শিরোনাম

চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ছে ছাত্রদলের

খালেদা জিয়া দেশে ফিরলেই নতুন কমিটি
জাহিদুল ইসলাম শিহাব  |  ১৬:৩৭, জুলাই ২৯, ২০১৭

বিএনপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। সংগঠনটি বিএনপির আন্দোলন সংগ্রামের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। মেয়াদোত্তীর্ণ এই সংগঠনের নতুন কমিটি গঠন নিয়ে মাথাব্যথা নেই দলের হাইকমান্ড নেতাদের। কমিটি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে দাবি উত্থাপন হলেও এখনও আলোর মুখ দেখেনি প্রত্যাশিত নেতা-কর্মীরা। যে কারণে পুরো সংগঠনেরই চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। কেন্দ্রীয় নেতারাসহ সবপর্যায়ে কেউ কারো নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু এবার দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার লন্ডন সফর ঘিরে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন সংগঠনটির সকলপর্যায়ের নেতাকর্মীরা।

লন্ডনে দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করছেন। ছাত্রদল কমিটি প্রত্যাশিত নেতাকর্মীরা মনে করছেন, বেগম খালেদা জিয়া চিকিৎসার পাশাপাশি সাংগঠনিক অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবেন তারেক রহমানের সাথে শলাপরামর্শ করে। এর মধ্যে ছাত্রদলের কমিটি অন্যতম। ফলে খালেদা জিয়ার লন্ডন সফর ঘিরে উজ্জীবিত হয়ে উঠছেন পদপ্রত্যাশীরা। ইতিমধ্যে দৌড়ঝাঁপও শুরু করেছেন তারা। নিজ নিজ কর্মীদের নিয়ে শো- ডাউন ও লবিয়িং-তদবিরে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন নেতারা। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কাছে ধরনা দিতেও শুরু করেছেন অনেকে।

আবার অনেকে বিগত দিনের আন্দোলন সংগ্রামের ভূমিকার জন্যও আশাবাদী হয়ে উঠছেন। তবে সবকিছু ছাপিয়ে কোট-টাই পরা কিছু ছাত্রনেতা দাপিয়ে বেড়ানোর ঘটনায় সংশয় সৃষ্টি হয়েছে ত্যাগী আর পরীক্ষিত ছাত্রনেতাদের মাঝে। আর এ আশঙ্কা থেকে খালেদা জিয়া লন্ডন যাওয়ার আগেও পদপ্রত্যাশীরা এবং তাদের অনুসারী কর্মীদের নিয়ে দফায় দফায় শো-ডাউন করেন বিএনপির গুলশান কার্যালয়ের সামনে।

এ সময় নতুন কমিটির দাবিতে গুলশানে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বেগম জিয়ার কার্যালয়ের আশপাশের সড়কগুলোয় অবস্থান নেন। নতুন কমিটিতে পদপ্রত্যাশী ও বর্তমান কেন্দ্রীয় নেতা আলমগীর হাসান সোহান, নাজমুল হাসান, আবু আতিক আল-হাসান মিন্টু, আসাদুজ্জামান আসাদ, বায়েজিদ আরেফিন, ইসহাক সরকারসহ অনেকের অনুসারীরা বিক্ষোভ করেন। তারা কমিটির দাবিতে স্লোগান দেন এবং রাজিব আহসান ও আকরামুল হাসানের বিরুদ্ধে কমিটি না দেওয়ার অভিযোগ করা হয়। খালেদা জিয়া কার্যালয়ে প্রবেশের আগ পর্যন্ত তারা বিক্ষোভ করতে থাকেন। বিক্ষোভকালে বিএনপি চেয়ারপারসন গাড়ি থেকে নেতাকর্মীদের দিকে তাকালেও কোনো কথা বলেননি।

এদিকে ছাত্রদলের নতুন কমিটির মূল নেতৃত্বে সিনিয়র না-কি জুনিয়র দিয়ে হবে তা নিয়েও চলছে নানা বিশ্লেষণ। দলের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ জানান, সারাদেশে বিভিন্ন জেলা কমিটি গঠনে অপেক্ষাকৃত জুনিয়রদের এবং কোনো ক্ষেত্রে ২০০০ সালের এসএসসি ব্যাচের ছাত্রদের কাছে নেতৃত্বভার তুলে দিয়ে একটি এসিড টেস্ট করা হয়েছে। বিএনপির হাইকমান্ডের এ পরিকল্পনা অনেক ক্ষেত্রে সফল হলেও বেশিরভাগ জায়গায় ব্যর্থ হয়েছে। নতুন নেতৃত্ব রাজনৈতিক বিচক্ষণতা কিংবা সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারেনি।

এর মধ্যে ছাত্র রাজনীতির প্রাণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব ফ্লপ করেছে। তারা ক্যাম্পাসে নিজেদের অস্তিত্ব তৈরি করতে পারেনি। এসব কারণে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিকে জুনিয়র নেতৃত্ব দিয়ে সাজানো হবে মানতে নারাজ সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ। তারা এবারও মনে করেন, বিগত দিনের পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করে যোগ্য নেতৃত্বের কাছেই সংগঠনের দায়িত্ব তুলে দেয়া হবে। অপরদিকে সাধারণ কর্মীদের মনোভাব-মেয়াদোত্তীর্ণ এই সংগঠনকে গতিশীল করার জন্য যে কোনো ফরম্যাটেই দ্রুত নতুন কমিটি ঘোষণা করবেন বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান।

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজিব আহসান আমার সংবাদকে জানান, ছাত্রদলের কমিটির ব্যাপারে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে দলের বৃহত্তম স্বার্থে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছাত্রদলের কমিটির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিলে আমরা সর্বোচ্চ সাহায্য করব। রাজিব আহসান আরও বলেন, নেতৃত্ব প্রতিযোগিতা সবারই থাকবে। আমি বিদায়ী সভাপতি হিসাবে আমার উচিত সবাইকে সংঘবদ্ধ রাখা। ছাত্রদল নেতাকর্মীরা জানান, দুবছর মেয়াদি ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছরের ১৪ অক্টোবর।

২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর রাজীব আহসানকে সভাপতি ও মো. আকরামুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে ১৫৩ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর ২০১৫ সালের ৬ ফেব্ররুয়ারি ৭৩৪ জন সদস্যকে নিয়ে ওই কমিটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। কিন্তু ২০১৫ সালের সরকার বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির ১৫৩ সদস্যের মধ্যে মাত্র ২০ থেকে ২৫ জন ছাত্রনেতা সক্রিয় ছিলেন। এর বাইরে পদ-পদবিবিহীন অনেক ছাত্রনেতার ভূমিকাও ছিল উল্লেখযোগ্য।

এদিকে ঢাকা কলেজ শাখার ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা জানান, বর্তমান কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই দীর্ঘ তিন মাসের আন্দোলনের মূল নেতৃত্বে চলে আসে এ সংগঠন। বিএনপির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাই আন্দোলনকে টেনে নিয়ে গেছেন। এজন্য চরম মূল্যও দিতে হয়েছে এ সংগঠনের নেতাকর্মীদের। সারাদেশে অসংখ্য নেতাকর্মী নিহত, আহত কিংবা পঙ্গগুত্ব বরণ করেছেন। সেই সাথে গুমের শিকার হয়েছেন অন্তত অর্ধশত নেতাকর্মী। আন্দোলনের ওই ধাক্কার কারণে সংগঠন গোছানোর সময়ও তেমন পাননি।

জেলা ও মহানগর কমিটির মধ্যে অনেকগুলোর কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে আর প্রায় ১২টি জেলা কমিটি বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে সূত্র জানায়। আর ব্যর্থতার তালিকায় কেন্দ্রীয় সংগঠনের নেতৃবৃন্দের কোনো সমন্বয় বেঠক করা হয়নি বিগত দিনে। কমিটি গঠনে সভাপতি আর সাধারণ সম্পাদকের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ছিল। জেলা কমিটি গঠনে বিগত দিনের মতো কেন্দ্রীয় কমিটি দিয়ে কোনো টিম গঠন করা হয়নি। ফলে এ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ অলঙ্কার হিসেবেই অনেকটা শোভা বর্ধন করেছে বিগত দিনে। আবার কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে নেতৃত্বের কমান্ড একেবারে বিলুপ্তের পথে ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠনের।

ছাত্রদল নেতাকর্মীরা জানান, বর্তমান কমিটির সভাপতি রাজিব আহসান মার্জিত এবং বিচক্ষণ নেতা হিসেবে ইতোমধ্যে নেতাকর্মীদের মাঝে আস্থার স্থান করে নিয়েছেন। অনেকের মতো আর্থিক কেলেঙ্কারিসহ অন্যান্য অনৈতিক কাজের সাথে তার নাম উঠে আসেনি। সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান বিগত আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তার যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন। একইভাবে সিনিয়র সহসভাপতি মামুন অর রশিদ মামুনের ক্ষেত্রেও। সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার আন্দোলনের মাঠেই সময় ব্যয় করেছেন।

এছাড়া সংগঠনের শীর্ষ পদ পেতে আলোচনায় এগিয়ে রয়েছেন সহ-সভাপতি আলমগীর হাসান সোহান, ইখতিয়ার রহমান কবির, নাজমুল হাসান, আবু আতিক আল হাসান মিন্টু। সারাদেশের নেতাকর্মীদের কাছে পরিচিত মুখ সহসভাপতি মামুন বিল্লাহ। শক্তিশালী সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে বিগত দিনের আন্দোলন সংগ্রামে কাজ করে যাচ্ছে। আন্দোলন ছাড়াও তিনি দলের জন্য বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে জড়িয়ে নিজের নাম আলোচনায় রেখেছেন। রাজধানীর প্রায় সকল আন্দোলনেই জড়িয়ে রয়েছেন সহসভাপতি। নিজের জীবন বাজি রেখে আন্দোলনের দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান কাজে দক্ষতার ছাপ রেখেছেন। স্পষ্টবাদী এই নেতাও রয়েছেন দলের হাইকমান্ডের সুদৃষ্টিতে।

নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন যুগ্ম সম্পাদক কাজী মোকতার হোসেন। বর্তমান আন্দোলন থেকে শুরু করে যে কোনো মিছিল-মিটিং ও দলীয় সকল কর্মসূচিতে সামনে থেকে অবস্থান নেয়া এ ছাত্রদল নেতা তার সবটুকু সময় উজাড় করে দিয়েছেন দলের প্রয়োজনে। এছাড়া রয়েছেন যুগ্ম সম্পাদক ওমর ফারুক মুন্না। তিনিও কাজ করেছেন নিরলসভাবে। অপরদিকে যুগ্ম সম্পাদকদের মধ্যে নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছেন, প্রথম যুগ্ম সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ। এর বাইরে যুগ্ম সম্পাদক বায়েজিদ আরেফিন, মিজানুর রহমান সোহাগ, সামছুল আলম রানা, করিম সরকার, হাসানুল বান্না, মির্জা ইয়াসিন আলী, মিনহাজুল ইসলাম প্রমুখ সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত