জাতীয়করণ বঞ্চিত ৪ হাজার বিদ্যালয়

প্রিন্ট সংস্করণ॥রাসেল মাহমুদ  |  ০১:১৭, জুলাই ১২, ২০১৯

প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষে দীর্ঘ আলোচনার পর ২০১২ সালে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

ওই বছরের ২৭ মে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চামেলি হলে এ সংক্রান্ত একটি মিটিংয়ে তিন ধাপে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত হয়।

ওই মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং শিক্ষক প্রতিনিধিরা।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথম ধাপে স্থায়ী নিবন্ধনপ্রাপ্ত বিদ্যালয়, দ্বিতীয়ধাপে অস্থায়ী নিবন্ধনপ্রাপ্ত, পাঠদানের অনুমতি প্রাপ্ত, চালু কমিউনিটি বিদ্যালয় ও সরকারি অর্থানুকুল্যে এনজিও কর্তৃক নির্মিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং তৃতীয় ধাপে ২০১২ সালের ২৪ মের পূর্বে স্থাপিত ও পাঠদানের অনুমতির জন্য আবেদনকৃত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করার কথা ছিলো।

সেই সিদ্ধান্তের আলোকে পরের বছরের ৯ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী ২৬ হাজার ১৯৩টি বিদ্যালয় জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। শিক্ষকদের দাবি, সকল শর্ত পূরণ করলেও সে সময় জাতীয়করণ থেকে বঞ্চিত থেকে যায় চার হাজার ১৫৯টি বিদ্যালয়।

জানা যায়, বঞ্চিত প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত বিদ্যালয় রয়েছে ৩৪টি, অস্থায়ী রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত বিদ্যালয় ২৮৬টি, নন-রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত বিদ্যালয় ৩ হাজার ৩৩২টি এবং মাদারস্কুল বা অন্য বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ৫০৭টি বিদ্যালয়।

এই বিদ্যালয়গুলো স্থাপিত হয় ২০১২ সালের ২৪ মে’র আগে। একই সাথে এ সময়ের পূর্বে পাঠদানের অনুমতির জন্যও আবেদন করে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় উল্লিখিত তৃতীয় ধাপের বিদ্যালয়গুলোর সমপর্যায়ের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও জাতীয়করণ থেকে বঞ্চিত হয়।

এ বিদ্যালয়গুলো ২০০৯ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে আসছে।

বঞ্চিত হওয়ার কারণ হিসেবে শিক্ষকরা বলছেন, বিদ্যালয়গুলো যাচাই-বাছাইয়ের সময় কিছু কর্মকর্তা কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন এবং কিছু কর্মকর্তার অবহেলায় বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণের তালিকাভুক্ত হয়নি।

তবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেন জাতীয়করণ থেকে বঞ্চিত হওয়া বিদ্যালয়ের সংখ্যা এতো বেশি নয় বলে জানিয়েছেন।

তিনি আমার সংবাদকে বলেন, সর্বশেষ ২৬ হাজার ১৯৩টি বিদ্যালয় জাতীয়করণ করার পর আইনি জটিলতাসহ অন্য কারণে সর্বসাকূল্যে ১০০ স্কুল জাতীয়করণের বাইরে থাকতে পারে। শিক্ষকরা যে সংখ্যার কথা বলছেন তা ঠিক নয়।

শিক্ষকরা বলছেন, বঞ্চিত বিদ্যালয়গুলোর যে সংখ্যার কথা আমরা বলছি তা মন গড়া নয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০১৫ সালের ১৭ ফ্রেব্রুয়ারির এক চিঠিতে এ পরিমাণ (৪,১৫৯) বিদ্যালয়ের উল্লেখ রয়েছে।

২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব সরদার মো. কেরামত আলী স্বাক্ষরিত প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো জাতীয়করণের জন্য তৃতীয় ধাপের বিদ্যালয়ের

তথ্য প্রদানসংক্রান্ত ওই চিঠিতে (স্মারক নং-৩৮.০০৭.০১৫.০০০.০৩.০১.২০০৪-৬৫) বলা হয়, ২০১৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্সের ১৩তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৪ হাজার ১৫৯টি বিদ্যালয়ের মধ্যে যে বিদ্যালয়গুলো ২০১২ সাল বা তার আগে সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে সে বিদ্যালয়গুলোর তথ্য জানা প্রয়োজন।

এদিকে এসব বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণের দাবিতে গত কয়েক বছর ধরে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষকরা। আন্দোলনের অংশ হিসেবে গত বছর ১৮ দিন অনশন করেন তারা।

একই দাবিতে চলতি বছরের ১৬ জুন থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান শুরু করেন শিক্ষকরা। বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির ব্যানারে এই কর্মসূচি পালিত হয়।

দাবি আদায়ের জন্য সর্বশেষ গত ৩ জুলাই থেকে আমরণ অনশন শুরু করেছেন শিক্ষকরা। গতকাল বৃহস্পতিবারও তারা অনশন কর্মসূচি পালন করে।

টানা ২৬ দিনের এই আন্দোলনে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ২০৩ জন শিক্ষক। অসুস্থ শিক্ষকদের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন ৩ জন শিক্ষক। তারা হলেন— হারুন অর রশিদ, কিবরিয়া এবং ইব্রাহিম খলিল।

শিক্ষকরা বলছেন, জাতীয়করণকালীন পাঠদানের অনুমতি ও রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম স্থগিত করায় আমরা বেতন-ভাতা সুবিধা ও ছাত্র-ছাত্রী উপবৃত্তি, টিফিন থেকেও বঞ্চিত হচ্ছি। আমাদের দাবিকৃত বিদ্যালয়সমূহ ধারাবাহিকভাবে ২০০৯-২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে আসছে।

এছাড়া ২৬ হাজার ১৯৩টি বিদ্যালয়ের তালিকার বাইরে পার্বত্য অঞ্চলের ইউএনডিপি পরিচালিত ২১০টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধানমন্ত্রী বিশেষ বিবেচনায় জাতীয়করণ করেন। তাদের দাবি— প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী বঞ্চিত এসব বিদ্যালয় অতিদ্রুত জাতীয়করণ করা হোক।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. মামুনুর রশিদ খোকন আমার সংবাদকে বলেন, বঞ্চিত এসব বিদ্যালয় জাতীয়করণের দাবি নিয়ে সরকারের উচ্চ মহলে আমরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।

একই সাথে আমরণ অনশন কর্মসূচিও চলছে। এবার দাবি আদায় না করে অনশন ভাঙবো না।

বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. ফিরোজ উদ্দিন বলেন, আমরা গতকাল (বুধবার) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়েছিলাম।

সেখানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীর কাছে আমাদের দাবিগুলো যথাযথভাবে উপস্থাপন করেছি। কীভাবে এতোসংখ্যক বিদ্যালয় বঞ্চিত হয়েছে তাও আমরা উপস্থাপন করেছি।

এখন তাকিয়ে আছি প্রধানমন্ত্রীর দিকে। তিনি সদয় হলেই আমরা জাতীয়করণের আওতায় আসতে পারবো।

অনশন কর্মসূচিতে অংশ নেয়া নোয়াখালির আবু তাহের মিয়ার বাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোয়াজ্জেম হোসেন হাবিব বলেন, আমার বিদ্যালয় ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত।
শুরুর দিকে কমিটি কিছু টাকা সম্মানি দিতে।

কিন্তু ২০১৩ সালে ২৬ হাজার স্কুল জাতীয়করণ হওয়ার পর কমিটিও আর কোনো টাকা দেয় না। আবার শিক্ষার্থীরাও উপবৃত্তিসহ যাবতীয় সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, জাতীয়করণের দাবিতে গত কয়েকবছর ধরে আন্দোলন করছি। কিন্তু এতে কোনো লাভ হয়নি। বাধ্য হয়ে এ বছর ফের আন্দোলনে নেমেছি।

শিক্ষকতার মহান পেশায় থেকেও সমাজের কাছে প্রতিনিয়ত অবহেলিত হচ্ছি। আমাদের জীবনে আর্থিক অনটন নিত্যদিনের।

আলেয়া খাতুন নামের একজন শিক্ষক বলেন, সন্তান-সংসার নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি। এখন প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আছি।

সংশ্লিষ্টরাতো এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজই নিলো না। বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণ না হলে আমাদের আত্মহত্যা করা ছাড়া উপায় থাকবে না।