শিরোনাম
আমার সংবাদকে বিএসএমএমইউ’র প্রফেসর দেবব্রত বণিক

আইসিইউ ব্যবসা করার জায়গা নয়

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ০১:০৩, মে ১৬, ২০১৮

প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থায় ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) আতঙ্কের নাম। অভিযোগ আছে জন-মানুষের সেন্টিমেন্টকে পুঁজি করে এই সেবা বর্তমান সময়ে অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ। সঠিক দিক-নির্দেশনা, সচেতনতা ও যথাযথ আইন না থাকায় হয়রানির স্বীকার হচ্ছে রোগী আর নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার। আইসিইউ ব্যবসা করার জায়গা নয়, এটি হলো সেবার নাম। এই জায়গাটি হলো সেবানির্ভর। যত বেশি সেবা রোগীরা পাবে, এখান থেকে বাঁচার সম্ভাবনা তত বেশি। সম্প্রতি আমার সংবাদ প্রতিনিধি গিয়াস উদ্দিন মুখোমুখি হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিইউ বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর দেবব্রত বণিক। তার সঙ্গে আলাপের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো-

আমার সংবাদ : আইসিইউ কেন প্রয়োজন?
বণিক : আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার একটি ব্যয়বহুল পদ্ধতির নাম হলো আইসিইউ। এর মাধ্যমে যেকোনো মুমূর্ষু রোগীকে কৃত্তিমভাবে সেবা দিয়ে থাকে। এটি তারাই পাওয়ার যোগ্য, যার ভালো হওয়ার সম্ভাবনা আছে। পুরো না হলেও মোটামুটি একটি জীবন লিড করতে পারবে। তাদেরকেই এই সেবা দেওয়া উচিত। অনেকদিন যাবত ক্যান্সার বা স্ট্রোক করার পর বছরের পর বছর বেঁচে আছে, অথবা বাঁচার তেমন সম্ভাবনা নেই, তাদের জন্য এই সেবা নয়। যার কাজের ক্ষমতা নেই বা বয়সের ভারে তার অনেক অর্গান কাজ করছে না, তাদের আনা উচিত নয়। এই চিকিৎসার জন্য আসবে যাদের একটি অর্গান সাপোর্ট দিলে অন্যগুলো কাজ করা শুরু করবে, তারাই এই চিকিৎসার যোগ্য। কারণ এগুলো সবই কৃত্তিমভাবে করে থাকে। এর পেছনে যারা (ডাক্তার বা নার্স) থাকে তারাও খুবই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে হবে। এটি হতে হবে দুটি দিক থেকে একটি হলো কাজ, অন্যটি হলো জ্ঞান। এতে করে যারা চিকিৎসা নিতে আসবে তারা যেন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এই চিকিৎসার বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যারা নিতে পারবে তাদেরই এই পেশায় আসা উচিত। আইসিইউতে রোগী ভর্তি হলে বেঁচে যাবে বিষয়টি সেখানে না। পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা নেই, অনেক বয়স্ক, অনেকদিন যাবত বিছানায় পড়া, কাজের ক্ষমতাও নেই, এমন রোগী আইসিইউতে না আনাই ভালো। কারণ যার আর্থিক সক্ষমতা নেই, পরিবার অনেক ধার-দেনা করে চিকিৎসা করলো অথচ পরে মারাও গেলো, এতে করে পরিবার পথে বসে যায়।

আমার সংবাদ : আইসিইউ নিয়ে যে ভুল ধারণা?
বণিক : মানুষ মনে করে আইসিইউতে রাখলেই বুঝি ভালো হয়ে যাবে। এটি ভুল ধারণা, এর থেকে আমাদের বের হতে হবে। আইসিইউতে রাখলে অবশ্যই ভালো হবে। তবে যাদের হওয়ার সুযোগ আছে। যেমন একজন রোগীর হার্টে ইনফেকশন হয়েছে, এখন যদি তাকে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করি, তাহলে রোগীটি ভালো হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু আবার হার্ট অ্যাটাক হলে তাদের মৃত্যুর হার হলো ৫০ শতাংশ। এর মধ্যে হার্ট অ্যাটাক হলে ২৫% হাসপাতালে আসার আগেই মারা যায়, বাকি ২৫% সঠিক চিকিৎসার অভাবে মারা যায়, ২৫% আবার কিউরেবল সারভাইব করে বাকি ২৫% সাপোর্টের মাধ্যমে বাঁচে। এটি বিশে^র উন্নত দেশেও একই অবস্থা। হার্টের রোগীদের জন্য কার্ডিও এক্সেজারি, কার্ডিও করোনারি ইউনিট এগুলো সবই আছে। অনেক সময় এই রোগীদেরও আইসিইউ চিকিৎসা দিতে হয়। কারণ হলো যদি তাদের কোনো একটি অর্গানকে আর্টিফিশিয়াল সাপোর্ট দেওয়া যায়, তাহলে রোগীটি বাঁচানো যেতে পারে। অন্য কোনো সমস্যা থাকে না। এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ইনফেকশন। সে জন্য আইসিইউ সবচেয়ে সুরক্ষা এরিয়া। কারণ এখানে যেহেতু যন্ত্রপাতি দিয়ে রোগীর সেবা দেওয়া হয়, নিজে কিছু করতে পারে না। এখানে যারা যাবে বা দেখবে বা আমরা যারা চিকিৎসা দেই তাদের কাছ থেকেও রোগীদের ইনফেকশন হতে পারে। আইসিইউতে মৃত্যু আরও একটি বড় কারণ হলো ইনফেকশন।

আমার সংবাদ : আইসিইউ নিয়ে সরকারের কি কোনো নীতিমালা আছে?
বণিক : না, এই বিষয়ে সরকারের কোনো নীতিমালা নেই। আইসিইউর এই নীতিমালা করার জন্য কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে। একটি প্রাইমারি খসড়াও তৈরি করা হয়েছে। এখনো চূড়ান্ত হওয়ার বাকি। এই নীতিমালায় বলা আছে, আইসিইউতে কারা চিকিৎসা দেবে, কারা নার্স হিসেবে থাকবে, কেমন যন্ত্রপাতি রাখতে হবে এবং কী কী দেখে আইসিইউ ভালো না খারাপ সেটি বুঝা যাবে। এটি মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে যাবে, সংসদে যাবে এরপর পাস হবে। বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানকে এই অনুমোদন দিয়েছে এমন কোনো নজির নেই। যে যার মতো পরিচালনা করছে।

আমার সংবাদ : আইসিইউতে কারা চিকিৎসা দিতে পারেন?
বণিক : আমাদের এখানে এনেস্থেসিয়া, আইসিইউ এবং ক্রিটিক্যাল কেয়ার এই তিন বিভাগে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করার সুযোগ আছে। দুটি গ্রুপের লোক আইসিইউতে কাজ করতে পারেন। এই দুটি হলো আইসিইউ প্যাশেন ম্যানেজমেন্ট ও ইমার্জেন্সি প্যাশেন ম্যানেজমেন্ট। যখন একজন রোগীকে অজ্ঞান করে তখন তার কোনো ক্ষমতা থাকে না। ফলে এই কাজটি করতে প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই।

আমার সংবাদ : আপনি বিএসএমএমইউতে কী কী বিষয়ে উন্নয়ন করেছেন বা করবেন?
বণিক : আমাদের এখানে প্রথম সমস্যা হলো সিট সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানের জন্য সিট বাড়াচ্ছি। ইচ্ছা থাকলেই সব হয় না। এগুলোর সঙ্গে অনেককিছু সম্পৃক্ত (জায়গা, যন্ত্রপাতি)। দ্বিতীয়ত, আমরা এখানে ৫টি সিট দিয়ে শুরু করেছিলাম, এখন নতুনটি চালু হলে আইসিইউ ও এসডিও মিলে ৫৬টি সিট হবে। একইসঙ্গে পোর্ট অপারেটিং রুমগুলো মোটামুটি একটি আইসিইউর মতো। আমাদের নীতিমালা যা হচ্ছে, সেখানে দেখবেন আইসিইউর তিনটি লেভেল করা হচ্ছে। এগুলো হলো লেভেল ওয়ান আইসিইউ ম্যানেজমেন্ট, লেভেল টু আইসিইউ ম্যানেজমেন্ট এবং লেভেল থ্রি আইসিইউ ম্যানেজমেন্ট। এগুলো মেডিকেল কলেজে থাকবে থ্রি আইসিইউ ম্যানেজমেন্ট। এখানে সব ধরনের সাপোর্ট থাকবে। লেভেল টু আইসিইউ ম্যানেজমেন্টে (জেলা হসপিটাল) যেখানে একটি অর্গানকে সাপোর্ট দেওয়ার মতো অবস্থা হবে এবং লেভেল ওয়ান আইসিইউ ম্যানেজমেন্টে হলো ইমার্জেন্সি সেবা। আপনাকে এখানে ঠিকমতো আইবিএম দেওয়ার মতো অবস্থা তৈরি করা। এখান থেকেই আইসিইউর কার্যক্রম শুরু হয়। এটি করার চিন্তা করছি উপজেলা থেকে জেলা পর্যন্ত। এই বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী অনেক সাধুবাদ জানিয়েছেন। অন্যটি হলো অ্যাম্বুলেন্স। এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো লোক এটি খুলে বসে আছে। অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসে ওই সুযোগ-সুবিধা আছে কী না। বিশ^ব্যাপী দেখা যায়, অ্যাম্বুলেন্সে অনেক হাসপাতালের চেয়ে ভালো সুযোগ-সুবিধা আছে। বিশ^ব্যাপী আইসিইউকে সেবা হিসেবে নেয়। আমাদের দেশে এটিকে মনে করে ব্যবসা। আবারো বলছি আইসিইউ সবার জন্য নয়, আইসিইউ ব্যবসা নয়, এটি সেবা। বাইরে এই ব্যয়বহুল চিকিৎসার জন্য বিমা জরুরি। আমাদের দেশেও বিমার আওতায় আনা গেলে এই চিকিৎসার ব্যয়ভার কোম্পানি বহন করবে। এটি হলে ব্যক্তি আর পথে বসবে না। সে সময় যোগ্য লোকেরা এই চিকিৎসাটা পাবে। কারণ টাকাটা পরিশোধ করবে বিমা কোম্পানি।

আমার সংবাদ : পিজি হাসপাতালে আইসিইউ বিভাগের কী অবস্থা?
বণিক : আমাদের হাসপাতালে মোট ৩৫টি বেড আছে। এর মধ্যে ২১টি আইসিইউতে এবং ১৪টি এসডিইউ। আরও কিছু বেড চালু হবে। এগুলোর টেন্ডারসহ সবকিছু হয়ে গেছে। এগুলো চালু হলে ৫৬টি সিটের মতো হবে। আগামী ২ মাসের মধ্যে এগুলো চালু করতে পারবো বলে মনে হচ্ছে। আমরা এখানে সার্ভিস বাড়াতে চাই। এর জন্য আমাদের দক্ষ জনবল বাড়াতে হবে। আমরা এমন একটি আইসিইউ বানাতে চাই, যেখানে রোগীর কোনো আত্মীয়-স্বজন হাসপাতালে আসতে না হয়। বাসায় বসেই যাতে খোঁজখবর নিতে পারে। কারণ আইসিইউতে এসে রোগী দেখতে পারে না। অথচ পুরো পরিবারের সবাই এসে বসে থাকে। এই জন্য আইসিইউতে পুরোপুরি তথ্যপ্রযুক্তির আওতায় নিয়ে আসতে চাই। এই দুটি বিষয়কে উন্নত করতে চাই।

আমার সংবাদ : সিট বরাদ্দের বিষয়ে আপনাদের কী অবস্থা?
বণিক : সিট বরাদ্দের বিষয়ে আমরা কয়েকটি বিষয় দেখি। তার মধ্যে অন্যতম হলো যে রোগীর বাঁচার সম্ভানা আছে, তাদের প্রথম অগ্রাধিকার।

আমার সংবাদ : আইসিইউর নার্সদের কেমন হওয়া উচিত?
বণিক : আমি শুরুতেই বলেছি আইসিইউ হলো সেবা নির্ভর একটি চিকিৎসা। এখানে নার্সরাই ডাক্তারদের তুলনায় বেশি জরুরি। কারণ নার্সদের রোগীর পাশে থাকতে হয়, ২৪ ঘণ্টা তাকে মনিটর করতে হয়। খাবার, গোসল, পরিষ্কার-পরিছন্ন থেকে সবকিছু তাদের করতে হয়। এই নার্সরা যাতে রোগীদের ভালো সেবা দেয়, সেই জন্য বঙ্গবন্ধুতে তার মূল বেতন থেকে ২৫% বেশি বেতন দেওয়া হয়। এটি বাংলাদেশের আর কোনো জায়গায় নেই। যাতে তারা রোগীদের ভালো করে সেবা দেয়। একটি রোগীর জন্য একটি নার্স। তাকে কিন্তু সেখানে সবসময় বসে থাকতে হয়। কারণ যেকোনো সময় রোগীর অবস্থা খারাপ হতে পারে। ওই সময় দেখা যাবে ডাক্তার আসতে আসতে রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। এই জন্যই বলি, ডাক্তারের চেয়ে বেশি প্রয়োজন নার্সদের।

আমার সংবাদ : আপনারা কীভাবে আইসিইউ মনিটরিং করেন?
বণিক : আমাদের এখানে সিসি টিভি আছে, সেই যন্ত্র দিয়ে সবসময় মনিটরিং করি। এটিকে আরও ভালো করার জন্য কাজ করছি। এমন ব্যবস্থা করছি যাতে বাসায় বসে পরিবার দেখতে পারে।

আমার সংবাদ : প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বসে কী বিষয়ে আলাপ হয়েছে?
বণিক : সেখানে অনেক বিষয়ে আলাপ হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো লেভেল অনুযায়ী ম্যানেজমেন্ট, আইসিইউতে কারা সেবা পাবে, রোগীর বাইরে যাতে কোনো লোক আইসিইউতে প্রবেশ করতে না পারে। কারণ বাইরের কোনো লোক আইসিইউতে প্রবেশ করলে রোগীর ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আইসিইউতে রোগী দেখতে গিয়ে লাভ কী? ওই রোগী তো কথা বলতে পারে না। সেখানে না গিয়ে তার বাসায় গিয়ে সমবেদনা জানান। এখানে আসার কোনো যুক্তি নেই। আমরা একটি বিষয় চালু করছি আইসিইউতে রোগী থাকলে দিনে একবার দেখা করবে এবং ২ বার ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করবে। তবে রোগীর অবস্থা খারাপ হলো যতবার প্রয়োজন ততবার ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ নিবে। এটি হতে হবে লিখিত। তখনই বলা যাবে আইসিইউর কোয়ালিটি ভালো। বঙ্গবন্ধু থেকে চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আমরা মনে করি জানলে সেবা দিতে পারবে। এই জন্য নার্সদের ৩ মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। অন্য বিভাগ- যেমন ইমার্জেন্সি বা প্যাশন ম্যানেজমেন্টের জন্য এই প্রশিক্ষণ চালু করতে চাই। আমাদের একটি বড় প্রশিক্ষণ আছে, সেটি হলো সিপিআর। রাস্তায় হার্টঅ্যাটাক হয়ে গেলে কীভাবে চালু করবে। এটি সারাদেশে চালু করতে চাই। এটি শুধু ডাক্তারদের কাছেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এই প্রশিক্ষণ ট্রাফিক পুলিশ, সাংবাদিকদেরও দেওয়া হবে। যাতে করে প্রাথমিক চিকিৎসা রাস্তা থেকেই চালু হয়ে যায়। বিশ্বের সব দেশে এটি আছে। যেমন একটি রোগী ঘাড়ে ব্যথা পেলে তাকে চেং দোলা করে নিয়ে এলে রোগীর অবস্থা সেখানেই শেষ। আমরা মানুষকে এগুলো জানাতে চাই। সম্প্রতি এমন একটি ঘটনা ঘটেছে। বগা লেকে গিয়ে আমাদের এক ডাক্তারের হার্ট অ্যাটাক হলো। সেই পাহাড়ের উপর। তার সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল ও ডা. আম্বিয়া ছিলেন। তাকে বিডিং দিয়ে হেলিকপ্টারে ইউনাইটেডে নিয়ে এসেছে। সে এখন সুস্থ। এটি হয়েছে মূলত এই বিষয়ে জানার কারণে। এই বিষয়গুলো আমরা সবাইকে জানাতে চাই। রিসেটেশন ম্যানেজ ও ইমার্জেন্সি ম্যানেজ করতে পারি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত