শিরোনাম

এবার মাদকের আস্তানায় হানা

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল লতিফ রানা  |  ০০:৩০, মে ২৪, ২০১৮

সারাদেশে একযোগে মাদকের বিরুদ্ধে র‌্যাব পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চালানো হচ্ছে। আর যেসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। সেসব এলাকায় নিহতদের চেয়েও বড় বড় মাদক ব্যবসায়ী-গডফাদার রয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, এসব গডফাদাররা এখনো প্রকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এই মাদকবিরোধী অভিযান কোনো কাজে আসবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় মাদক ব্যবসায়ীরা গুলি ছুড়লে আত্মরক্ষার্থে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী শুধু পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ‘নিরাপত্তা বাহিনী কোনো অবস্থাতেই মাদক ব্যবসায়ীদের গুলি করে না। যখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে কেবল তখনই আত্মরক্ষার্থে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এ অবস্থায় অনেকক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনীকেও গুলি করতে হয়। এতে কিছু অপরাধী নিহত হলেও পুলিশও কিন্তু রক্ষা পায় না। প্রতিপক্ষের গুলিতে পুলিশ-র‌্যাব সদস্যরাও আহত হন।’ গতকাল বুধবার (২৩ মে) দুপুরে খুলনায় র‌্যাব-৬ এর কার্যালয়ে আয়োজিত ৫৭ দস্যুর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেছেন। আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল আরও বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে এ তালিকা করা হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী বড় বড় মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তাদের ধরে বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে।’ দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীদের ধরিয়ে দিন। এরা সমাজকে মেধাশূন্য করতে তৎপর। মেধাহীন যুবসমাজ দেশের উন্নয়নে কোনো কাজে আসবে না। তাই আপনার সন্তনের প্রতি দৃষ্টি রাখুন। পরিবারের প্রতিটি সদস্যের ওপর নজর রাখুন। এতে মাদক-সন্ত্রাসমুক্ত করার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর ভিশন বাস্তবায়ন করা সহজ হবে।’ অপরদিকে গতকাল বুধবার চট্টগ্রামের মাদক সাম্রাজ্য হিসেবে পরিচিত বরিশাল কলোনিতে অভিযান চালিয়ে অন্তত শতাধিক মাদক আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়েছে পুলিশ। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল পুলিশ এ অভিযান চালানো হয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, রেলওয়ের জায়গায় গড়ে ওঠা এ বস্তিতে বসবাসের আড়ালে আবডালে চলে মাদক বেচা-কেনা। এর আগেও বস্তিটি উচ্ছেদ করা হলেও বন্ধ হয়নি মাদক ব্যবসা। গত শুক্রবার রাতে এই কলোনিতে র‌্যারের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ এক মাদক ব্যবসায়ী নিহত হন। এরপর অন্য একটি দল মাদক নিয়ন্ত্রণে নেয়ার অংশ হিসেবে মাদকের আস্তানাটি গুঁড়িয়ে দেয় পুলিশ। দক্ষিণ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনের (সিএমপি) উপ-কমিশনার মোস্তাইন হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, যেখানে অপারেশন করেছি, সেখানে শুধু মাদক ব্যবসার জন্য লোকজন অবস্থান করত। তবে গত কয়েক দিনের অভিযানের ফলে বস্তির মাদক ব্যবসায়ীরা পালিয়ে গেছে। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে রেলওয়ের পারমিটেড ঘর ছাড়া বস্তিতে যে অবৈধ স্থাপনাগুলো ছিল আর যেখানে মাদকের আখড়া হিসেবে পরিচিত সেগুলো উচ্ছেদ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। গত ১৭ মে বৃহস্পতিবার রাতে র‌্যাবের একটি টিম বরিশাল কলোনীতে মাদক উদ্ধারের প্রস্তুতি চালালে মাদক ব্যবসায়ীরা টের পেয়ে র‌্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এসময় র‌্যাবের পাল্টা গুলিতে বন্দুকযুদ্ধে দুই শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়। ঘটনার দিন র‌্যাব ৭-এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) মিমতানুর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘সদরঘাট থানার অধীন আইস ফ্যাক্টরি রোডের কলোনিটিতে অভিযানে যান র‌্যাবের কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আশেকুর রহমান। এসময় বন্দুকযুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান প্রকাশ মোটা হাবিব (৪২) ও মো. মোশাররফ (২২) সহ দুইজন নিহত হয়। নিহতদের মধ্যে মোটা হাবিবের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় ১২টির বেশি মাদক মামলা ছিল। বন্দুকযুদ্ধ শেষে ঘটনাস্থল তল্লাশি করে ৩০ হাজার ৪০০ পিস ইয়াবা, ৪০ বোতল ফেনসিডিল, ৬ বোতল বিদেশি মদ, ৫ ক্যান বিদেশি বিয়ার, ৫০০ গ্রাম গাঁজা, ১টি ৭.৬৫ মি. মি. বিদেশি পিস্তল, ২টি ওয়ান শুটারগান, ১টি ম্যাগাজিন, ৮ রাউন্ড গুলি/কার্তুজ ৪ রাউন্ড খালি খোসা ও মাদক বিক্রির নগদ ১৭ হাজার ৩০০ টাকা উদ্ধার করে র‌্যাব।অপরদিকে ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার মেইন বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন নতুন বাজারের বিরিক ফিল্ডে মাদকের আখড়া উচ্ছেদ করা হয়েছে। গতকাল বুধবার সকাল ১১টার দিকে পৌর প্যানেল মেয়র আশরাফুল আলম আশরাফের নেতৃত্বে এ উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। আলাদি নামের এক মাদক ব্যবসায়ীর ছিল ঘরটি। তিনি বিভিন্ন ধরনের মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের এই ঘরটি ভাড়া দিতেন। কালীগঞ্জ পৌরসভার প্যানেল মেয়র আশরাফুল আলম আশরাফ স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনানুয়ায়ী কালীগঞ্জ শহরকে মাদকমুক্ত করতে পৌরসভার পক্ষ থেকে অভিযান চালানো হচ্ছে। এর অংশ হিসাবে গতকাল নতুন বাজার এলাকায় একটি মাদকের আখড়া ভেঙে দেওয়া হয়। অভিজ্ঞমহল মনে করছেন, মাদক চোরাচালানি এবং মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যে অভিযান শুরু হয়েছে তা হঠাৎ করেই হয়নি। এর পেছনে রয়েছে মাদক সমস্যার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করার জন্য ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অভিপ্রায়। এই অভিযানের পটভূমি ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম বিবিসির এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, এবছর অন্তত তিনটি বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়ার কথা বলেছিলেন। তার ধারাবাহিকতাতেই এই মাদকবিরোধী অভিযান চলছে। মাদকের সামাজিক ঝুঁকি বর্ণনা করে এইচ. টি. ইমাম বলেছেন, মাদকপাচারের সাথে মানবপাচার এবং বেআইনি অস্ত্রের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। প্রথমে আসে মানবপাচার, মানবপাচারের হাত ধরে আসে মাদকপাচার, এবং এই দুটিকে রক্ষা করার জন্য বেআইনি অস্ত্র আসে বলে তিনি উল্লেখ করেন।এই অভিযানের সাফল্য বর্ণনা করে এইচটি ইমাম বলেছেন, অভিযান শুরু হওয়ার পর প্রথম ১৮ দিনে ২২০০ ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। পাশাপাশি মোবাইল কোর্ট এবং বিচারিক আদালতে ৬০০ জন মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে মোট ৪৮৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। আর অভিযানের প্রথম ১৮ দিনে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছে ১৬ জন। তবে বেসরকারিভাবে মাদক ব্যবসায়ী সন্দেহে এ পর্যন্ত ৩৮ জনের নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তিনি আরও বলেছেন, আওয়ামী লীগের মেয়াদ এখনই শেষ হয়ে যায়নি। মাদক সমস্যা একটি রোগের মতো। রোগ যখন চরম আকার ধারণ করে তখন সবার টনক নড়ে। তাই একে এর বেশি বাড়তে দেয়া যায় না। মাদকবিরোধী অভিযানে সাফল্য না এলে আগামী নির্বাচনে ওপর তার মারাত্মক ও প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, আসামি নিহত হওয়ার প্রতিটি ঘটনার পর পরই মামলা দায়ের করা হয়। এর ওপর তদন্ত চলে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জবাবদিহি করতে যে ম্যাজিস্ট্রেট আদেশ দিয়েছেন তাকেও রিপোর্ট পাঠাতে হয়। পোস্ট মর্টেম হয়। কাউকে যদি অন্যায়ভাবে গুলি করা হয়, তাহলে তার আত্মীয়স্বজন সুবিচারের জন্য আইনের আশ্রয় চাইতে পারেন। কিন্তু মাদক চোরাচালানি বা ব্যবসায়ী হোক, কিংবা মাদক ব্যবহারকারীই হোক, সংবিধানে সব নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। জানা গেছে, মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান অভিযানে গত ‘১৪ মে থেকে ২২ মে পর্যন্ত মোট ৩৮ জন নিহত হয়েছে। তবে র‌্যাবের দাবি, তাদের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ১৭ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছে তারা সবাই শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। স্থানীয়ভাবে করা সব মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকায় তাদের নাম রয়েছে। যেসব এলাকায় বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে, সেসব এলাকার অধিকাংশ জনপ্রতিনিধি দাবি করেছেন, যারা নিহত হয়েছেন, তাদের বাইরেও আরও ‘গডফাদার’ আছে। তাদেরও আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। আর যেসব জেলায় বন্দুকযুদ্ধে নিহতের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো হলো চুয়াডাঙ্গা, নীলফামারী, দিনাজপুর, নেত্রকোনা, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, যশোর, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরা, কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জ। আর গত সোমবার দিবাগত রাতে সৈয়দপুরের গোলাহাট বধ্যভূমি এলাকায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুই ব্যক্তি নিহত হন। তারা হলেন শহরের নিচু কলোনি এলাকার জনি (৩৪) ও ইসলামবাগ এলাকার শাহিন (৩২)। তারা সৈয়দপুর পৌরসভার বাসিন্দা। এই দুজন এলাকায় মাদক ব্যবসা করলেও তারা ওই এলাকার মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রক নয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তারা সাংবাদিকদের আরও বলেছেন, ‘এরা মাদকসেবী। এলাকায় ব্যবসাও করে। তবে তাদের গডফাদার রয়েছে। তারা ধরা পড়ছে না। যারা জাতিকে ধ্বংস করছে সেইসব গডফাদারদেরও গ্রেপ্তার করা উচিত। আইনের আওতায় নিয়ে আসা উচিত। নিহত দুজন কোনো দল করতো না। তবে তারা অনেক ক্ষমতাশীল ছিল।’একই দিন নেত্রকোনা সদর উপজেলার মেদনী ইউনিয়নের বড়োয়ারী এলাকায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আমজাদ হোসেন নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। মেদনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘আমজাদ হোসেন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। সে এলাকায় মাদক ব্যবসার পাশাপাশি আরও বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত ছিল। আমজাদ ছাড়া এলাকায় আরও অনেক মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে। যাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। অভিযানের পর তাদের তৎপরতা কমলেও তারা ভবিষ্যতে আবার তৎপর হয়ে উঠবে।’ এছাড়া গত সোমবার দিবাগত রাতে এভাবে ৯ জেলায় ১১ জন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল সচিবালয় সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘মাদকের কোনো চুনোপুঁটি ধরা হচ্ছে না। সবাই মাদকের শীর্ষ ব্যবসায়ী। তথ্য প্রমাণ নিয়েই তাদের নক করা হচ্ছে।’ যশোরে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে এবং ‘নিজেদের মধ্যে গোলাগুলিতে’ সাতজন মারা গেছেন। পুলিশ ও র‌্যাবের দাবি, তারা সবাই মাদক ব্যবসায়ী। তবে স্থানীয় সূত্রের দাবি, ‘বন্দুকযুদ্ধে’ যারা নিহত হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই ছিঁচকে মাদক ব্যবসায়ী। অভয়নগর থানার ওসি শেখ গণি মিয়া সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘নিহত তিনজনই মাদক ব্যবসায়ী। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে থানায় দুই থেকে চারটি করে মামলা রয়েছে।’ একই দিন পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ প্রবল হোসেন (৩৫) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। পুলিশ বলছে, প্রবল হোসেন মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায়ী ছিলেন।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত