শিরোনাম

বিএনপিতে আ.লীগের অনুগত ব্যক্তিদেরও মনোনয়নপত্র!

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম  |  ০০:৩২, জুন ২১, ২০১৮

টাকার বিনিময়ে বিএনপির শীর্ষ নেতারা আওয়ামী লীগের অনুগত ব্যক্তিদেরও মনোনয়নপত্র দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গতকাল নয়াপল্টনে রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক সংগ্রহের পর এ অভিযোগ উঠে। বরিশালের মেয়র আহসান হাবীব কামালের পক্ষে দলের কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক এবিএম মোশাররফ হোসেন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানান বরিশালের বেশকিছু নেতা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিএনপির তিন নেতা কামালকেই মনোনয়ন দিতে চান। এদিকে নানান অভিযোগে দীর্ঘ দুই বছর ধরে বিএনপির কোনো কমিটিতে স্থান নেই কামালের। বেশ কয়েকবার বরিশাল নগরীতে কামালকে বিএনপিতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে মিছিল-সমাবেশও হয়েছে। গতকাল সকালে পল্টনে বিএনপি নেতা তাইফুল ইসলাম টিপু দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর হাত থেকে কামালের পক্ষে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের জন্য আরেক বিএনপি নেতা এবিএম মোশাররফ হোসেনকে অনুরোধ করলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানান বরিশাল থেকে আসা বিএনপি নেতা মাসুম হাসান। তিনি বলেন, ‘মোশাররফ ভাই আপনি কামালের পক্ষ হয়ে মনোনয়নপত্র নিতে পারেন না। আপনি জানেন না কামাল এখন আর বিএনপি করে না। সে এখন আওয়ামী লীগ করে। সে বিএনপির কে? কেন আপনি তার পক্ষে মনোনয়নপত্র নিবেন? তাৎক্ষণিক তারা মঞ্চ থেকে উঠে এসে হাসানকে মাথায় হাত বুলিয়ে বুঝাতে বুঝাতে বারান্দায় নিয়ে যান। এ সময় তারা মাসুমকে বুঝাতে থাকে অভিযোগগুলো সত্য হলে কামালের মনোনয়নপত্র বাতিল হবে। বারান্দায় উঁকি দিয়ে পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করলে কোনো সাংবাদিককেও বারান্দায় যেতে দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে হাসান আমার সংবাদকে বলেন, দেখেন এর আগেও সে এক নেতাকে ২৫ লাখ টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে পদ নিতে চেয়েছিলো। এখন আরও দুই নেতাকে হাতে রেখেছেন ফের মেয়র হওয়ার জন্য। উল্লেখ্য, বিএনপির এই শীর্ষ নেতাদের নাম আমার সংবাদের হাউজ পলিসির কারণে প্রকাশ থেকে বিরত থেকেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগের সাথে যোগসূত্র, দুর্নীতি ও নানান অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গত কাউন্সিলে কামালকে বিএনপির সকল পদ থেকে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া অব্যাহতি দেন। এরপর গত দুবছর বিএনপির কোনো পদে নেই তিনি। এছাড়া বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে মেয়র হলেও দলের কোনো কর্মসূচিতে দীর্ঘ ৫ বছর দেখা মেলেনি কামালের। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় কাজের অজুহাত দিয়ে নিজেকে বিএনপি থেকে বিরত রাখলেও আওয়ামী লীগের সকল কর্মসূচিতে সরব ছিলেন কামাল। নিজেকে আওয়ামী লীগের অনুগত হিসেবেও পরিচয় দেন বেশ কয়েক বছর থেকে। এছাড়াও দলের এক শীর্ষ নেতাকে পদ পেতে ২৫ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে কামালের বিরুদ্ধে। শীর্ষ জাতীয় দৈনিকে এ সংবাদ তখন প্রচার হয়েছিলো। খালেদা জিয়া ও স্থায়ী কমিটির শীর্ষ নেতাদের কাছেও এ তথ্য আছে বলে জানায় স্থানীয় সূত্র। এখন পল্টনের আরও দুই নেতাকে হাতে রেখে ফের বিএনপির পক্ষ থেকে মনোনয়ন পেতে মরিয়া অভিযুক্ত এই ব্যক্তি। সূত্র মতে, এবার পল্টনের নেতাদের কোটি টাকায় ম্যানেজের চেষ্টা চলছে কামালের পক্ষ থেকে। এদিকে কামালের বিরুদ্ধে একশ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযোগ অনুসন্ধানেরও অনুমতি দিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে বরিশাল নগরীর সড়ক মেরামতে অনিয়ম-দুর্নীতির আরও একটি অভিযোগ রয়েছে। দুদক সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের অক্টোবরে ২৬টি দরপত্র আহ্বান করে একশ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হাতে নেয় বিসিসি। এর মধ্যে সিংহভাগ কাজ ছিল নগরীর ড্রেন ও রাস্তা নির্মাণে। বিসিসি কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা পরস্পর যোগসাজশে ড্রেন, রাস্তা নির্মাণে নিম্নমানের রড, সিমেন্ট, ইট, বালু ব্যবহার ও পরিমাণে কম দিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। গত বছর ওইসব টেন্ডারে উন্নয়ন কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে দেড় কোটি টাকায় প্রাডো জিপই কামালের এখন বাহন! সিটি কর্পোরেশনের প্রতিটি উন্নয়ন কাজে মেয়রের ১২ ভাগ হারে কমিশন আদায় নগর ভবনে ‘ওপেন সিক্রেট’। মন্ত্রণালয়ে পার্সেন্টেজ দিয়ে বরাদ্দ আনতে হয় দাবি করে সবার কাছ থেকে ১২ ভাগ হারে কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তাছাড়া তিনি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ছেলে কামরুল আহসান রূপন সিটি কর্পোরেশনের সব কিছুতেই হস্তক্ষেপ করেন এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। টেন্ডার ভাগবাটোয়ারা, পছন্দের ঠিকাদারদের বিল ছাড়, সিটি কর্পোরেশনে অভ্যন্তরীণ বদলি-পদোন্নতি সবকিছু হয় রূপনের ইশারায়। এ কারণে রূপন ‘ছায়া মেয়র’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন বরিশালে।তাছাড়া বরিশালে কামালকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে বহুবার বিক্ষোভ মিছিলও হয়েছে। উজিরপুর উপজেলা বিএনপির কার্যালয়ে হুমায়ুন খান, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মন্নান মাস্টার, সাংগঠনিক সম্পাদক সরদার সিদ্দিকুর রহমান, যুগ্ম সম্পাদক সহিদুল ইসলাম এ বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এ নিয়ে বরিশাল মহানগরীর বিএনপির সভাপতি মজিবুর রহমানের সাথে কথা বললে তিনি আমার সংবাদকে বলেন, অবৈধ কাউকে দলের পক্ষ থেকে মনোনয়নপত্র দেওয়া উচিত নয়, বরং তাকে সরাসরি বহিষ্কার করা উচিত ছিলো। কামালকে মনোনয়ন দিলে বরিশাল বিএনপি তার পক্ষ হয়ে কাজ করবে কিনা এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এর উত্তর দিতে নারাজ! কেন্দ্রই এর সিদ্বান্ত নেবেন বলে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।এছাড়া গতকাল বুধবার দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর কাছ থেকে ১১ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, রাজশাহীর মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের পক্ষে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। এছাড়া সিলেটে আরিফুল হক চৌধুরী ছাড়াও মহানগর সভাপতি নাসিম হোসাইন, সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম, সহ-সভাপতি প্যানেল মেয়র রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও মহানগর নেতা ছালাহউদ্দিন রিমন।বরিশালের মেয়র পদের জন্য আহসান হাবীব কামাল ছাড়াও দক্ষিণ জেলা সভাপতি এবায়দুল হক চাঁন, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন, ছাত্রদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আফরোজা খানম নাসরিন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মোহাম্মদ রহমাতুল্লাহও মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। উল্লেখ্য আগামী ৩০ জুলাই রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।আজ রাতেই গুলশান কার্যালয়ে প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র সংগ্রহের পর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘সিটি নির্বাচনকে নিয়ে সরকার কী করছে সেটা গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন দেখার পর আমরা সিলেট, রাজশাহী ও বরিশালের নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবো। তবে প্রাথমিক প্রক্রিয়া হিসেবে আমরা মনোনয়নপত্র বিক্রি, জমাদান ও সাক্ষাৎকারের কাজগুলো সম্পন্ন করে রাখবো।’ তিনি জানান, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় প্রার্থীরা জামানত হিসেবে ২৫ হাজার টাকা প্রদান করবে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত