শিরোনাম
রাজধানীর সড়কে নিম্নমানের কাজ

কখন হয় কীভাবে হয় জানতে পারছেন না কাউন্সিলররা

প্রিন্ট সংস্করণ॥ ফারুক আলম  |  ০০:৪০, জানুয়ারি ২০, ২০১৮

রাজধানীর শ্যামলির মোহনপুরের রাস্তাটির মেরামতের পর একবছর অতিবাহিত হয়নি এখনও। অথচ এপর্যন্ত অন্তত ১০টি ম্যানহোলের স্লাব ভেঙেছে বেশ কয়েকবার। একবার ঠিক করে কিছুদিন যেতে না যেতেই ভেঙে পড়ে ওই স্লাব। কখনও নতুন আরেকটি। এখনও ভাঙা আছে একটি স্লাব। এভাবে শুধু মোহনপুরই নয়, অভিযোগ রয়েছে অতি মুনাফার লোভে রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন সড়কেই নিম্নমানের কাজ করছেন ঠিকাদাররা। সেটি নতুন রাস্তা হোক বা পুরনো ভাঙা রাস্তার উন্নয়নই হোক। এদিকে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলররা বলছেন কখন রাস্তার কাজ শুরু হয় বা কিভাবে হচ্ছে তা জানতেই পারছেন না তারা। এর কারণ ব্যাখ্যা দিয়ে কাউন্সিলররা জানান, আগে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ওয়ার্ডগুলোতে উন্নয়নমূলক কাজে ঠিকাদারদের বিল উত্তোলনের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাউন্সিলরদের স্বাক্ষর লাগত। কিন্তু ওয়ান ইলেভেনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে নিজ এলাকায় কাজের তদারকি ও ঠিকাদারদের বিল উত্তোলনে কাউন্সিলরদের স্বাক্ষরের ক্ষমতাটি বিলুপ্তি করে সিটি করপোরেশন ও ঠিকাদারদের একে-অপরের পরামর্শে ওয়ার্ডগুলোর উন্নয়ন কাজ চালিয়ে যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হলেও সিটি কর্পোরেশনের এই নীতি বহাল আছে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের ৯ বছর। এই নীতি বিলুপ্তির জন্য ওয়ার্ড কাউন্সিলররা সিটি করপোরেশনের বোর্ডসভায় কয়েকবার দাবি উত্থাপন করলেও কোনও লাভ হয়নি। কাউন্সিলরদের মতে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সিটি করপোরেশনের কিছু সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসন আমলের এ নীতি বিলুপ্তি সম্ভব হচ্ছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কাউন্সিলর বলেন, আগে ঠিকাদাররা কাজ নেওয়ার সময়ে কাউন্সিলরদের মূল্যায়ন করত। বর্তমানে ঠিকাদাররা কাউন্সিলরদেরকে মূল্যায়ন তো দূরের কথা ওয়ার্ডে কাজ করতে আসলেও জিজ্ঞেস করে না। কারণ সিটি কর্পোরেশন ও ঠিকাদাররা যোগসাজশ করে ওয়ার্ডের কাজগুলো চালিয়ে যাচ্ছে। সেখানে কাউন্সিলরদের প্রয়োজন হয় না। এমনও সময় ঠিকাদাররা ওয়ার্ডে নিম্নমানের কাজ করছে সেখানে কাউন্সিলর বাধা দিলে উল্টো ঠিকাদাররা অভিযোগ তুলে যে কাউন্সিলর চাঁদা চেয়েছেন। চাঁদা চাওয়ার অভিযোগ তুলে ওয়ার্ডের উন্নয়ন কাজ বন্ধ রাখে। এতে ওয়ার্ডবাসীর দুর্ভোগ দ্বিগুণ হয়। এজন্য ঠিকাদাররা ওয়ার্ডে খারাপ কাজ করলেও কাউন্সিলররা বাধা দেয় না। ঠিকাদার নিজের ইচ্ছামত উন্নয়ন কাজ শেষে চলে যায়।
কাউন্সিলরদের এমন অভিযোগের ভিত্তিতে এক ঠিকাদার বলেন, উত্তর-দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কোন ওয়ার্ডে কী ধরনের উন্নয়ন কাজ রয়েছে তা সিটি কর্পোরেশন থেকে আমাদের পরিকল্পনা দেয়। সেই অনুযায়ী প্রত্যেক ওয়ার্ডে উন্নয়ন কাজ করে থাকি। সেখানে কাজ ফাঁকি দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। তবে কিছু ঠিকাদার থাকতেই পারে যারা নিম্নমানের কাজ করেন। কারণ হচ্ছে সিটি কর্পোরেশন থেকে একজন ঠিকাদারের কাজ পেতে উৎকোচ গুণতে হয়। কাজের উপর ভিত্তি করে উৎকোচের পার্থক্যের তারতম্য হয়। সেখানে কাউন্সিলর প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ চাইলেও ঠিকাদার দিতে পারেন না। এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে তোপখানা রোডের একটি সড়কে উন্নয়ন কাজে। কাজটি খুবই নিম্নমানের দেখার পর ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন আহম্মেদ রতন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে বিষয়টি জানান। ভালোভাবে না করলে কাজ বন্ধ থাকার নির্দেশনা দেন তিনি। এরপর দীর্ঘদিন কাজটি বন্ধ ছিল। পরে এলাকার মানুষের ভোগান্তি দেখে কাউন্সিলর নিজেই ওই ঠিকাদারকে অনুরোধ করেন কাজটি শেষ করার জন্য। এভাবে নিজের অক্ষমতার কথা জানিয়ে কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন আহম্মেদ রতন আমার সংবাদকে বলেন, আমার আসলে কোনো ক্ষমতা নেই। আমি যেটুকু করেছি সেটা দায়িত্ববোধ থেকে। এলাকার মানুষের জনপ্রতিনিধি হিসেবে। কিন্তু আমার যদি কার্যকর ক্ষমতা থাকত তাহলে কিন্তু ওই ঠিকাদার এটি করতে পারত না।
ক্ষমতা কোথায় কমে গেল- জানতে চাইলে রতন বলেন, আগে ঠিকাদারের বিল তুলতে স্থানীয় কাউন্সিলররের স্বাক্ষর লাগত। এতে জবাবদিহি নিশ্চিত হতো। কিন্তু এখন আর ওই নিয়ম নেই। ফলে কাজ বুঝে নিতে ঠিকাদারকে চাপ দেয়ার সুযোগও থাকছে না। অথচ নিম্নমানের কাজ হলে ওয়ার্ডবাসী কাউন্সিলরদেরকে দোষারোপ করেন। সেক্ষেত্রে ঠিকাদারদের বিলে কাউন্সিলরদের স্বাক্ষরের ক্ষমতাটি ফিরে দেওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের একজন চেয়ারম্যানের নিজের এলাকা ডিজিটালাইজ করতে প্রকল্প তৈরি করতে পারেন। বিভিন্ন কমিটির চেয়ারম্যান হতে পারেন এমনকী জমি রেজিস্ট্রি থেকে আর্থিক আয় করেন। কিন্তু কাউন্সিলররা পারেন না। ওয়ার্ডে কোন জরুরি কাজের সংস্কার করতে চাইলে কাউন্সিলরদের কোন আর্থিক ক্ষমতা নেই। এজন্য স্থানীয় প্রশাসনকে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। একদিকে সিটি কর্পোরেশনের সকল কাজ মেয়রকে করতে হয়। অন্যদিকে কাউন্সিলরদের বেকার অবস্থায় থাকতে হয়। সেক্ষেত্রে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া কাউন্সিলররা ওয়ার্ডের লোকজনদের ভাগ্যোন্নয়ন করতে পারবে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৬ সাল পর্যন্ত এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ করার জন্য সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কাউন্সিলররের অনুমতির প্রয়োজন ছিল। কাজের বিল তোলার জন্য স্বাক্ষর লাগত কাউন্সিলরের। কিন্তু বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এই ব্যবস্থাটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এলাকার উন্নয়নমূলক কাজ কারা করছে, কী রকম করছে সে বিষয়ে দেখভাল করতে পারছেন না কাউন্সিলররা। কিন্তু জনপ্রতিনিধি হিসেবে খারাপ কাজের বদনাম তাদের ঘাড়েই চাপছে। জানতে চাইলে ডিএসসিসির ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. হোসেন হায়দার আমার সংবাদকে বলেন, আগে প্রত্যেক ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের স্বাক্ষরে ঠিকাদাররা কাজের বিল তুলতেন। কাজের ভালোমন্দ যাচাইয়েরও সুযোগ ছিল। কিন্তু এখন আর সেই সুযোগ নেই। কারা এলাকায় কাজ করছে সেটিও আমরা জানি না। ফলে কাজের মান যাচাইয়েরও সুযোগ নেই। তিনি বলেন, কাউন্সিলরদের ক্ষমতা বাড়ানো উচিত। কারণ কাউন্সিলররা এলাকার নির্বাচিত প্রতিনিধি। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাদের অনেক দায়িত্ব ও জবাবদিহি থাকে। তাই কাউন্সিলরদের কাছে ঠিকাদারদের কিছুটা হলেও জবাব দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা উচিত। তা না হলে ঠিকাদাররা কাউন্সিলরদের কথা শোনে না। ঠিকাদাররা সরাসরি সিটি কর্পোরেশনের নির্দেশে ওয়ার্ডে উন্নয়ন কাজ করে বিল উত্তোলন করে। ঠিকাদাররা কোন সময় কাজ শুরু করে তাও জানার সুযোগ নেই। ঠিকাদাররা রাতে কাজ শেষ করে চলে যায়, দিনে দেখতে পাই রাস্তায় ঢালাই হয়েছে। কে করছে, কিভাবে করছে তা জানি না। কাউন্সিলরদের স্বাক্ষর ছাড়া ঠিকাদাররা যখন বিল উত্তোলন করতে পারত না তখন ঠিকাদাররা কাউন্সিলরদের অফিসে আসতেন কাজের পরামর্শ করতেন বলে জানান এ কাউন্সিলর। অনুসন্ধানে দেখা গেছে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডে ঠিকাদাররা নিম্নমানের কাজ করেছেন। এ নিয়ে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে কাউন্সিলরদেরকেও।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত