শিরোনাম

এমপিদের প্রচারণার সুযোগকে অযৌক্তিক বলছেন বিশেষজ্ঞরা

প্রিন্ট সংস্করণ॥কাওসার আজম  |  ১৬:০৭, এপ্রিল ১৬, ২০১৮

সিটি কর্পোরেশনসহ অন্যান্য স্থানীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের (এমপি) প্রচারণার সুযোগ রেখে আচরণবিধির পরিবর্তন আনতে নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রস্তাব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। একইভাবে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে জামানত ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করার প্রস্তাবও যৌক্তিক নয় বলে মনে করেন তারা। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওস্থ নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে বৈঠক করে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল। তারা স্থানীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের (এমপি) প্রচারণা ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ রেখে আচরণবিধির পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখেন। নির্বাচন কমিশনের সাথে বৈঠক শেষে এইচটি ইমাম বলেন, অনেক সময় মন্ত্রীদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। অনেক সময় সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সময় এমপিরা তাদের এলাকায় যেতে পারেন, এতে অনেকের অসুবিধা হয়। তারা তো ওইসব স্থানে বসবাস করেন। গাজীপুর বা খুলনায় তো অনেক এমপি আছেন। তাদের ওপর যদি ওরকম নিয়ন্ত্রণ করা হয় তাহলে তারা অচল হয়ে যাবেন। এ জিনিসটি বাস্তবায়নমূলক যেন হয় সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে; আরপিও নিয়েও বাস্তবে অনেক সমস্যা হচ্ছে। আমরা সেই সমস্যাগুলো আলোচনা করেছি। এমপিদের প্রচার-প্রচারণা নিয়ে এইচটি ইমাম বলেন, নির্বাচনি এলাকায় এমপিদের প্রচারণা ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ করে দিতে হবে। তিনি ভারতের উদাহরণ দিয়ে বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জনপ্রতিনিধারা নির্বাচনে প্রচারণা চালান। আমাদের পাশের দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে প্রচারণা চালিয়েছেন। আমরা জনপ্রতিনিধিদের প্রচারণার সুযোগ চাই। নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, বর্তমানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাইলে ২০ হাজার টাকা ইসিতে জামানত রাখতে হয়। নির্দিষ্ট আসনের মোট গৃহীত ভোটের এক-অষ্টমাংশের কম ভোট পেলে ওই অর্থ আর ফেরত পাওয়া যায় না (জামানত বাতিল হয়)। জামানতের এ টাকা বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব পড়েছে নির্বাচন কমিশনে। একইসঙ্গে প্রার্থী হতে টিআইএন থাকা বাধ্যতামূলক করা, ভোটের আগে-পরে ব্যয় কঠোরভাবে তদারকসহ ৩৫টি প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে ইসি আইন সংস্কারসংক্রান্ত উপকমিটি। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধনে (আরপিও) নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানমের নেতৃত্বাধীন কমিটির এ প্রস্তাবগুলো গত বৃহস্পতিবার কমিশন সভায় পর্যালোচনার জন্য উপস্থাপিত হয়। এ দিকে শুরু থেকেই বাম দলগুলো ইসির এ উদ্যোগের বিরোধিতা করে আসছে। নির্বাচন কমিশনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সুপারিশের পর গত বছরের ডিসেম্বর মাসে ইসির ‘আইন-বিধি সংস্কারসংক্রান্ত’ কমিটির সভায় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংস্কারের প্রাথমিক খসড়ায় প্রার্থীর জামানতের পরিমাণ ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব আসে। এ প্রেক্ষিতে গত ১৯ ডিসেম্বর রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে সিইসি কেএম নূরুল হুদার সঙ্গে বৈঠক করেন তিন বাম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ ও বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতারা। ওই দিন সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, যেখানে জামানত দিয়ে প্রার্থী হওয়া কষ্টসাধ্য, সেখানে জামানতের টাকা বাড়ানো হলে তা মানা হবে না। সেক্ষেত্রে জামানত কমিয়ে ৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। জামানত বাড়ালে নির্বাচন বর্জনের কথা ভাববেন বলেও হুমকি দিয়ে রেখেছেন সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। এ ব্যাপারে ইসির পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া না গেলেও আইন-বিধি সংস্কার কমিটি সূত্রে জানা যায়, জামানত ৫০ হাজার টাকা করার প্রস্তাবে কমিশন সায় দিয়েছে। ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ গত বৃহস্পতিবার বলেন, কমিশন বলছে, প্রস্তাবনাগুলোর আরো কিছুটা রিভিউ করা দরকার। খসড়া বিল হিসাবে পাঠানোর আগে রিভিউ কমিটি বাস্তবতা বিবেচনা করে আবার কমিশনে তা পেশ করবে। তিনি বলেন, এখন স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে সংশ্লিষ্ট এলাকার ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন তালিকার বিধান রয়েছে। সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা ও পৌরসভার সঙ্গে সমন্বয় রেখে জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও এক হাজার ভোটারের সমর্থন রাখার বিধান রাখতে প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু তা সহজ না করে বিদ্যমান বিধি বহাল রাখার পক্ষে ইসি। এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার দৈনিক আমার সংবাদকে বলেন, ১ শতাংশ ভোটার পুনর্বহাল রাখার পক্ষে যৌক্তিকতা আছে কিন্তু এটাকে অপব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে প্রার্থী সংখ্যা অত্যধিক হলে ম্যানেজ করা দুরুহ। তাই প্রার্থী সংখ্যা সীমিত রাখা দরকার। যাতে যে কেউ প্রার্থী হয়ে এটাকে খেলায় পরিণত করতে না পারে। তবে এই ১ শতাংশ নিয়ে অনেক অভিযোগ আছে। যারা স্বাক্ষর করে তাদের হুমকি-ধামকি দিয়ে স্বাক্ষর মিথ্যা প্রমাণিত করে মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে, এমন উদাহরণ অতীতে রয়েছে। এটাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে স্বার্থান্বেষীরা। যারা যোগ্য প্রার্থী, তাদের এর মাধ্যমে দূরে রাখা হয়। এটা বাতিল করাই ভালো। স্থানীয় নির্বাচনে এমপিদের প্রচারণা চালানোর সুযোগদানে আওয়ামী লীগের প্রস্তাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ সংসদ সদস্যরা যেভাবে প্রভাব প্রতিপত্তি সৃষ্টি করেন, তাতে কোনোভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। জামানত বৃদ্ধি প্রসঙ্গে সুজন সম্পাদক বলেন, ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে জামানত ৫০ হাজার টাকা করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। এর মাধ্যমে এটা ধনীদের খেলায় পরিণত হবে।টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আমার সংবাদকে বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে এমপিদের প্রচারণার সুযোগ চাওয়াটা যৌক্তিক নয়। কারণ এই সুযোগ দিলে নির্বাচন প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ থাকে। জামানত বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নোমিনেশন-বাণিজ্য থেকে শুরু করে নির্বাচনে যে টাকার ছড়াছড়ি হয়, সে তুলনায় ৫০ হাজার টাকা বিরাট কিছু না। ঠিক কত বছর আগে ২০ হাজার টাকা রাখার বিধান করা হয়েছে খেয়াল নাই। সময়ের আলোকে এটি পুনর্নির্ধারণ হওয়ারই কথা। তবে, রাজননৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তবে, বাম দলগুলো যে দাবি করেছে তারও যুক্তি আছে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত