শিরোনাম
বাণিজ্যিক ভবন অনুমোদন

সৌন্দর্য হারাবে গুলশান-বনানী

প্রিন্ট সংস্করণ॥ ফারুক আলম  |  ০১:০২, মার্চ ১৩, ২০১৮

রাজধানীর প্রাণ বুড়িগঙ্গা। বুড়িগঙ্গার পানি দূষণরোধে আন্দোলন হলেও নদীটি বাঁচানো যায়নি। ফলে দুর্গন্ধ পানি, যানজট, জলাবদ্ধতা, ময়লা-আবর্জনা ও বায়ু দূষণের মত হাজারও সমস্যা মোকাবিলা করেই বসবাস করতে হচ্ছে নগরবাসীকে। এসব সমস্যা সমাধানে নগরবাসী যখন ‘ঢাকা বাঁচাও ও বিকেন্দ্রীকরণ’ আন্দোলনের কথা ভাবছেন ঠিক সেই মুহূর্তেই রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) গুলশান, তেজগাঁও ও বনানীর মতো আবাসিক এলাকা বাণিজ্যিককরণে বিধিমালা অনুমোদন দিয়েছে। আর তাতে আবাসিক এলাকা বাণিজ্যিক হিসেবে গড়ে উঠলে রাজধানীতে জনগণের চাপ আরো বেড়ে ঢাকায় বসবাসের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ইতোমধ্যে ঢাকায় ২ কোটির উপরে মানুষের বসবাস। যা একটি শহরের জন্য বিপদজনক। যেকোন মুহূর্তে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে তা মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়বে। এরমধ্যে আবার যদি আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক ভবন নির্মিত হয় সেটি সরকার কিংবা জনগণ কারও জন্যই শুভ বার্তা বয়ে নিয়ে আসবে না। বরং যত দ্রুত সম্ভব ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণ করলে জনসংখ্যার চাপ কমবে।
গুলশান-১ এলাকার বাসিন্দা ফজলে ইসলাম আমার সংবাদকে বলেন, গত ১৫ বছর আগেও গুলশান এলাকা যানজটমুক্ত থাকতো। ইদানিং প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় গুলশান থেকে মহাখালী, ফার্মগেট যেতে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। অথচ যানজট না থাকলে এটি ৫ মিনিটের রাস্তাও নয়। এর সঙ্গে আবারও যদি গুলশানে বাণিজ্যিক ভবন গড়ে উঠে তখন দুর্ভোগ আরো বাড়বে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারের প্রভাবশালী নেতা ও ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে গুলশান, বনানী ও তেজগাঁও এলাকায় বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব এলাকায় ইচ্ছামত ভবন নির্মাণ করা যাবে। ফলে এসব এলাকার যে সৌন্দর্য্য ছিল তা আর থাকবে না। বিদেশিদের বসবাসের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম আমার সংবাদকে বলেন, পুরান ঢাকায় ঘিঞ্জি এলাকায় পরিণত হওয়ায় সেখানে সিটি করপোরেশন, রাজউক বড় ধরনের কোনও পরিকল্পনা নিতে পারে না। এরসঙ্গে গুলশান এলাকায় বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মিত হলে উত্তর সিটি করপোরেশনের উপর চাপ বাড়বে। এরচেয়ে পূর্বাচলে যেভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে তা যদি বাস্তবায়ন হয় তাহলে সেখানে যাওয়াটাই ভালো। এতে সমস্যা থাকবে না। অর্থাৎ পূর্বাচলে যেভাবে প্ল্যানিং করা হচ্ছে তা বাস্তবায়নটা জরুরি। রাজধানী অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠায় নগরবাসী নানা সমস্যায় রয়েছে। এই নগরপরিকল্পনাবিদ আরো বলেন, গুলশান ও ধানমন্ডি যখন গড়ে উঠে তখন ৬ তলা ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ইচ্ছামত বহুল বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে গুলশানে লোকজন বসবাস বেড়ে যায়। ভারসাম্যের বাইরে চলে যায়। এটি আর নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না।
রাজউকের বিধিমালায় উল্লেখ রয়েছে উন্নয়ন ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ। আমরা শুধু উন্নয়ন করবো কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করবো না। সেটি হলে কখনই সফলতা পাওয়া যাবে না। সরকার রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) তৈরি করে দিয়েছে। তারা উন্নয়নে নিয়মকানুন মেনে চললে সমস্যা সমাধানের সম্ভব বলে মনে করেন এই পরিকল্পনাবিদ।
রাজউকের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বলেন, ধানমন্ডি ও গুলশানের মত এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমোদন না দিলে হয়তো আমি-আপনি সেখানে থাকতে পারতাম না। বর্তমানে ধানমন্ডিতে ১২-১৪ তলা ভবন হচ্ছে। মানুষ ফ্ল্যাট নিয়ে বসবাস করছে। আগে কিন্তু ধানমন্ডিতে সাধারণ মানুষ ফ্ল্যাট নিয়ে বসবাসের সুযোগ পেত না। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মোহাম্মদ খান আমার সংবাদকে বলেন, পুরান ঢাকা যেমন রাজধানীর ঐতিহ্য ঠিক তেমনি গুলশান, বনানী ও তেজগাঁও এলাকায় নতুন ঢাকার একটি ঐতিহ্য। কিন্তু হঠাৎ করে এসব আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিককরণের সিদ্ধান্ত কিভাবে রাতারাতি নেওয়া হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। ইতোমধ্যে আমাদের কাছে এ ব্যাপারে রাজউক থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এতে ঢাকা শহরের সৌন্দর্য্য নষ্ট হয়ে যাবে। জনগণের চাপ আরো বাড়বে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন নগরী নোংরা পরিস্থিতি বিরাজ করবে। কোন কারণে আবাসিক থেকে বাণিজ্যিক করা হচ্ছে এর কোন দীর্ঘ পরিকল্পনা নেই। বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সড়ক নির্মাণ করা হয়নি। রাজধানী গুলশান ও ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় প্রতি একরে ৫০ জন মানুষের বসবাসের পরিকল্পনা করা হলেও পরবর্তীতে ৩৮০ জনের বসবাসের অনুমোদন দেওয়া হয়। বর্তমানে এসব এলাকায় প্রায় ৬১২ জন বসবাস করছেন। এছাড়াও আবাসিক ভবনে অবৈধভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এতে বসবাসের সুষ্ঠু পরিবেশ হারাচ্ছে বলে মনে করছেন নগরপরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা। ভবন নির্মাণে নগরপরিকল্পনাবিদরা কোনও প্রকল্প বাস্তবায়নে সঠিক প্ল্যানিং তৈরি করলেও প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রিতায় সেই প্ল্যানিং বাস্তবায়ন হয় না। পরবর্তীতে প্ল্যানিং পরিবর্তন করে জঙ্গলে পরিণত হয়। প্রকল্পের প্ল্যানিং বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি না করে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি বলে মনে করছেন নগরবিদরা।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত