শিরোনাম

সিন্ডিকেটের কব্জায় কুরবানির চামড়া

প্রিন্ট সংস্করণ॥জাহাঙ্গীর আলম  |  ০০:৫৯, আগস্ট ০৯, ২০১৯

প্রতি বছরই সব জিনিসের দাম হু-হু করে বাড়ছে। তবুও কুরবানির কাঁচা চামড়ার দাম বাড়ছে না। সিন্ডিকেটের শক্ত দখলে চলে গেছে। সরকারও কিছু করছে না। এভাবেই গতকাল আমার সংবাদকে কুরবানির চামড়ার দাম না বাড়ার ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেন নড়াইলের ব্যবসায়ী মো. নাজিম উদ্দিন।

শুধু ওই ব্যক্তি নন, ঢাকার মোহাম্মদপুরের মারকাজুল ফিকগ্রিল কুরআনের অধ্যাপক মাওলানা মিজানুর রহমান মেজবা বলেন, বিভিন্ন সময়ে আমরা চামড়ার দাম বাড়ানোর জন্য দাবি করে আসছি। তারপরও বাড়ছে না। সিন্ডিকেটের কব্জায় আটকে গেছে। তাই সব জিনিসের দাম বাড়লেও গরিবের হক চামড়ার ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হচ্ছে না।

তবে চামড়ার দাম বাড়ানো উচিত। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের চুনাখালী আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মো. এন্তাজ উদ্দিনও বলেন, চামড়ার দাম বাড়লে ভালো হতো, গরিব-এতিমের হক এটা। তারা বেশি করে টাকা পেতো। সরকারের ইচ্ছার ওপরে দাম বাড়া-কমা নির্ভর করে। তাই এতটুকু বলব, দাম বাড়লে গরিবের উপকার হবে।

শুধু তারা নন, খোদ বাণিজ্যসচিব মো. মফিজুল ইসলামও বলেন, চামড়াজাত পণ্যের দাম তিনগুণ বাড়লেও পৃথিবীর যেকোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশে চামড়ার দাম কম। আমারও খারাপ লাগে গরিবের হক কম দামে বিক্রি হচ্ছে বলে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারো চামড়ার জন্য ব্যাংক ঋণ দেয়া হচ্ছে। আবার অনেক চেষ্টা করে সাভার ট্যানারি পল্লী পরিপূর্ণভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। তারপরও বাড়ছে না চামড়ার দাম। অথচ ছয় বছর আগে এর দাম দ্বিগুণ বেশি ছিলো।

সার্বিক ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, লোকাল মার্কেটে তেমন চামড়া বিক্রি হয় না। আবার রপ্তানিতে দামও পাচ্ছি না। কারণ বিশ্ববাজারে চামড়ার দাম কম। তাই এবারো কম দামেই চামড়া কেনা হবে।

সিন্ডিকেটের কব্জায় আটকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেকেই অনেক কথা বলবে। এ ব্যাপারে কি বলব। বাস্তবতা হচ্ছে লোকাল মার্কেট নেই চামড়ার। তাই দামও নেই। বে-অ্যাপেক্সসহ বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানির চামড়ার পণ্য অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেটার পরিমাণ কত তা দেখা দরকার।

বাণিজ্যসচিব মো. মফিজুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, বর্তমানে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে কোনো কিছুই ধরে রাখা যায় না। চামড়ার বাজারও এর বাইরে নয়। তাই কাউকে কোনো পণ্য বেশি বা কম দামে বিক্রি করার জন্য বাধ্য করা যাবে না। তবে চামড়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কেউ রপ্তানি করতে চাইলে সেই সুযোগ দেয়া হবে।

সিন্ডিকেটের ব্যাপারে সচিব বলেন, রপ্তানিকারকরা জিম্মি করছে কিনা তা দেখা হচ্ছে। কারণ তারা অনেক কথা বলেছে। তা শুনেই এবারে চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ঢাকায় ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় কেনা হবে।

এছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৩ থেকে ১৫ টাকায় সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে ব্যবসায়ীদের। যা গত বছরও একই দামে কেনা হয়।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চামড়াজাত পণ্যের দাম তিনগুণ বাড়লেও পৃথিবীর যেকোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশে চামড়ার দাম কম। আমারও খারাপ লাগে গরিবের হক কম দামে বিক্রি হচ্ছে। অথচ চামড়াজাত পণ্যের দাম তিনগুণ বাড়ছে। সরকার চামড়া রপ্তানি এবং এ খাতে দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা দিচ্ছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, আমাদের চামড়ার বাজার দিন দিন ছোট হয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদাও কমে গেছে। কিন্তু চামড়াজাত পণ্যের দাম বেড়েছে। কুরবানির চামড়া বিক্রির টাকা কেউ পকেটে করে নিয়ে যায় না। এটা বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসায় দেয়া হয়। আমরা চাইছি চামড়ার দাম বাড়ুক। তবে আমাদের মান বাড়াতে হবে। তাই সবকিছু বিবেচনায় গতবারের দামই নির্ধারণ করা হয়েছে।

ছয় বছরে প্রতি বর্গফুটে চামড়ার দাম কমেছে ৪০ টাকা : দেশে সব ধরনের পণ্যের দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। তারপরও প্রতিনিয়ত কমছে কুরবানির পশুর চামড়ার দাম। গত ছয় বছরে ক্রমান্বয়ে এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ছয় বছর আগে বিক্রি হওয়া ৯০ টাকা বর্গফুট দরের গরুর চামড়া গতবছরের মতো এবারো বিক্রি হবে সর্বোচ্চ ৫০ টাকায়।

সরকার এই দরই নির্ধারণ করে দিয়েছে। ২০১৩ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল সর্বনিম্ন ৮৫ আর সর্বোচ্চ ৯০ টাকা। একইভাবে লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট খাসির চামড়ার দর নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল সর্বনিম্ন ৫০ আর সর্বোচ্চ ৫৫ টাকা।

২০১৪ সালে প্রতি ফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়া ৭০ থেকে ৭৫ টাকা আর ঢাকার বাইরে এ দর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত খাসির চামড়ার দাম ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। ২০১৫ সালে ঢাকায় প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়া ৫০ থেকে ৫৫ ও ঢাকার বাইরে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

এছাড়া প্রতি বর্গফুট খাসির লবণযুক্ত চামড়া ২০ থেকে ২২ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ২০১৬ সালে গরুর লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার প্রতি বর্গফুটের সর্বনিম্ন দাম ছিল ৫০ টাকা। খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

২০১৭ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার নির্ধারিত দাম ছিল ঢাকায় ৫০ থেকে ৫৫ ও ঢাকার বাইরে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। খাসির চামড়ার দাম সারা দেশে প্রতি বর্গফুট ২০ থেকে ২২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

চামড়া কিনতে ব্যাংক ঋণ ৬০৫ কোটি টাকা : ট্যানারি মালিকরা বিভিন্ন দাবি করলে সরকার অন্যান্য বছরের মতো এবারো চামড়া খাতে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। তবে ঋণ সহজে আদায় না হওয়ায় অন্যান্য ব্যাংকের আগ্রহ কম বলে চামড়াশিল্পের স্বার্থে কুরবানির পশুর চামড়া কিনতে এবার ৬০৫ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক।

কুরবানির পশুর চামড়া কিনতে প্রতিবছর স্বল্পমেয়াদি ঋণ দেয় সরকারি সোনালী, জনতা, রূপালী ও অগ্রণী ব্যাংক। চামড়াশিল্পের স্বার্থে কাঁচা চামড়া সংগ্রহে প্রতিবছর ঈদুল আজহার আগে এ ঋণ দেয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী যারা আগের বছরের ঋণ পুরোপুরি শোধ করে শুধু তারাই এ ঋণ পায়।

তবে ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের বিবেচনায় অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণ দিয়ে থাকে। এবারো কাঁচা চামড়া কিনতে জনতা ব্যাংক ১২টি প্রতিষ্ঠানকে ২০০ কোটি টাকা নতুন ঋণ দেবে। যা গত বছর ৩২টি প্রতিষ্ঠানকে ২০৫ কোটি টাকার ঋণ দেয়া হয়েছিল।

গতবার যারা খেলাপি হয়েছে এবার তাদের ঋণ দেয়া হচ্ছে না। তাই ঋণের পরিমাণ কমছে। রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক এ বছর চামড়া কিনতে ঋণ দেবে ২০০ কোটি টাকা। গত বছর ব্যাংকটি এ খাতে ঋণ দিয়েছিল ১৭৫ কোটি টাকা।

তবে বড় হলে সোনালী ব্যাংক এ বছর ৭০ কোটি টাকা ঋণ দেবে। গত বছরও এসব প্রতিষ্ঠানকে চামড়া কিনতে একই পরিমাণ ঋণ দিয়েছিল সোনালী ব্যাংক। চামড়া কিনতে এবার ১৩৫ কোটি টাকা ঋণ দেবে অগ্রণী ব্যাংক।

গত বছর চারটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়েছিল প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, চামড়া কেনার ঋণ মূলত এক বছরের জন্য দিয়ে থাকে। যারা গত বছর টাকা পরিশোধ করেছে তারাই ঋণ পায়। প্রতিবছরই এ লক্ষ্য ঠিক করে।

রপ্তানিতে নেই সাড়া : প্রণোদনা বাড়িয়ে, আধুনিক চামড়াশিল্প নগরী স্থাপন করেও রপ্তানি আয় বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া খাতকে প্রোডাক্ট অব দ্য ইয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্যে এ খাতকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়।

তারপরও গত কয়েক বছর ধরেই এ খাতে রপ্তানি আয়ে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বিপরীতে রপ্তানি আয় ধরা হয়েছিল ১১২ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এর বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ১০২ কোটি ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল ১ হাজার ৮৫ কোটি ডলার।

লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রপ্তানি আয় কমেছে ৯ দশমিক ২৭ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরের তুলনায় কমেছে ৬ শতাংশ। এর মধ্যে চামড়া রপ্তানিতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার। অর্জিত হয়েছে ১৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সাড়ে ১০ শতাংশ কম। চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪ কোটি ডলার। অর্জিত হয়েছে ২৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। ঘাটতি হয়েছে ২৭ শতাংশের বেশি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত