শিরোনাম

পরীক্ষাকেন্দ্রের সচিবরাই ফাঁস করছেন প্রশ্ন

প্রিন্ট সংস্করণ॥ আব্দুল লতিফ রানা  |  ০০:৩৮, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৮

থামছে না প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা। একের পর এক সারাদেশেই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজের ভর্তি এবং এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা থামছে না। প্রতিনিয়তই প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় কোথাও না কোথাও জড়িতদের গ্রেপ্তার করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
গতকালও প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। রোববার গভীর রাতে চট্টগ্রামের রাউজানে অভিযান চালিয়ে ২ জনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িত। তারা হলেনÑ মো. ইমরান (১৮) ও নুরুল আফছার সবুজ (২০)। গত ৩ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে একটি গ্রুপের মাধ্যমে প্রথম যোগাযোগ হয়। একপর্যায়ে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করে। তার পরও ঘটনার মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার রাইরেই থাকছে। শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ বলছেন, প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় বোর্ডের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত নয়। পরীক্ষা কেন্দ্রে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নিরাপত্তার মধ্যে কেন্দ্র সচিবদের কাছে প্রশ্নপত্রের প্যাকেটগুলো হস্তান্তর করা হয়। আর পরীক্ষা শুরুর আগে প্যাকেটগুলো খুলে হলের কক্ষে পাঠানো হয়। আর তখনই ফাঁস করা সম্ভব। আর এমন আশঙ্কা একাধিক গোয়েন্দা সংস্থারও। এর আগে কারো পক্ষেই ওই প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খোলা সম্ভব নয়। ফাঁস করা হলে একমাত্র কেন্দ্র সচিবের সহযোগিতায় সম্ভব। এজন্য প্রতিটি কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মোবাইল ফোন বন্ধ করা হলেই প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা সম্ভব হবে বলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একজন সচিব জানিয়েছেন। সূত্র জানায়, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শুধু রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিশজন কর্মকর্তা, ১০টি স্কুল ও ৬টি কোচিং সেন্টারকে সনাক্ত করেছে গোয়েন্দারা। তারা বলছেন, শিক্ষা বোর্ড থেকে প্রশ্ন প্যাকেট করার সময় মোবাইল সেটের মাধ্যমে অথবা কেন্দ্রে প্রশ্ন যাওয়ার পর প্যাকেট খুলে মোবাইল সেটে ছবি নিয়ে একেক সময় একেক বিভাগ থেকে প্রশ্নফাঁস করা হচ্ছে। এতে রাজধানী ঢাকার ১০টি স্কুল ও ছয়টি কোচিং সেন্টার জড়িত। আর এই প্রশ্নফাঁসের ঘটায় জড়িত সন্দেহে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ডেকে নিয়ে অঙ্গীকারনামা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া, সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় একটি কমিটি করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড থেকে বিভিন্ন জেলার পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রশ্ন পাঠানোর পর সেখান থেকে কেন্দ্রগুলোতে প্রশ্নের প্যাকেট পাঠানো হয়। এরপর কেন্দ্রে প্যাকেটগুলো খোলার পরই তা মোবাইল সেটে কপি করার পর পরীক্ষা শুরু হওয়ার বেশকিছু সময় আগেই তা ফাঁস করা হচ্ছে। এই প্রশ্নফাঁস চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকায় সম্প্রতি তিন শতাধিক মোবাইল সিম ব্লক করে দিয়েছে গোয়েন্দারা। আর সন্দেহভাজন আরো ১৯টি কোচিং সেন্টারের ব্যাপারে নজরদারি ও তদন্ত শুরু করেছে। এর আগে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার মূল হোতা বিজি প্রেসের আলোচিত কর্মচারী আলমগীর ওরফে আলমসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে ডিবি। গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মাজেদুল ইসলাম আদালতে এ চার্জশিট দাখিল করেছেন বলে জানা গেছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রশ্নপত্র বিজি প্রেসে ছাপা হয়। সেখান থেকে একাধিকবার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। এরপর আরো কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এজন্য বিজি প্রেস থেকে এখন আর প্রশ্নপত্র ফাঁস করা সম্ভব নয়।
অপর এক সূত্র জনায়, রাজধানীর ছয়টি কোচিং সেন্টারের বিরুদ্ধে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে গোয়েন্দারা। সেগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ বর্ণমালা কোচিং সেন্টার, মেধা বিকাশ কোচিং সেন্টার, সাইফুর্স কোচিং সেন্টার, টেক কেয়ার কোচিং সেন্টার ও অ্যাডভান্স কোচিং সেন্টার। এছাড়া ১০টি স্কুলের মধ্যেÑ মান্ডা আইডিয়াল হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল কলোনি হাই স্কুল, মানিকনগর আইডিয়াল হাই স্কুল এবং একই এলাকার মা ও মণি উচ্চ বিদ্যালয় উল্লেখযোগ্য। চিহ্নিত এ স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং কোচিং সেন্টারের মালিককে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে গোয়েন্দারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলায় গ্রেপ্তারকৃত বিজি প্রেসের আলম ছাড়াও সাইফুল ইসলাম ওরফে জুয়েল, রুবেল ব্যাপারী, আবদুস সাত্তার, মেজবাহ আহমেদ, কাওছার হোসেন, আল আমিন, হৃদয় হোসেন এবং জাহাঙ্গীর আলমের নামে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তাকৃতদের মধ্যে সাইফুল ইসলাম ওরফে জুয়েল জামিনে রয়েছেন। অভিযোগপত্রে জানা গেছে, জুয়েল ও আলম একে অপরের ভায়রা ভাই। তারা বিজি প্রেসে প্রশ্নপত্র কম্পোজ করার সময় আলম তা মুখস্থ করে ফেলতো। পরে মুখস্থ করা প্রশ্নপত্র নিজে কম্পিউটারে কম্পোজ করে জুয়েলের হাতে দিতো। অন্যদের সহযোগিতায় অর্থের বিনিময়ে জুয়েল তা বিভিন্ন কোচিং সেন্টার, পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের হাতে তুলে দিতো। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের মো. শহিদুল্লাহ নামের একজন সেকশন অফিসার জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে শিক্ষা বোর্ডের কোনো কর্তকর্তা-কর্মচারী জড়িত হওয়ার কোনো স্কোপ নেই। তার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বিজি প্রেসে প্রশ্নপত্র ছাপা হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাকেন্দের নামে বরাদ্দকৃত প্রশ্নগুলো প্যাকেট হয়। এরপর ওই প্যাকেটগুলো সরাসরি রাজধানীর সদরঘাট এলাকার ঢাকা ট্রেজারিতে নিয়ে সংরক্ষিত রাখা হয়। পরে পরীক্ষার দিন সকাল ৮টায় সেখান থেকে প্রশ্নপত্রের প্যাকেটগুলো বিতরণ করা হয়। এরপর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নিরাপত্তার মাধ্যমে প্যাকেটগুলো সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র সচিবের কাছে পৌঁছানো হয়। এতে যেসব পরীক্ষা কেন্দ্র কাছে তারা আগে পায়। আর যেসব প্রতিষ্ঠান দূরে সেগুলো পরে পায়।
তিনি আরো বলেন, ফাঁসকৃত প্রশ্নপত্রগুলো পরীক্ষা শুরুর আধা ঘণ্টা আগে ফাঁস করা হচ্ছে। এতে ভালো শিক্ষার্থীরা লোভে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর ফাঁস হলেও কেন্দ্র থেকেই ফাঁস করা হচ্ছে। তাছাড়া ফাঁস করার কোনো উপায় নেই বলে জানান তিনি। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রণালয় বোর্ডের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থ্া নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিগগিরই জড়িত অন্তত ২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত