শিরোনাম

ওয়ান ইলেভেনেও মাথা নত করেননি প্রধান বিচারপতি

প্রিন্ট সংস্করণ॥ নিজস্ব প্রতিবেদক  |  ১০:০৫, অক্টোবর ১২, ২০১৭

অ্যাডভোকেট শ.ম রেজাউল করিম। বঙ্গবন্ধু ও জেল হত্যামামলায় রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম আইনজীবী। ওয়ান ইলেভেনে আইনজীবী ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনারও। এছাড়াও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক তিনি। আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী পিরোজপুর-১ (সদর, নাজিরপুর ও স্বরুপকাঠী) আসনে। প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক আজকের দর্পণেরও। বিশিষ্ট এই আইনজীবী বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন দৈনিক আমার সংবাদ-এর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমার সংবাদ-এর স্টাফ রিপোর্টার নূরে আলম জীবন।

আমার সংবাদ : আপনাকে আমার সংবাদ পত্রিকার পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিায় আপনার পরিকল্পনা কি?
রেজাউল করিম : দৈনিক আমার সংবাদ পরিবারের জন্য শুভ কামনা থাকলো, আমি আশা করি দৈনিক আমার সংবাদ বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে সত্যি সত্যি একটি জাতীয় দৈনিকে পরিণত হলে আমরা খুশি হবো। আইনের শাসনের পূর্ব শর্ত হচ্ছে সবকিছু আইন অনুযায়ী হবে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে রাতারাতি সবকিছু সম্ভব নয়। তবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, যার প্রতিষ্ঠার বয়স ৬৮ বছর। এই দলের আইন সম্পাদকের মতো বড় একটি পদে আমাকে নির্বাচিত করার পর আমি পরিকল্পনা রেখেছি, কোনোভাবেই আইনকে লঙ্ঘন করা বা উপেক্ষা করে নয়, এমন ব্যবস্থাটা রাষ্ট্র যন্ত্র, সরকার, সমাজ, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু হওয়াটা যৌক্তিক। আমি মনে করি, সরকারের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার হতে হবে, আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। আইন যিনি না মানছেন তিন সরকারি কর্মকর্তা হোন, রাজনৈতিক নেতা হোন, প্রভাবশালী ব্যক্তি হোন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আমার পরিকল্পনার মূল কথাটা কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এটাকে কঠোরভাবে প্রয়োগ করার জন্য আমি প্রধানমন্ত্রী, আমার দল এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সোচ্চার ভূমিকা পালন করবো।

আমার সংবাদ : সম্প্রতি প্রধান বিচারপতিকে কেন্দ্র করে জনমনে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে এবং দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি অভিযোগ করছে ‘প্রধান বিচারপতি’কে সরকার চাপ দিয়ে ছুটিতে যেতে বাধ্য করেছে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কি?
রেজাউল করিম : প্রধান বিচারপতিকে চাপ দিয়ে ছুটিতে পাঠানো অবিশ্বাস্য। কারণ বাংলাদেশের মাননীয় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ কুমার সিনহা সেনা সমর্থিত ১/১১ সরকারের আমলে তাকে চাপের মধ্যে রেখে অন্যভাবে কিছু করা যায় কিনা, সে ধরনের একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বঙ্গভবনে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তিনি সেই কঠিন সময়েও তাদের কাছে মাথা নত করেননি। বঙ্গবন্ধু হত্যামামলা, জেল হত্যামামলা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, ত্রয়োদশ সংশোধনীর মামলার মতো গুরুত্বপূর্ণ মামলার মূল রায়টি তার হাতে। যুদ্ধাপরাধীদের রায় দেওয়ার সময় তার গ্রামের বাড়িতে বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল। ঢাকায় তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। অনেকগুলো বড় বড় মামলার রায়ের সময় ভয়ঙ্কর চাপের মুখে তিনি পড়েছিলেন। কিন্তু কোনো চাপকেই কখনও পাত্তা দেননি। বর্তমান আন্দোলন, কোনো দাবি; এ ধরনের কোনো চাপে তিনি ছুটি গ্রহণ করেছেন এটা বিশ্বাসযোগ্য না। আরেকটি বিষয় হলো, বিএনপি বা অন্যরা যে কথা বলছে, তার প্রমাণে কোনো তথ্য-উপাত্ত নেই। প্রধান বিচারপতি অস্ট্রেলিয়ান ভিসা সেন্টারে গিয়ে ভিসার আবেদন করেছেন, ইতোমধ্যে অনেকের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। তিনি মন্দিরে গিয়ে পূজা দিয়ে এসেছেন। অনেকের সঙ্গে তার দেখা হলেও তিনি কারো কাছে অভিযোগ করে বলেননি, তাকে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের, হাইকোর্ট বিভাগ এবং আপিল বিভাগের প্রায় একশ বিচারক আছেন, এর অনেক বিচারক তার ব্যক্তিগতভাবে ঘনিষ্ঠজন। তিনি কারোর কাছেই বলেন নাই যে, আমাকে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। তার পরিবারের আত্মীয় স্বজনরা কোর্ট অঙ্গনের চাকরিতে রয়েছেন, বাইরে রয়েছেন, তারাও কেউ কোনো অভিযোগ করে বলেন নাই তাকে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। তার বাসভবনে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল, অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার জেনারেল, ডেপুটি রেজিস্ট্রার জেনারেলরা যাচ্ছেন, তিনি কাউকে বলেননি আমাকে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি টেলিফোনে আত্মীয়-স্বজন, আপনজনদের সঙ্গে মুক্ত মানুষের মতো কথা বলছেন, কাউকে বলেননি আমাকে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি যে ছুটির আবেদন করেছেন, এ আবেদন নিয়ে কোথাও বলেননি আমাকে দিয়ে জোর করে এ আবেদন করিয়ে নেয়া হয়েছে বরং বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আব্দুল ওহহাব মিঞা প্রকাশ্য আদালতে বলেছেন, বিএনপির অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি নিশ্চিত, মাননীয় প্রধান বিচারপতি তার বাড়িতে আছেন। তিনি কার সঙ্গে দেখা করবেন, কার সঙ্গে দেখা করবেন না এটা কেবল তার বিষয়। এ বিষয়ে কোর্টের আদেশের অবকাশ নেই। আমি মনে করি বিএনপির আন্দোলনের আর কোনো এজেন্ডা না থাকায়, খড়-খুটো ধরেও যেমন তলিয়ে যাওয়া নৌকা বাঁচার চেষ্টা করে, বিএনপি একটা অবাস্তব, কাল্পনিক কাহিনী তুলে কোর্ট অঙ্গনকে উত্তপ্ত করে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে উত্তপ্ত করে ফায়দা হাসিলের একটি অপচেষ্টায় লিপ্ত আছেন।

আমার সংবাদ : আইন ও বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে আপনাদের কি ধরনের পরিকল্পনা আছে?
রেজাউল করিম : আওয়ামী লীগ আইনের শাসনে বিশ্বাস করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সব ক্ষেত্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারছি, একথা বলা যাবে না। বাংলাদেশে যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল ৪৪ বছর পরে এসে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের বিচার করে দেখিয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে বিশ্বের বড় বড় দেশ বাধার সৃষ্টি করেছিল। জনকেরি, বানকি মুনের মতো বড় বড় ব্যক্তিরা বাধার সৃষ্টি করেছিল, সেই বাধাকে কোনো রকম তোয়াক্কা না করে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা যিনি সরকারপ্রধান তিনি বিচারে অগ্রসর হয়েছেন। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যামামলা, জেল হত্যামামলাসহ অনেক বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ মামলায় বিশাল বিশাল প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত থাকার পরও বিচার করেছেন। পক্ষান্তরে লক্ষ করে দেখবেন, বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা, যিনি সেনাপ্রধান ছিলেন, রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন, যিনি তার পার্টির চেয়ারম্যান ছিলেন, তিনি নিষ্ঠুরভাবে হত্যাকান্ডের শিকার হওয়ার পর কিন্তু বিএনপি তার হত্যাকা-ের বিচার করেনি। বেগম খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী ঐ সময় পুলিশ তদন্ত করে বললেন, এই ঘটনায় কারা জড়িত আমরা খুঁজে পাচ্ছি না বলে ফাইনাল রিপোর্ট দিলেন। উচিত ছিল এই ফাইনাল রিপোর্টের বিরুদ্ধে আপিল করা। পুনরায় তদন্ত চাওয়া, যে আরো তদন্ত করতে হবে। ফেরেস্তা এসে বা জিন পরী এসেতো তাকে হত্যা করে নাই। বিএনপি সে ফাইনাল রিপোর্টকে গ্রহণ করেছে। তাদের আমলেই, তাদের প্রতিষ্ঠাতার খুনের বিচারের বিরুদ্ধে রিপোর্ট গ্রহণ করেছে, আওয়ামী লীগ সেটা করেনি। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা, অনেক এমপি আদালতের কাঠগড়ায় এখনো। কেউ কেউ দুর্নীতির মামলার আসামি হয়ে ভোগান্তিতে আছেন, একজন এমপিতো কনভিকসনই হয়েছেন। ক্ষমতাসীন দলের এমপি কনভিকসন হওয়া এটা রেকর্ড। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। মন্ত্রী পরিষদে রয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল কেস পেন্ডিং রয়েছে। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ম্যাসেজ দিতে চায় পুরনো ঢাকার বিশ্বজিৎ’কে হত্যা করা হয়েছিল, অনেকে বলেছিল ছাত্রলীগ নেতাদের বিচার হবে না। কিন্তু সে মামলায় অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতাদের মৃতুদণ্ডাদেশ হয়েছে। এই মামলায় মাধ্যমে ম্যাসেজ দেওয়া হয়েছে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সামগ্রিক অবস্থায় যা কিছু করণীয় আমরা করবো। কিন্তু দীর্ঘদিনের একটা জঞ্জাল, এটাকে রাতারাতি হয়তো দূর করা সম্ভব হবে না। কিন্তু দায়মুক্তির যে সংস্কৃতি, অপরাধ করলেও যে তার কোনো কিছু করা যাবে না এ সংস্কৃতি থেকে আমরা বেরিয়ে আসবো।

আমার সংবাদ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, দলীয় (এমপি-সম্ভাব্য এমপি প্রার্থী) নেতাদের বিরুদ্ধে ততই অভিযোগ বাড়ছে এ বিষয়ে কি বলবেন?
রেজাউল করিম : যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যাবে আগামী নির্বাচনে দল তাদের মনোনয়ন দেবে না। বিতর্কিত, ভাবমূর্তি নষ্ট করা কাউকে আগামীতে মনোনয়ন দেওয়া হবে না।

আমার সংবাদ : আগামী নির্বাচন কীভাবে, কখন অনুষ্ঠিত হবে। সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে কি না? আইনি কোনো প্রতিবন্ধকতা আসার সম্ভাবনা রয়েছে কি না।
রেজাউল করিম : আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি এবং আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে বিশ্বাস করি সকল দল ও মতের মানুষকে নির্বাচনে না নিয়ে এলে নির্বাচন সৌন্দর্যপূর্ণ হয় না। গণতন্ত্র বিকশিত হয় না। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সাংবিধানিকভাবে করা ছাড়া বিকল্প কিছু ছিল না সত্য। কিন্তু ৫ জানুয়ারি নির্বাচন সুন্দর ছিল না। বিতর্কিত নির্বাচন, যতদিন নির্বাচন থাকবে, গণতন্ত্র থাকবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বিতর্ক সামনে আসবে। আমি মনে করি আগামী নির্বাচনে আইনি কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। আগামীতে সকল দলকে নিয়েই একটি সুন্দর নির্বাচন আওয়ামী লীগ করবে। নির্বাচনের সুন্দর পরিবেশ তৈরি করবে আওয়ামী লীগ।

আমার সংবাদ : আপনি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তাকে কীভাবে দেখছেন?
রেজাউল করিম : আমি ব্যক্তিগতভাবে তৃণমূল থেকে উঠে আসা। একাধিকবার কারাগারে যেতে হয়েছে আমাকে। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছি। রাজপথের আন্দোলনে রয়েছি। অনেক রাজনৈতিক নেতাকে আইনি সহায়তা দিয়েছি, এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। আমি মনে করি, আমাকে নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই, আগামীতে দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় তাহলে জয়ী হতে পারব। আমি মনে করি, বাংলাদেশের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ যে উন্নয়ন করেছে তা কখনো হয়নি। কোনো মানুষ এখন না খেয়ে নেই।

আমার সংবাদ : ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে ‘আইন বিভাগে’ আওয়ামী লীগের পরিকল্পনা কী?
রেজাউল করিম : আইন এবং বিচার বিভাগকে ডেভেলপ করাই আওয়ামী লীগের লক্ষ্য। বাংলাদেশের অনেক আইন বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রণয়ন করেছে আওয়ামী লীগ। উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো তথ্য অধিকার আইন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত