শিরোনাম
হতে পারে আর্থিক দণ্ড

বৈদেশিক মুদ্রাবাজার অস্থিতিশীলে ২৬ ব্যাংক

প্রিন্ট সংস্করণ॥ বিশেষ প্রতিবেদক  |  ০০:৫৩, ডিসেম্বর ০৭, ২০১৭

বৈদেশিক মুদ্রাবাজার অস্থিতিশীল করার পেছনে ২৬ ব্যাংকে চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরই মধ্যে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কারণ দর্শানো নোটিশের জবাবও দিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষরা। কারসাজি করায় ওই সব ব্যাংকের উপর বেজায় ক্ষুব্ধ কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এজন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে শাস্তির আওতায়ও আনা হেতে পারে। যা অর্থ দণ্ডর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার অস্থিতিশীল করার অভিযোগে দুই দফায় ২৬টি ব্যাংককে কারণ দর্শানো নোটিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতমঙ্গলবার ছিল এই শোকজের জবাব দেওয়ার শেষ দিন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ি, গত একমাসে ডলারের বিপরীতে ২ শতাংশের বেশি দর হারিয়েছে বাংলাদেশের টাকা। ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যে ২৬টি ব্যাংককে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার তারা সবাই জবাব দিয়েছে। এখন ব্যাংকগুলোর জবাব পর্যালোচনা করা হচ্ছে। জবাব সন্তোষজনক না হলে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী তাদের বিভিন্ন ধরনের জরিমানা গুনতে হবে। বেসরকারি ব্যাংকের কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে যে কথা বলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ডলার নিয়েছে, কিন্তু ব্যবহার করেছে অন্য কাজে। কোনও কোনও ব্যাংকের প্রয়োজন ছিল না, তবুও এক্সচেঞ্জ হাউজ থেকে ডলার কিনেছে। অনেক ব্যাংক বাজার অস্থিরতার সুযোগ নিয়েছে। মাত্র ১৫ পয়সা লাভ করতে গিয়ে অনেকে ডলারের বাজার অস্থির করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনের তথ্য অনুযায়ী, আমদানি ঋণপত্র নিষ্পত্তি করতে ব্যাংকগুলো ডলারের যে মূল্য ঘোষণা দিচ্ছে, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তার চেয়ে দুই টাকা পর্যন্ত বেশি রাখছে। এতে করে একদিকে বেড়ে গেছে আমদানি ব্যয়, অন্যদিকে ডলার সংকটে অস্থির হয়ে ওঠে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার। টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় রেমিটেন্স ও রফতানি আয়ে কিছু সুবিধা পাওয়া গেলেও আমদানি খাতে খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আমদানি ব্যয় আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেশি হয়েছে। আর অক্টোবর পর্যন্ত প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এ সময়ে রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। এতে বড় অংকের আমদানি ব্যয় মেটাতে ডলারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর অনসাইট ও অফসাইটের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। অফসাইট হলো ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে যে তথ্য সরবরাহ করে তা সঠিক আছে কিনা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বসেই তা যাচাই-বাছাই করা হয়। আর অনসাইট হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ব্যাংকগুলো যে তথ্য সরবরাহ করে সে অনুযায়ী লেনদেন করে কিনা, তা ব্যাংকে গিয়ে সরেজমিনে যাচাই করা হয়। এর আগে গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নরের সভাপতিত্বে উচ্চপর্যায়ে বৈঠকে অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকেই কারসাজির অভিযোগে এবং বাজার অস্থিতিশীল করার দায়ে অভিযুক্ত ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্তের আলোকেই প্রথমে ১৭টি ব্যাংককে শোকজ করা হয়েছে। পরে চলতি সপ্তাহে আরও ৯টি ব্যাংককে শোকজ করা হয়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্য একটি সূত্র বলছে, বাজার অস্থিতিশীল করার দায়ে ৪০টি ব্যাংককে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জানা গেছে, বিদেশি খাতের ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, এইচএসবিসি, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, বেসরকারি খাতের এবি, এনসিসি, ব্যাংক এশিয়া, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, ঢাকা, সাউথইস্ট, মার্কেন্টাইল, ইউসিবিএল, ব্র্যাক, ইস্টার্নসহ ২৬টি ব্যাংকের কাছে কারণ দর্শানোর ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, বাজার অস্থিতিশীল করার পেছনে কয়েকটি ব্যাংক সরাসরি জড়িত রয়েছে। তদন্তে ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে। উল্লেখ্য, ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১০৯ (২) ধারা লঙ্ঘনের দায়ে একটি ব্যাংককে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২২ নভেম্বর একটি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ডলারের দর দিয়েছে ৮১ টাকা ৮০ পয়সা। কিন্তু করপোরেট গ্রাহকদের জিম্মি করে ওই ব্যাংকটি বাজারে বিক্রি করেছে ৮৪ টাকা ৭৫ পয়সায়। আরেকটি ব্যাংক একই দিন ডলার বিক্রি করেছে সাড়ে ৮৪ টাকা করে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে রিপোর্ট দাখিল করেছে ৩ টাকা কমে। আরেকটি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো তথ্যের চেয়ে পৌনে ৪ টাকা বেশি দরে ডলার বিক্রি করেছে। এদিকে বাজার স্বাভাবিক রাখতে প্রতিদিনই ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত সোমবারও (৪ ডিসেম্বর) দেড় কোটি ডলার বাজারে ছাড়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৭১ কোটি ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু এরপরেও বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে না। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক সারাদেশের ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনের ওপর তদন্ত শুরু করে। তদন্তে দেখা যায়, অনেক ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংককে ডলারের এক রকম দর দিচ্ছে, আর বাজারে গ্রাহকদের জিম্মি করে তার চেয়ে বেশি দরে বিক্রি করছে। এভাবে বাজার অস্থিতিশীল করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে একবছর আগে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৭৮ টাকা ৭০ পয়সা। চলতি বছরের ৩১ অক্টোবর ছিল ৮০ টাকা ৮০। মঙ্গলবার প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮২ টাকা ৩০ পয়সা। তবে খোলাবাজারে তা ৮৫ টাকা ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা হলো- কোনোভাবেই ডলারের দাম ৮৩ টাকার বেশি রাখা যাবে না। এরপরও গত একমাস ধরে ডলারের মূল্য নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে অসত্য তথ্য দিয়েছে বিভিন্ন ব্যাংক। এর আগে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ২৯ নভেম্বর জরুরি বৈঠক করেছেন বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের (বাফেদা) নেতারা। বৈঠকে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা আনতে আমদানি পর্যায়ে ডলারের দাম ৮৩ টাকার নিচে রাখতে ব্যাংকগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক কাজী সাইদুর রহমান বলেন, মুদ্রা বাজার স্বাভাবিক রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে নজর রেখেছে এবং চাহিদা অনুযায়ী ডলার ছাড়ছে। ব্যাংকগুলো যাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার কিনে বেশি দামে বিক্রি না করে সেটাও তদারকি করা হচ্ছে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত