শিরোনাম

নিয়ন্ত্রণের বাইরে ডেঙ্গু!

প্রিন্ট সংস্করণ॥ফারুক আলম  |  ০০:৩৩, জুলাই ১৯, ২০১৯

ঢাকায় বৃষ্টিতে জমে থাকা পানি অপসারণে দুই সিটি কর্পোরেশনের কোনো তৎপরতা না থাকায় এডিস মশার প্রজনন বেড়েছে। এতে গত কয়েক বছরে রেকর্ড ছাড়িয়েছে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যা।

ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি উল্লেখ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের কর্মকর্তারা বলছেন, জুলাই মাসে ১৮ দিনে ২ হাজার ৫০৩ জন আক্রান্ত রোগী সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

ইতোমধ্যেই একজন চিকিৎসকসহ ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া প্রতিদিন গড়ে ১৩৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। তবে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। জানা যায়, ২০০০ সালে ৫ হাজার ৫৫১ জন ডেঙ্গু আক্রান্তের মধ্যে ৯৩ জনের মৃত্যু হলে নগরজুড়ে
আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

এতে ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশন মশা নিধনে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়ায় ২০০১ সালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অর্ধেক কমে ২ হাজার ৪৩০ জন এবং মৃত্যু ৪৪ জনে দাঁড়ায়। পরের বছরই সিটি কর্পোরেশন মশা ওষুধ সরবরাহে ভেজাল ও মশা নিধন গাফিলতিতে রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৬ হাজার ২৩২ জন এবং মৃত্যু হয় ৫৮ জনের।

তখন নগরজুড়ে ফের আতঙ্ক বিরাজ করায় সিটি কর্পোরেশন মশার ওষুধ পাল্টিয়ে বিভিন্ন এলাকায় মশা নিধনে ক্র্যাস প্রোগ্রাম শুরু করে। ২০০৩ সালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমে ৪৮৬ জন এবং মৃত্যু ১০ জনে এসে দাঁড়ায়।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৩ বছর ডেঙ্গুতে নগরবাসী খুব বেশি আতঙ্কে না থাকলেও ২০১৬ সালে ৬ হাজার ৬০ জন আক্রান্তে ১৪ জনের মৃত্যু, ২০১৭ সালে ২ হাজার ৭৬৯ জনের মধ্যে ৮ জন, ২০১৮ সালে ৬ হাজার ৪৭৯ জনের মধ্যে ১৬ জন মারা যাওয়ায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করে।

ফের চলতি বছর মশার ওষুধ সরবরাহে সিটি কর্পোরেশনের গাফিলতিতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজে (ঢামেক) প্রতিদিন ১৫০-২০০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন।

ঢামেকেই মার্চে ১৯৭ জন, এপ্রিলে ২২৮ জন, মে মাসে ৩১২ জন এবং জুন মাসে ৩৯২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। সবমিলে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিন শতাধিক ব্যক্তি ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিচ্ছেন।

এবার মশার ওষুধ সরবরাহে ভেজাল পাওয়ায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে উত্তর সিটি কর্পোরেশন।

কিন্তু একই ওষুধ এখনো ব্যবহার করে যাচ্ছে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। তাদের দাবি— ওই ওষুধ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। এতে গত বছরের চেয়ে এবার মশার উপদ্রব বাড়ায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।

ঢামেকের তথ্য মতে, চলতি মাসে প্রতিদিন ১২০-১৫০ জন রোগী ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিতে আসছেন। এতে যাদের অবস্থা গুরুতর তাদেরকে ঢামেকে ভর্তি করা হচ্ছে। এতে ঢামেকের মোট ৭ ওয়ার্ডে দিনে গড়ে ৮০ জনের মতো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আগেভাগেই ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয়েছে। এপ্রিল থেকে জুলাইয়ে ডেঙ্গুজ্বরে মারা গেছেন ১২ জন। এর আগে তিনজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।

গত বছর একই সময়ে মৃত্যু হয়েছিল সাতজনের। আইইডিসিআরের পর্যালোচনাবিষয়ক কমিটির কয়েকজন সদস্য ১২ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তারা বলেছেন, এই সপ্তাহে সুপারিশসহ চূড়ান্ত প্রতিবেদন আইইডিসিআরকে দেবেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) তেজগাঁও, তুরাগ, পল্লবী, মগবাজার, উত্তরা, গুলশান, বনানী, কাফরুল, খিলগাঁও, রামপুরা, মিরপুর, পীরেরবাগ, মোহাম্মদপুর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, বনানী, গুলশান, বারিধারায় সবচেয়ে বেশি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) দয়াগঞ্জ, নারিন্দা, স্বামীবাগ, গেন্ডারিয়াসহ আশপাশের এলাকা, দক্ষিণ মুগদাপাড়া, বাসাবো, মানিকনগর বিশ্বরোড, শেরেবাংলা রোড, হাজারীবাগ, মগবাজার, রমনা, সেগুনবাগিচা, শাহবাগ, হাজারীবাগ, ফরাশগঞ্জ, শ্যামপুর, উত্তর যাত্রাবাড়ীতে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র বেশি।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম আমার সংবাদকে বলেন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া একটি ভাইরাসজনিত জ্বর, যার বাহক এডিস মশা।

এডিস মশা বাসাবাড়ির ভিতরে এবং বাইরে যত্রতত্র পড়ে থাকা বিভিন্ন পাত্র ও অন্যান্য স্থানে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। আমাদের নিজেদের সচেতন হতে হবে। আমরা সচেতন হলে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. শরীফ আহমেদ বলেন, এডিস মশার প্রকোপ কমাতে ইতোমধ্যে সিটি কর্পোরেশন বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ প্রোগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।

জনগণকে সচেতন করতে বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় পানি জমে থাকছে, যা এডিস মশা প্রজননে খুবই সহায়ক। সে জন্য আমরা চেষ্টা করছি পানি যেখানে জমছে, সেগুলো সরানোর।

এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোমিনুর রহমান মামুন বলেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, যা নগরবাসীর মধ্যে একটা ভীতির জন্ম দিয়েছে।

এই ভয়-ভীতি কমিয়ে আনতে ডিএনসিসি প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। আর মশার ওষুধের গুণগতমান নিশ্চিতে কমিটিও গঠন করা হয়েছে। আশা করা যায়, কিছুদিনের মধ্যে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমে আসবে।

ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ায় সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা বলেন, ডেঙ্গু রোগ শনাক্তকরণের বিশেষ সরঞ্জাম বিতরণ করা হয়েছে ঢাকার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে।

রোগীদের সুষ্ঠু চিকিৎসায় সরকারি হাসপাতাল এবং বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত