শিরোনাম
হত্যামামলায় পুলিশের ভুল তদন্ত

জবানবন্দি দিচ্ছে ছিনতাইকারী ঘুরে বেড়াচ্ছে মূলহোতারা

প্রিন্ট সংস্করণ॥ নুর মোহাম্মদ মিঠু  |  ০১:৩২, এপ্রিল ২৪, ২০১৮

উল্টোপথে হাঁটছে রাজধানীর শেরে বাংলা কৃষি ট্রেনিং ইন্সটিটিউটের ছাত্র সাকিব খান হত্যাকাণ্ডের তদন্ত। প্রেমঘটিত কারণে এ হত্যাকাণ্ড সংঘঠিত হলেও জড়িতদের আড়ালে রেখেই ছিনতাইকারীদের পেছনে ছুটছে রেলওয়ে থানা পুলিশ। অন্যদিকে সন্তান হারা বাবা-মায়ের সামনে বুক ফুলিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে হত্যাকাণ্ডের মূলহোতারা। সাকিবের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ভেবে যে আইএমই নম্বরটি ট্রেক করে বেশকয়েকজন ছিনতাইকারীকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তারা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সাকিব হত্যকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার কথাও স্বীকার করেছে সে আইএমই নম্বরটিও সাকিবের নয় বলে দাবি করেছে তার পরিবার। পুলিশ ভুলবশত একই নামের অন্য আরেকটি মোবাইলের আইএমই নম্বর ট্রেকিং করে তাদের গ্রেপ্তার করেছে। অথচ তারা (গ্রেপ্তারকৃতরা) কীভাবে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে তা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তুলেছেন সাকিবের বাবা সফিউদ্দিন ও মা পারুল বান। ছিনতাইকারীদের এমন স্বীকারোক্তির কারণে এবং পুলিশের ভুল তদন্তে আড়ালে থেকে মূলহোতারা পার পেয়ে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছে সাকিবের পরিবার। এ নিয়ে হতাশ সন্তান হারানো বাবা-মা। ঘুরছেন রেলওয়ে থানা পুলিশের ধারে ধারে।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাত আনুমানিক ৮টার দিকে রাজধানীর বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে কর্নফুলী ট্রেনের ছাদ থেকে রক্তাক্ত জখম হয়ে পড়ে থাকা অবস্থায় সাকিব খানকে উদ্ধার করেন সাগর নামের এক যুবক। সেখান থেকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে এলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত ১০টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সাকিবের লাশ সনাক্তের অপেক্ষায় ঢামেকের মর্গে রেখে রেলওয়ে থানায় এ নিয়ে অপমৃত্যু মামলার প্রস্তুতি চলছে– এমতাবস্থায় সন্তানের মোবাইল বন্ধ পেয়ে দিশেহারা মা নরসিংদী থেকে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত ছুটে আসেন। কমলাপুর রেলওয়ে থানায় এসে তিনি জানতে পারেন সাকিবের বয়সি এক কিশোরের লাশ ঢামেক মর্গে রয়েছে। যাকে বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
ঢামেক মর্গে গিয়ে সন্তানের লাশ সনাক্ত করে কমলাপুর রেলওয়ে থানায় একটি হত্যামামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে সাকিবের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের যে মডেল উল্লেখ করা হয়েছিল সে মডেলটি ভুল ছিল। আর সে ভুল আইএমই নম্বরের ভিত্তিতেই পুলিশ ইতোমধ্যেই বেশকয়েকজন ছিনতাইকারীকে টঙ্গী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার ওইসব ছিনতাইকারী এ হত্যকাণ্ডের সাথে জড়িত রয়েছে বলে স্বীকারোক্তিও দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সাকিবের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের আইএমই নম্বরটি এখনো পর্যন্ত ট্রেকিং করা হয়নি। এ নিয়ে সাকিবের মা (ফুলবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা) পারুল বান ও বাবা সফিউদ্দিন হতাশা প্রকাশ করে বলেন, মামলার এজাহারে মোবাইলের মডেল (আইএমই) নম্বর ভুল করায় পুলিশ অন্য একটি মোবাইলের ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন– এসব ছিনতাইকারীরা কেন এ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করবে। আমরা এ নিয়ে কমলাপুর রেলওয়ে থানায় সাকিবের ব্যবহৃত মোবাইলের মডেল নম্বর সংশোধনী করে জমা দিয়েছি। সাকিবের মোবাইল ট্রেকিং না করলে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা পার পেয়ে যাবে বলে হতাশা প্রকাশ করেন তারা। তিনি আরও বলেন, এই হত্যকাণ্ডে জড়িত একই এলাকার আকাশ ও মুন্না। আকাশ ও মুন্না সাকিবকে প্রেমঘটিত কারণে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে।
সাকিবের মা পারুল বান আমার সংবাদকে বলেন, তাদের গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর পলাশ থানাধীন চরসিন্ধুর ইউনিয়নের ফুলবাড়িয়া গ্রামে। সাকিব রাজধানীর শেরে বাংলা কৃষি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের ছাত্র ছিল। একই এলাকায় পাশের গ্রামের গুলজার ভুইয়ার মেয়ে তমা আক্তারের সাথে সাকিবের কিছুদিন প্রেমের সম্পর্ক ছিল, একটা সময় এ সম্পর্ক শেষও হয়ে যায়। সাকিব এবং তমার এ সম্পর্কের বিষয়ে জানতো পাশের গ্রামের সাকিবের দুই বন্ধু আকাশ ও মুন্না। তাদের মধ্যে আকাশ তমাকে পছন্দ করতো। সাকিব-তমার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আকাশ তমার সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে। আকাশ ও তমার পারিবারিক সম্পর্ক ছিল খালা-ভাগিনা। এরপরও এ সম্পর্কের খাতিরে তারা কাউকে না জানিয়ে কোর্ট ম্যারেজ করে। তাদের কোর্ট ম্যারেজের কথা জানতে পেরে তমার বাবা গুলজার ভুইয়া জোরপূর্বক তমাকে দিয়ে আকাশকে ডিভোর্স দেয়। আর তাতেই আকাশ সাকিবের ওপর চড়াও হয়। সাকিবের কারণেই আকাশকে ডিভোর্স দিয়েছে তমা– এমন সন্দেহের কারণে আকাশ তার মামাতো ভাই মুন্নাকে সঙ্গে নিয়ে সাকিবকে সবসময় দেখে নেওয়ার হুমকি দিতে থাকে। আকাশ ও মুন্না বিভিন্ন সময়ে বাড়িতে এসেও সাকিবকে খুনের হুমকি দিতো। ঢাকা থেকে বাড়িতে আসা-যাওয়ার পথে আকাশ ও মুন্না সাকিবকে সবসময় অনুসরণ করতো। সর্বশেষ সাকিব হত্যাকাণ্ডের ঘটনার দিন আকাশ ও মুন্না সাকিবকে অনুসরণ করে রেলস্টেশন পর্যন্ত গিয়েছিল বলেও সেসময় ফোন করে জানিয়েছিল সাকিব। আকাশ ও মুন্নাই সাকিবকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে বলে তিনি দাবি করেন।
কমলাপুর রেলওয়ে থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইয়াসিন ফারুক আমার সংবাদকে বলেন, এ ঘটনায় বেশকয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। ইতোমধ্যে হত্যকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত একজন জেলহাজতে রয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও তিনি জানান। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বিষয়ে সাকিবের বাবা-মা ভিন্ন কথা বলছেন, এ নিয়ে আপনি কি বলবেন– এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুটি মোবাইল ফোনের আইএমই নাম্বার ট্রেকিং করে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার মধ্যে একটি আইএমই নম্বরের মিল পাওয়া গেছে। তাছাড়া সাকিবের পরিবারের বক্তব্যের ভিত্তিতে স্থানীয়দের (আকাশ-মুন্না) বিরুদ্ধে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত