শিরোনাম
পাকিস্তানি আহমেদ লাকশাহের গোপন বার্তা ফাঁস

তাবলিগ জামাতের আড়ালে জঙ্গি তৎপরতা!

প্রিন্ট সংস্করণ॥ আব্দুল লতিফ রানা  |  ০০:৩০, নভেম্বর ১৫, ২০১৭

পাকিস্তানের গোপনবার্তা নিয়ে কাকরাইলে তাবলিগ জামাতের দুই গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, হাতাহাতি, সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনাটি পাকিস্তানপন্থিদের জঙ্গি তৎপরতার সূত্রপাত বলে তাবলিগের একাধিক মুরব্বি অভিযোগ করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সংঘর্ষের সময় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় কাকরাইল মসজিদ এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কায় মসজিদের বাইরে ও ভেতরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সূত্র জানায়, তাবলিগ জামাতের অন্যতম সদস্য মাওলানা জুবায়ের সম্প্রতি পাকিস্তান গিয়ে একটি জামাতে অংশ নেন। সেখানে আহমেদ লাকশাহ নামের একজনের সঙ্গে দেখা করেন। আহমেদ লাকশাহ মাওলানা জুবায়েরের কাছে বাংলাদেশের তাবলিগ জামাতের সদস্যদের জন্য একটি বার্তা পাঠান। কিন্তু মাওলানা জুবায়ের বাংলাদেশে এসে সেই বার্তা গোপন রাখেন।
অপরদিকে, কাকরাইল তাবলিগ জামাতের শূরা সদস্যরা অন্য একটি মাধ্যমে পাকিস্তানের আহমেদ লাকশাহর পাঠানো বার্তাটি অন্য মাধ্যমে জানতে পারেন। আর এই বিষয়টি নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সকালে শূরা সদস্যদের বৈঠকের আয়োজন করা হয়। ওই বৈঠকে পাকিস্তানের আহমেদ লাকশাহ পাঠানো বার্তার বিষয়টি আলোচনায় উত্থাপিত হয়। আর তখনই মাওলানা জুবায়ের ও শূরা সদস্য ওয়াসিফুল ইসলামের গ্রুপের মধ্যে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাবলিগ জামাতের এক মুরব্বি জানান, দীর্ঘ ২০ বছর ধরে বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সাদ সাহেব মোনাজাত পরিচালনা করে আসছেন। এ বছর হেফাজতের শফী সাহেবসহ তার লোকজন ভারত ও পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের জঙ্গিপন্থিরা ইন্টারন্যাশনাল তাবলিগের নামে একজন আমির বানিয়ে বিশ্ব ইজতেমায় আনার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। তারই অংশ হিসেবে গতকাল ২ শতাধিক ছাত্র ও ফতুল্লার শীর্ষ সন্ত্রাসী পলাশ এবং বনানীর দিপু ফারুক নামে দুইজন সন্ত্রাসীর নেতৃত্বে তাবলিগের সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয়। এসময় ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। এদের বিরুদ্ধে ফতুল্লাহ ও রাজধানীর বিভিন্ন থানায় অসংখ্য মামলাও রয়েছে বলে জানান তিনি। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, রাজধানীর কাকরাইল মসজিদের তাবলিগ-জামাতের দুই গ্রুপ একে অন্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির অভিযোগ তুলছেন। প্রায় চার বছর ধরে এই বিরোধের জেরে গতকাল মঙ্গলবার তাদের মধ্যে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তাবলিগ জামাতের দিল্লির মারকাজের মুরব্বি মাওলানা সা’দকে ঘিরে দুই পক্ষের এই সংকট তৈরি হয়েছে। এক পক্ষ আগামী ইজতেমায় তাকে বাংলাদেশে আনার পক্ষে, অন্য পক্ষ আসতে দিতে নারাজ। গত সপ্তাহে পাকিস্তানে তাবলিগ-জামাতের আয়োজনে বাংলাদেশের তাবলিগ-জামাতের মজলিশে শূরা সদস্য ও ফায়সাল (আমির) সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম ও হাফেজ মাওলানা জুবায়েরের যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জুবায়ের সেখানে যান। তিনি দেশে ফেরার পর অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতে বললেও জুবায়ের কিছু জানাননি। ফলে তাদের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। তাবলিগ-জামাতের একজন সাথী জানান, গত তিন-চার বছর ধরে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃস্টি হয়েছে।বাংলাদেশ তাবলিগ-জামাত পরিচালনা কমিটির ১১ জন শূরা সদস্য রয়েছেন। তাদের মধ্যে সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম ও হাফেজ মাওলানা জুবায়েরের মধ্যে ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও তুলেছেন। এর আগেও তাবলিগ-জামাতের বিরোধ নিয়ে এই দুই পক্ষের মধ্যে মামলা-পাল্টা মামলা দায়েরের ঘটনাও ঘটেছে। এনিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান তাদের নিয়ে কয়েক দফা বৈঠকও করেছিলেন। অপর সূত্র জানায়, দিল্লির মারকাজের মুরব্বি মাওলানা সা’দকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংকট নিরসনে উলামা মাশায়েখ একাধিকবার পরামর্শ সভা করেছেন। গতকাল রাজধানীর উত্তরার ১৪ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর রোডের আয়েশা মসজিদে এ ইস্যুতে এক বেঠক করা হয়। সেখানে হেফাজতপন্থি আলেমরা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, মাওলানা সা’দকে বাংলাদেশে আসতে দেওয়া হবে না। কাকরাইল মসজিদের মুরব্বিদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি ও জঙ্গিদের সহযোগিতাসহ অভিযোগের সীমা নেই। তাদের বিরুদ্ধে রাজধানীতে সভা-সমাবেশ, সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধনসহ বিশৃঙ্খলার সৃষ্টির ঘটনাও ঘটেছে। আর এসব অভিযোগে গত বছর কাকরাইল মসজিদে রমনা থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাবলিগ জামাতের ২৪ জন গ্রেপ্তার করে। পরে তাদের আদালতে হাজির করলে আদালত কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ২০১৬ সালের ১৯ ডিসেম্বর শুক্রবার কাকরাইল মসজিদ থেকে পুলিশ ৫৪ ধারায় ২৪ জন তাবলিগের সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কাকরাইল মসজিদের তৎকালীন কমিটির বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলে মুসল্লিরা নানা ধরনের প্রচারণা চালায়। আর প্রচারপত্র বিলি করে বিভিন্ন জায়গায় তা ছড়ানোও হয়। এরপর ২০১৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার রাত নয়টার দিকে ওই মুসল্লিরা মসজিদের সামনে তৎকালীন কমিটির বিরুদ্ধে সেøাগান দেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়াসহ হট্টগোল শুরু হয়। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করে। আর গ্রেপ্তারকৃত ২৪ জনকে আটকের প্রতিবাদে অর্ধশতাধিক মুসল্লি রমনা থানার সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রকাশ করেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনার উপ-পুলিশ কমিশনার মারুফ হাসান জানান, তাবলিগের দুই গ্রুপের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির ঘটনা ঘটেছিল। এখন পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত