শিরোনাম

শূন্য হাতে ফিরছেন বিনিয়োগকারীরা

প্রিন্ট সংস্করণ॥সঞ্জয় অধিকারী  |  ০১:০৪, জুলাই ১৯, ২০১৯

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের অবসায়নের ফলে চূড়ান্ত ক্ষতির মুখে পড়েছে এই কোম্পানির শেয়ারধারী সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

কোম্পানির আর্থিক হিসাব বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, এই কোম্পানির যে সম্পদ আছে, দায়-দেনা পরিশোধ করে সেখান থেকে শেয়ার হোল্ডাররা কিছুই পাবে না। অর্থাৎ পকেটের টাকা দিয়ে পিপলস লিজিংয়ের শেয়ার কিনে এখন তাদের শূন্য হাতে ফিরতে হচ্ছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্রে জানা গেছে, পিপলস লিজিংয়ে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারে চলতি বছরের ৩১ মার্চ ঋণাত্মক সম্পদ দাঁড়িয়েছে ৬৭.৬৬ টাকায়। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটিতে ১০ টাকার প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে সম্পদ তো নেই-ই, বরং ঋণাত্মক।

এছাড়া কোম্পানিটির এমন কোনো স্থায়ী সম্পদ নেই যার বাজার দর আর্থিক হিসাবে উল্লিখিত দরের চেয়ে বেশি হতে পারে। ফলে ঋণাত্মক সম্পদ ধনাত্মক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একই সঙ্গে শেয়ার হোল্ডারদের প্রাপ্তিরও কোনো সুযোগ নেই।

দেখা গেছে, পিপলস লিজিংয়ের স্থায়ী সম্পদের মধ্যে কোনো জমি নেই। রয়েছে অফিস (ফ্ল্যাট), গাড়ি, কম্পিউটার, টেলিফোন সিস্টেম, এয়ার কুলার, রেফ্রিজারেটর, জেনারেটর, অফিস ইকুইপমেন্ট, আসবাবপত্র, ক্রোকারিজ ও সফটওয়্যার। ১৫ কোটি ১ লাখ টাকা দিয়ে ওইসব সম্পদ কেনা হয়। তবে ওইসব সম্পদ ব্যবহারের ফলে অবচয়জনিত কারণে ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বরে দাম কমে আসে ৭ কোটি ৭ লাখ টাকায়। যা বর্তমানে আরও নিচে নেমে এসেছে।

পিপলস লিজিংয়ে ২৮৫ কোটি ৪৪ লাখ ৫ হাজার ৯৭০ টাকার পরিশোধিত মূলধনে শেয়ার সংখ্যা রয়েছে ২৮ কোটি ৫৪ লাখ ৪০ হাজার ৫৯৭টি। এই শেয়ারের বিপরীতে কোম্পানিটির ঋণাত্মক সম্পদের পরিমাণ ১ হাজার ৯৩১ কোটি ২৯ লাখ টাকা।

২০০৫ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পিপলস লিজিংয়ে মোট শেয়ারের মধ্যে ১৯ কোটি ১৫ লাখ ৩১ হাজার বা ৬৭.১০ শতাংশই রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে।

এ শেয়ারগুলোর সর্বশেষ প্রতিটির বাজার দর ৩ টাকা অনুযায়ী মোট বিনিয়োগ মূল্য ছিল ৫৭ কোটি ৪৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা। তবে অবসায়নের মাধ্যমে এই বিনিয়োগ মূল্য শূন্যতে নেমে আসবে।

কোম্পানিটিতে বাকি শেয়ারের মধ্যে ২৩.২১ শতাংশ উদ্যোক্তা/পরিচালক, ৮.৭৬ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে এবং ০.১৯ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে। ফলে কোম্পানিটির অবসায়নে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের একজন পরিচালক বলেন, এভাবে একটি কোম্পানি পুঁজিবাজার থেকে চলে যাওয়া খুবই দুঃখজনক।

তবে এটাও সত্য যে, দুষ্টু গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো। তাদের যে আর্থিক অবস্থা তাতে করে তাদের পক্ষে আর ব্যবসা চালানো সম্ভব না। আর যেহেতু বিষয়টি আইনগতভাবে হচ্ছে, এ বিষয়ে আর কিছু বলার নেই।

পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, আইনগতভাবে কোনো কোম্পানির অবসায়ন হতেই পারে। সেক্ষেত্রে কোম্পানির যাবতীয় দায়-দেনা পরিশোধ করার পর কিছু থাকলে তবেই বিনিয়োগকারীরা পাবে।

এক্ষেত্রে এই কোম্পানির বিনিয়োগকারীদের দুর্ভাগ্য যে, তাদের কপালে কিছুই জুটছে না। তবে আইনগতভাবে দায় এড়িয়ে গেলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা মানবিকভাবে তাদের দায় এড়াতে পারে না।

বিএসইসির উচিত খুব ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করেই কোনো কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেয়া।

এদিকে, নগদ অর্থ নিয়ে কারবার হলেও পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের হাতে কোনো নগদ অর্থ নেই বলে জানা গেছে।

অবসায়নের পথে থাকা এ কোম্পানিটির হাতে আছে নগদ ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা।যাতে এই মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেয়া সম্ভব না, যদি প্রদত্ত ঋণ আদায় না হয়।

পিপলস লিজিংয়ের চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) সমন্বিত আর্থিক হিসাব বিশ্লেষণে জানা গেছে, কোম্পানিটিতে চলতি বছরের ৩১ মার্চ শেষে ১ হাজার ২৯৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে।

এর বিপরীতে কোম্পানিটিতে গ্রাহকের কাছ থেকে সংগৃহীত আমানত ও ঋণসহ দায় রয়েছে ৩ হাজার ২৫৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকার। এ হিসাবে প্রতিষ্ঠানটিতে সম্পদের চেয়ে ১ হাজার ৯৬১ কোটি ৫১ লাখ টাকার দায় বেশি রয়েছে।

পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের নিজস্ব ব্যবসার পাশাপাশি অধীনস্ত (সাবসিডিয়ারি) ইস্যু ম্যানেজার কোম্পানি পিএলএফএস ইনভেস্টমেন্টেও পুঞ্জিভূত লোকসান রয়েছে।

যাতে সাবসিডিয়ারিতে পিপলস লিজিংয়ের বিনিয়োগ কমে এসেছে। পিপলস লিজিংয়ের ২০১৮ সালের আর্থিক হিসাবের নিরীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

এ নিয়ে নিরীক্ষক কোয়ালিফাইড (আপত্তিকর) মন্তব্য করেছেন। নিরীক্ষক জানিয়েছেন, সাবসিডিয়ারি পিএলএফএস ইনভেস্টমেন্টে পিপলস লিজিংয়ের বিনিয়োগ ২০ কোটি ৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। কিন্তু ওই কোম্পানির ইক্যুইটি ১০ কোটি ৬৭ লাখ ১৬ হাজার টাকায় নেমে এসেছে।

ফলে সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে বিনিয়োগ কমেছে ৯ কোটি ৩৭ লাখ ২৯ হাজার টাকা। এছাড়া ওই বিনিয়োগের বিপরীতে এফআইডি সার্কুলার নং-৬ অনুযায়ী সঞ্চিতিও গঠন করা হয়নি।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ২৬ জুন পিপলস লিজিংয়ের অবসায়নে সরকার সম্মতি দিয়েছে। এ অবসায়নের সিদ্ধান্ত হবে আদালতে। এ জন্য আইনজীবীও নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

পরবর্তীতে ১১ জুলাই কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালনা পর্ষদ। যা ১৪ জুলাই থেকে কার্যকর করা হয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত