শিরোনাম

থামেনি জঙ্গি সংগঠনগুলোর সরকারবিরোধী তৎপরতা

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল লতিফ রানা  |  ০০:৩০, জুন ২১, ২০১৮

আবারো জঙ্গিরা দেশে অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে অপতৎপরতার চেষ্টা করছে। সাবেক জেএমবির সদস্যসহ জঙ্গিরা কারাগার থেকে জামিনে এসে পুরনো সঙ্গীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। আর জেএমবি থেকে নব্য জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলাভাই, জইশ-ই মোহাম্মদ, আল্লার দল, হিযবুল মুজাহিদিন, কালেমা-ই-জামাত, আনছারুল্লাহ বাংলা টিম ও হিযবুল মাহাদী, ইসলামী সমাজ, দাওয়াতে ইসলাম, ওলামা আঞ্জুমান আল বাইয়্যিনাত, ইসলাম ও মুসলিম, হেফাজতে ইসলামী বাংলাদেশ, আল হারাত আল ইসলামিয়া, জামায়াতুল ফালাইয়া, তাওহিদী জনতা, বিশ্ব ইসলামী ফ্রন্ট, জুম্মাতুল আল সাদাত, শাহাদাত-ই-নবুওয়াত, জামায়াত-ই-ইয়াহিয়া আল তুরাত, জইশে মোস্তফা বাংলাদেশ, আল-জিহাদ বাংলাদেশ, ওয়ারাত ইসলামিক ফ্রন্ট, জামায়াত-আল-সাদাত, আল খিদমত, হরকত-এ ইসলাম আল জিহাদ, মুসলিম মিল্লাত শারিয়া কাউন্সিল, ওয়ার্ল্ড ইসলামিক ফ্রন্ট ফর জিহাদ, জইশে মোহাম্মদ, আল ইসলাম মার্টায়ারস ব্রিগেড, লস্কর-ই-তৈয়্যবা, হিযবুল্লাহ ইসলামী সমাজ, হরকাতুল মুজাহিদীন, নুসরাতুল মুসলেমিন, ইসলামী জিহাদ আন্দোলন বাংলাদেশ’সহ বিভিন্ন নামে রাজধানীসহ দেশের আইন-শৃঙ্খলা অবনতি, জঙ্গি তৎপরতামূলক কর্মকা- বিভিন্ন সময়ে চালিয়েছিল। আর এসব সংগঠনের অনেকগুলোকে সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। অনেকগুলোর কার্যকলাপের ওপর কড়া নজরদারি করা হয়। এরপর আন্তর্জাতিক এক জঙ্গি সংগঠনের নাম ব্যবহার করে সারাদেশেই পুনরায় নাশকতা ও মানুষ হত্যা চালানো শুরু করে। এরপর র‌্যাবের সাঁড়াশি অভিযানে জঙ্গিদের জঙ্গি তৎপরতা বন্ধ হয়ে যায়। গত ২০১৬ সালে জঙ্গিবিরোধী ১৮টি অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে চার শিশু ও পাঁচ নারীসহ ৩৮ জঙ্গি নিহত হয়। গ্রেপ্তার হয় দুই শতাধিক জঙ্গি। আর গত ২০১৭ সালের মার্চেই ৬টি বড় ধরনের জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তার মধ্যে সিলেটে ৩টি, চট্টগ্রামে ২টি ও কুমিল্লায় একটি। এই ছয়টি অভিযানেই নিহত হয় ১৮ জঙ্গি।এদিকে জঙ্গিরা একের পর এক গ্রেপ্তার হলেও পুলিশের তালিকাভুক্ত অন্যতম চারজনকে দীর্ঘদিনেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার করতে পারেনি। ফলে তাদের গ্রেপ্তারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দেশের সকল নাগরিকের সহায়তা প্রয়োজন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। গত জুন ১৫ চারজন জঙ্গি সদস্যের ছবিসহ ডিএমপির মিডিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে প্রদর্শিত ছবির ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে সহায়তা প্রয়োজন। তারা বিভিন্ন সময় ব্লগার এবং অনলাইন এক্টিভিস্ট হত্যার সাথে জড়িত। ব্লগার হত্যাকা-সংক্রান্তে সিটিটিসির তদন্তে উল্লিখিত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তারা বিভিন্ন ব্লগার হত্যাকান্ডের সাথে সরাসরি জড়িত এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের সদস্য। আসামিরা বর্তমানে পলাতক রয়েছে। হত্যামামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের জন্য ছবিতে প্রদর্শিত ব্যক্তিদের সন্ধান জানা একান্ত প্রয়োজন। যদি কেউ উক্ত ব্যক্তিদের সন্ধান জেনে থাকেন তাহলে- ০১৭৬৯৬৯১৪২৬ এই নম্বরে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করা যাচ্ছে অথবা সরাসরি তথ্য দেয়া যাবে (হেলো সিটি) মোবাইল অ্যাপ-এর মাধ্যমে। সংবাদদাতার পরিচয় গোপন রাখা হবে বলে বলা হয়েছে।অপরদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলায় অভিযান চালিয়ে জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর ৩ সক্রিয় সদ্যকে আটক করেছে র‌্যাব। গত মঙ্গলবার ভোরে র‌্যাব-৫-এর একটি দল তাদের আটক করে। আটককৃতরা হলেন জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার চাকলা মিয়াপাড়ার মৃত আব্দুল গফুরের ছেলে রহমত আলী (৪৭), পারএকলামপুর বিশ্বাসপাড়ার মফিজ উদ্দিনের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম (৪৩) ও চাকলা কামারটেকপাড়ার হযরত আলীর ছেলে মোয়াজ্জেম হোসেন (৩০)।র‌্যাব-৫ সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মঙ্গলবার ভোরে র‌্যাব-৫-এর একটি দল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার দুর্গাপুর পূর্বপাড়ায় অভিযান চালিয়ে জেএমবির সদস্য রহমত আলীকে আটক করে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে দুই সহযোগী জেএমবি সদস্য জাহাঙ্গীর আলম ও মোয়াজ্জেম হোসেনকে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে কয়েকটি জিহাদী বই, পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়।তাছাড়া গত ১৩ মার্চ নাটোরের দিঘাপতিয়ার একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে জঙ্গি সন্দেহে চারজনকে আটক করেছে পুলিশ। আটককৃতদের দখল থেকে ৫টি ককটেল, ল্যাপটপ, তিনটি ছোরা ও জিহাদি বই উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর পুলিশ সুপার বিপ্লব বিজয় তালুকদার স্থানীয় সাংবাদিকদের জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে দিঘাপতিয়া উত্তরা গণভবনের পেছনের এলাকায় দুইটি বাড়িতে সন্দেহজনক কিছু অপরিচিত লোকের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়। পরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ বাড়ি দুটি ঘিরে রাখে। রাতের অন্ধকারে বাড়িতে অভিযান না চালিয়ে দিনের আলো ফুটে ওঠার অপেক্ষায় থাকে পুলিশ। পুলিশের আহ্বানের প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার সকালে ইকবালের বাড়ি থেকে চারজন আত্মসমর্পণ করেন। পরে বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ৫টি ককটেল, ল্যাপটপ, মোটরসাইকেল, তিনটি ছোরা ও বেশকিছু জিহাদি বই উদ্ধার করা হয়। তাছাড়া চলতি বছরের প্রথমদিকে সীমান্তবর্তী লালমনিরহাটে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহেদিন বাংলাদেশের (জেএমবি)’র আদলে ‘বিইএম’ নামে নতুন একটি জঙ্গি সংগঠনে জড়িত থাকার সন্দেহে ৪ মহিলাসহ ৫ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ঘটনার দিন শনিবার সন্ধ্যায় জেলা শহরের ৩২ হাজারী একটি ভাড়া থাকা বাসা থেকে লালমনিরহাট সদর থানা পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন কুষ্টিয়া জেলার নাহিদা পরভীন লাকি, ববি খাতুন, রাজশাহী জেলার শাহাজান পারভীন, দিনাজপুর জেলার আরফিনা আক্তার ও শরিফুল ইসলাম। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রকার সরকারবিরোধী ও জিহাদী বই উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে, গ্রেপ্তারকৃতরা জেএমবি বা বিইএমর সাথে জড়িত নয়। তারা হেযবুত তওহিদ’ নামে একটি ইসলামী সংগঠনের সদস্য। তারা সবাই বহিরাগত, সংগঠনিক কাজ করতে এ এলাকায় এসেছে। ‘দেশের পত্র’ নামে তাদের একটি পত্রিকা রয়েছে। তাদের কাছে পাওয়া কাগজপত্রে বড় হরফে ‘হেযবুত তওহিদ’ লেখা ছিল। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে স্থানীয় সাংবাদিকদের জানানো হয়েছিল, গ্রেপ্তারকৃতরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রথমে ধারণা হচ্ছে, তারা এ জেলায় বড় ধরনের কোনো সন্ত্রাসী পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিল। তাদের কাছে পাওয়া কাগজপত্রে বিভিন্ন বিষয়ে রীতিমতো সামরিক প্রশিক্ষণের কথা আছে। উল্লেখ্য, জঙ্গিগোষ্ঠী এদেশে প্রথম তাদের সাংগঠনিক শক্তির জানান দিয়েছিল ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট একসঙ্গে ৬৩ জেলায় সিরিজ বোমা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে। সেদিন তারা বিস্ফোরণ স্থলে কিছু লিফলেটও রেখে যায়। এর মাধ্যমে প্রথমে যে সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ ঘটে তার নাম জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। ঘটনা শুধু সিরিজ বোমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তারা বোমাহামলা চালায় আদালত অঙ্গন, সিনেমা হল, জনসভাস্থলসহ বিভিন্ন স্থানে। বোমাহামলায় নিহত হন একাধিক বিচারকও। এর আগেও উদীচীর অনুষ্ঠান ও সিপিবির সমাবেশে গ্রেনেডহামলায় ঘটে পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড। এরপর একে একে ঘটতে থাকে টার্গেট কিলিং। গ্রেনেডে প্রাণ দিতে হয় সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এমএস কিবরিয়াকে। আর অনেকগুলো ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ২১ আগস্ট গ্রেনেডহামলা। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়। এতে তিনি সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে রক্ষা পেলেও প্রাণ হারান আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন। আর আহতদের সংখ্যা অগণিত। এছাড়া নির্মমভাবে খুন হয়েছেন মুক্তমনা লেখক ও বিজ্ঞানমনষ্ক কয়েকজন ব্লগার।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত