কাছে। চিকিৎসক জানালেন হিপটি ভেঙে গেছে এবং এটি মেরামত করার সুযোগ নেই। নতুন করে লাগাতে হবে। এবার তিনি চাইলেন অপারেশন খরচ ৩ লাখ টাকা। হতাশ মোক্তার বললেন, তিনি আগেই হিপ লাগিয়েছেন ধার-কর্জ করে। এখন সর্বস্বান্ত অবস্থায় এত টাকা জোগাড় করবেন কেমন করে। তিনি জানতে চাইলেন কেন ৩৫ বছরের গ্যারান্টি থাকার পরও ৫ বছর না যেতেই কৃত্রিম হিপ নষ্ট হয়ে গেল। চিকিৎসক জবাব এড়িয়ে গেলেও এ বিষয়ে অন্যান্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেনÑ হয় হিপটি কমদামের ছিল, নয় ঠিকমতো অপারেশন হয়নি। এতে বাণিজ্য করার সম্ভাবনাই বেশি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও কোম্পানির। এভাবে আরও একটি মেডিকেল ডিভাইসে চিকিৎসাবাণিজ্য চলছে, আর তা হলো হাঁটু। হাঁটুর সমস্যা নিয়ে গেলেই কিছু চিকিৎসক আছেন সেটি মেরামত কর দেওয়ার চিন্তা না করে কৃত্রিম হাঁটু লাগিয়ে দেওয়ার আগ্রহ বেশি দেখান। কারণ একটি হাঁটুর দাম কমপক্ষে ৮০ হাজার টাকা। আবার কিছু চিকিৎসক মেরামত করায় রাজি হলেও হাঁটুর লিগামেন্ট লাগানোর জন্য রোগীকে দিয়ে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় একটি মেশিন কেনান এবং এর মূল্য থেকে ভাগ নেন। এই মেশিন ছাড়া নাকি লিগামেন্ট জোড়া লাগানো সম্ভব নয়। অথচ একসময় এটি ছাড়াই এই অপারেশন হতো। একইরকম বাণিজ্য চলছে মেরুদ- ও হাতপায়ে স্ক্রু, রড, প্লেট পরিয়ে। অন্ধকারে রেখে আরেকটি চিকিৎসা বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে হার্টের রিং, পেসমেকার, ভাল্ব ও অক্সিজেনেটরে।। এসব মেডিকেল ডিভাইসের প্রকৃত দাম কত এবং আদৌ এগুলো সংযোজনের প্রয়োজন আছে কিনাÑ তা যাচাই করার ক্ষমতা ও সুযোগ নেই হৃদরোগী ও তাদের স্বজনদের। আর এ সুযোগে বেশি মূল্য আদায় করে কোনো কোনো ডাক্তার ভাগ নিচ্ছেন কোম্পানির কাছ থেকে। তাতে রাতারাতি মালিক হচ্ছেন গাড়ি-বাড়ি ও অঢেল সম্পদের। সরকার এই বাণিজ্য ঠেকাতে রিংয়ের দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার পর বাণিজ্যের নতুন কৌশল বের করেছেন এই অর্থলোভীরা। এখন রিং পরানোর জন্য ব্যবহার করা তারে অতিরিক্ত লাভ করছেন। অর্থাৎ ৫ হাজার টাকার একটি তারের দাম নেওয়া হচ্ছে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা, কখনো আরও বেশি। অর্থাৎ পুরনো বোতলে নতুন মদ। চিকিৎসক ও অসাধু কোম্পানির বাণিজ্যে রোগীরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে গরিব ও মধ্যবিত্ত রোগীরা ভিটেমাটি বিক্রি করে নিঃস্ব। অনেক রোগী বাড়তি মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে ধার-কর্জ করছে। কেউ কেউ দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিচ্ছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন চিকিৎসকরা আদর্শবান হলে রোগীদের এতটাকা বাড়তি খরচ হতো না। সর্বস্বও হারাতে হতো না। এই বাণিজ্য অমানবিক ও নির্মম। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কৃত্রিম হিপ, হাঁটু, রিং, পেসমেকার এবং অন্যান্য মেডিকেল ডিভাইস লাগানোর জন্য চিকিৎসকের অতিউৎসাহ। অনেক সময় অপ্রয়োজনেও লাগানো হচ্ছে। কখনো নিম্নমানের ডিভাইসের সংযোজন, কখনো সঠিকভাবে অপারেশন না হওয়ায় রোগীর জীবনহানি হচ্ছে। অপারেশনের কিছুদিন যেতে না যেতেই পড়ছেন রোগ জটিলতায় এবং কেউ কেউ দীর্ঘদিন ভুগছেন রোগযন্ত্রণায়। আর চিকিৎসার বাড়তি ব্যয় বহন করতে গিয়ে পথে বসছে রোগীরা। জানা গেছে মেডিকেল ডিভাইসের যত দাম তত চিকিৎসা-বাণিজ্য। খবর রয়েছে একটি মেডিকেল ডিভাইসের দাম থেকে অন্তত ৩০ শতাংশ ভাগ পান চিকিৎসকরা। অনেক চিকিৎসক নগদ অর্থের ভাগ ছাড়াও বিদেশ ভ্রমণের খরচ এবং নানা উপঢৌকন সুবিধা নিচ্ছেন কোম্পানির কাছ থেকে। সবথেকে বেশি বাণিজ্য পেসমেকারে। একটি পেসমেকারের দাম ৬৫ হাজার থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত। চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) রেজিস্ট্রার ডা. জাহিদুল হক বসুনিয়া আমার সংবাদকে বলেন, বিষয়টি তিনি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত