শিরোনাম

এবছরও বাজেটে ঘাটতি দেখছেন বিশ্লেষকরা

প্রিন্ট সংস্করণ॥বেলাল হোসেন  |  ০০:৪৪, মে ২৪, ২০১৮

বাজেটে ঘাটতি পূরণে বড় অঙ্কের বিদেশি ঋণ সুবিধা যোগ করা হচ্ছে এবারো। কিন্তু তা বাস্তবায়ন বরাবরই ৩০ শতাংশের নিচে। প্রতিবারই বিদেশি ঋণ সুবিধা কাজে লাগাতে ভালো ফল করতে পারেনি বাংলাদেশ সরকার। এর ফলে বাজেট ঘাটতি যেন নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। দেশের ইতিহাসে ২০১৬ সালে বিদেশি মোট ঋণের সর্বোচ্চ ২৭ হাজার কোটি টাকা কাজে লাগাতে পেরেছে সরকার। সে বছর জাতীয় বাজেটে (২০১৬-২০১৭) বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৬ হাজার কোটি টাকা। এর ফলে আসছে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটেও ঘাটতি দেখছেন বিশ্লেষকগণ। বৈদেশি ঋণসুবিধা কাজে লাগাতে প্রতিবন্ধকতা বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন সূত্রে জানা যায়, সরকারি টাকা খরচের ব্যাপারে প্রকল্পের সঙ্গে জড়িতদের আগ্রহ বেশি। এখানে এতো বেশি নিয়ম-কানুন না মানলেও চলে, বড় কোনো শর্তও থাকে না। বিদেশি টাকা নেওয়ার বিষয়ে যখন এমওইউ চুক্তি সই হয়, তখন সেখানে বেশকিছু শর্ত উল্লেখ থাকে। ইচ্ছেমত বিদেশি টাকা এদিক-ওদিক করা যায় না। আর এসব শর্তের ব্যত্যয় হলে তারা ফান্ড রিলিজ করে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ডোনারদের (বৈদেশিক ঋণদাতা) টাকা খরচ করতে তাদের চুক্তিতে উল্লিখিত শর্তের শতভাগ মানতে বাধ্য করা হয়। আর এ শর্ত মানতে না পারলে তারা অর্থ ছাড় দেন না। এজন্যই এ টাকা খরচ হচ্ছে না। ফলে বাজেট ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। বাজেটে ঘাটতি মেটাতে বিদেশি সহযোগিতা যে পরিমাণ দেখানো হচ্ছে তা খরচ না হওয়ায় বাজেটে বড় অসামঞ্জস্য থাকছে প্রতিবছর। সূত্র জানায়, জিওভির টাকার ক্ষেত্রে এতো বেশি নিয়মকানুন না মানলেও চলে। ফলে সবার টেনডেনসি হচ্ছে বাজেটে আসা জিওভি অংশ আগে খরচ করা। এটা অনেক সহজ। এখান থেকে ফান্ড রিলিজ করতে পরিশ্রমও কম, নেই বললেই চলে। এখানে কঠিনভাবে নিয়ম মানাতে বাধ্য করার মতো কেউ নেই। এতো সহজে জিওভির টাকা পেলে বিদেশি ফান্ডের ইউটিলাইজ কেমনে হবে? অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখা সূত্রে জানা যায়, গেল ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে বাজেটে ঘাটতি মেটাতে ৭৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণের সহায়তার উল্লেখ ছিল। সেই বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালে ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক ঋণের সহায়তা আসে। যার পরিমাণ মাত্র ২৭ হাজার কোটি টাকা। যেসব কারণে বৈদেশিক ঋণ ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে না সেই কারণগুলোর সমাধান জরুরি। তা না করে শুধু শুধু প্রতিবছর বড় অঙ্কের বাজেট প্রদর্শন করায় ক্ষোভ প্রকাশও করেছেন অর্থনীতিবিদরা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখা জানায়, আসছে বাজেটে অর্থাৎ ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে বাজেটে ঘাটতি মেটাতে এডিপিতে ব্যবহারের জন্য মোট ৬০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণের সহায়তার উল্লেখ করা হয়েছে। বাজেট প্রস্তুতের সাথে জড়িত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, এবারও হয়তো এর সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ টাকা খরচ করা সম্ভব হবে না। কারণ এবছর নির্বাচনি বছর। নির্বাচনের জন্য তিন মাস ব্যস্ত থাকবে সবাই। ইলেকশনের তিন-চার মাস তো এডিবি বাস্তবায়নে তেমন মনোযোগ থাকবে না। তাই এবছরও বাজেটে অসঙ্গতি তৈরি করবে।বাজেট ঘাটতির ব্যাপারে সিপিবির সভাপতি মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম আমার সংবাদকে বলেন, এ বাজেটেও ধনী ব্যক্তিদের আরও ধনী করতেই সব ধরনের ব্যবস্থা থাকছে। আমরা দেশ স্বাধীন করেছিলাম সম্পদ পুনর্বণ্টন করে গরিবদের দেওয়ার জন্য। আমরা স্বাধীনতাকে পরিত্যাগ করেছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পরিত্যাগ করেছি। আমাদের উচিত বিদেশি সহজ সুদে ঋণ গ্রহণ করে তা কাজে লাগানো। এক্ষেত্রে বরাবরই সরকার ব্যর্থ হয়েছে। ঋণদাতা বিদেশি সংস্থার স্ট্যান্ডার্ড বাস্তবায়নে আমাদের সরকার ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বাজেটে যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ সুবিধা যোগ হচ্ছে বছর শেষে তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে আভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ওপর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু শুধু মাথাপিছু আয় এক লাখ চল্লিশ হাজার টাকা হলে হবে না। প্রত্যেকটি মানুষের ঘরে ঘরে এক লাখ চল্লিশ হাজার টাকা পৌঁছে দিতে হবে। একজন গার্মেন্টকর্মী বছরে পায় ৬০ হাজার টাকা। তার বাকি ৮০ হাজার টাকা কই যায়? এজন্য বাজেট আসলে বড় লোক ও বিত্তবানদের সিন্ডিকেট। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ সিপিডির ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, বাজেটের আয় ব্যয়ের যে পার্থক্য হয় সেটা পূরণ করা হয় বৈদেশিক ঋণ দিয়ে। আমরা বলেছি এটা বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অভ্যন্তরীণ ঋণের দায়ভার কমাতে বাইরের ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু আমরা দেখছি পাইপলাইনে অনেক প্রকল্পের কাজ জমে যাচ্ছে। বিদেশি সাহায্যভুক্ত প্রজেক্ট বাস্তবায়নের হার কম। যেহেতু বাইরের ঋণ পরিসেবার রেকর্ড ভালো এজন্য অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর চাপ কমানো উচিত। তিনি বলেন, ব্যয় এবং আয়ের একটা ঘাটতি আছে। এ ঘাটতি হয় অভ্যন্তরীণ থেকে করতে হবে নয়তো বৈদেশিক ঋণ সুবিধা থেকে করতে হবে। যখন আমরা প্রতিবছর উল্লিখিত বৈদেশিক ঋণ থেকে মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছি তখন চাপটা পড়ছে অভ্যন্তরীণের ওপর। এতে ঋণের দায়ভার অনেক বেশি। আমরা বলেছি বৈদেশিক ঋণের বাস্তবায়নের হার অনেক কম। এটা কীভাবে শক্তিশালী করা যায় সেই পদক্ষেপ নিন। বিদেশি ডোনারদের অর্থছাড়ে আমাদের যে দুর্বলতাগুলো আছে সেই জায়গায় নজর বাড়াতে হবে। বিশ্লেষকদের দাবি এ বৈদেশিক ঋণ সুবিধা চুক্তির পরও তা বাস্তবায়নে যেসব প্রতিবন্ধকতা আছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, এসব প্রজেক্ট বাস্তায়নে জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব হওয়া। উপাদানাদি সংগ্রহেও অনেক সময় লেগে যায়। এছাড়াও বিদেশিরা প্রতিটি প্রকল্পে ধাপে ধাপে টাকা দেন। প্রথম ধাপের টাকা যথাযথ ইউটিলাইজ হয়েছে কিনা তা দেখার পর আরেক ধাপের টাকা ছাড় দেন। অনেক সময় শর্ত মানতে ঠিকাদারদের গরিমসির কারণেও ডোনাররা অনুৎসাহিত হয়। সরকারের ইচ্ছেমত ঘনঘন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনও বৈদেশিক ঋণ সুবিধা বাস্তবায়নে বড় প্রতিবন্ধকতা।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত