শিরোনাম
দুধের মান নির্ণয়ে মতের ভিন্নতা

অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পরীক্ষা করে না বিএসটিআই

প্রিন্ট সংস্করণ॥ মাহমুদুল হাসান  |  ০১:০১, জুলাই ১২, ২০১৯

পাস্তুরিত দুধ নিয়ে বিভ্রান্ত ভোক্তারা। বাজারে প্রচলিত এসব দুধ ভেজাল নাকি নিরাপদ— এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, দেশের বাজারে প্রচলিত পাস্তুরিত দুধে অ্যান্টিবায়োটিক ও ডিটারজেন্টের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক বলেছেন, দেশে খামারিদের উৎপাদিত দুধে ভয়াবহ ধরনের কিছু নেই।

এটা সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং সবাই তরল দুধ ও পাস্তুরিত দুধ পান করতে পারবেন।

এদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএসটিআই পাস্তুরিত দুধে অ্যান্টিবায়োটিক রয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করে না।

গবেষণা প্রতিবেদনের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদল অনড়। যথাযথ পন্থায় গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ না করার অপরাধে ঢাবির গবেষকদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় আইনিব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণাও দিয়েছে।

এদিকে চৌদ্দটি কোম্পানির পাস্তুরিত দুধে আশঙ্কাজনক বা ক্ষতিকর কোনো কিছুই পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে বিএসটিআইর দেয়া প্রতিবেদনে আদালত সন্তোষ প্রকাশ করেছে বলে বিএসটিআইর আইনজীবীর বক্তব্যে আদালত গত মঙ্গলবার অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

এ বক্তব্যের কারণে বিএসটিআইর আইনজীবীকে তিরস্কার করেছে আদালত। একইসঙ্গে আদালতের আদেশ ছাড়া দুধ নিয়ে কোনো বিভ্রান্তিকর তথ্য ও বিজ্ঞাপন প্রচার না করতে মৌখিকভাবে নির্দেশ দিয়েছে।

বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের হাইকোর্ট সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ আগামী ১৪ জুলাই পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছে।

এখন জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে দুধে রাসায়নিকের উপস্থিতি মানবদেহের জন্য কতটা নিরাপদ!

শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, দুধের মতো পুষ্টিকর খাবারে অ্যান্টিবায়োটিক ও ডিটারজেন্টের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি থাকলে মানদেহের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দেবে।

কারণ পুষ্টির চাহিদা মেটাতে আমরা দুধের ওপর নির্ভরশীল। আর সেই দুধে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে শিশুদের।

দুধে রাসায়নিকের উপস্থিতি শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করবে।

জাতীয় ডেইরি উন্নয়ন ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, দেশে পাস্তুরিত তরল দুধের প্রায় ৭০ শতাংশ বিপণন করে দুধ ও দুগ্ধজাতপণ্য উৎপাদনকারী শীর্ষস্থানীয় চার প্রতিষ্ঠান— মিল্ক ভিটা, আড়ং, প্রাণ ডেইরি ও আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ।

গত মাসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত চার প্রতিষ্ঠান মিলে প্রতিদিন গড়ে ৪ লাখ ২৫ হাজার লিটার দুধ বিক্রি করেছে।

গত ২৫ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টার ও ফার্মেসি অনুষদের প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে দেশের শীর্ষস্থানীয় পাঁচ কোম্পানির সাত ধরনের পাস্তুরিত দুধের নমুনায় অ্যান্টিবায়োটিক ও তিন ধরনের দুধে ডিটারজেন্টের উপস্থিতির কথা জানানো হয়।

তারপর চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে তা ২ লাখ ৮৫ হাজার ৫০০ লিটারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে এ চার প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত দুধ বিক্রি কমেছে দৈনিক ৩৯ হাজার ৫০০ লিটার বা ৩৩ শতাংশ। প্রায় একই হারে কমেছে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের দুধ বিক্রিও।

পাস্তুরিত দুধ নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিস রিসার্চ, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বাজারে থাকা ৭৫ শতাংশ পাস্তুরিত দুধেই ভেজাল ধরা পড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি।

এই প্রতিবেদন যুক্ত করে রিট আবেদন করেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী তানভীর আহমেদ। এ রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে গত বছর ২১ মে বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের নিয়ে কমিটি করে বাজারে থাকা পাস্তুরিত দুধ পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট।

খাদ্য ও স্বাস্থ্য সচিব এবং বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালককে দেয়া এই নির্দেশের পর গত ২৫ জুন বিএসটিআইয়ের আইনজীবী ব্যারিস্টার সরকার এমআর হাসান আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ আগামী ১৪ জুলাই পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছে।

পাস্তুরিত দুধ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতিবেদনের সমালোচনা করে মঙ্গলবার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন বলেন, দেশের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পাস্তুরিত দুধে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতির কথা জানিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করায় ওই গবেষকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তার মতে, এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশে প্রটোকল মানা হয়নি।

রিসার্চের ফলাফল অবশ্যই পিয়ার রিভিউড জার্নালে প্রকাশ করতে হবে। তারা দেখবে এই নমুনা সারা দেশকে কাভার করে কিনা, গবেষণার পন্থা ঠিক আছে কিনা— এসব নিরীক্ষা করবে।

স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে ফল ব্রিফ করতে হয়। তারপর এমন গবেষণা প্রকাশ করতে হয়।

পিয়ার রিভিউড জার্নালে যদি প্রকাশ করে থাকেন তাহলে অবশ্যই আগামী সাত দিনের মধ্যে তা মন্ত্রণালয়ে হাজির করুন। যদি না করেন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আপনাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ডেইরিশিল্প একটা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, একটি উদীয়মান শিল্প এটি। এই শিল্পকে যদি কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত করে দেওয়া যায় তাহলে গুঁড়ো দুধের যেমন বাজার সৃষ্টি হয়েছে এই দেশে তেমনি তরল দুধের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন দেশের বাজার তৈরি হবে।

সেজন্য দেশি ডেইরিশিল্পের অব্যাহত গতি থামিয়ে দেওয়ার জন্য দেশি-বিদেশি চক্রান্ত চলছে। একজন গবেষক দুগ্ধশিল্প নিয়ে একটা গবেষণা করে ছেড়ে দিলেন মিডিয়ায়। ওনার কি এজেন্ডা আছে এর পেছনে, উনি কি এ ধরনের কাজ করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত?

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টার ও ফার্মেসি অনুষদের শিক্ষক ও গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক আ ব ম ফারুক আমার সংবাদকে বলেন, আমরা এ গবেষণা জনস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে করেছি।

কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিষোদ্গার কিংবা অন্যকোনো উদ্দেশ্য থেকে এ গবেষণা করা হয়নি। এমন কি আমাদের ৯ সদস্যের গবেষকদলের কেউ কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্তও নন।

পিআর রিভিউ জার্নালে প্রকাশ করা হয়েছে কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পিআর রিভিউ জার্নালে প্রকাশের জন্য আমরা কাজ করছি। আমরা আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ করে এ গবেষণা করেছি। তবে পিআর রিভিউ জার্নালে প্রকাশ হতে ৬ মাস থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়।

জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় জেনেও কি এতদিন অপেক্ষা করার কোনো যৌক্তিকতা আছে? আমরা জনস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে এতদিন অপেক্ষা করতে পারি না।

অপেক্ষা করাটা এক ধরনের অন্যায় হবে। তাই প্রকাশ করেছি। আর পিআর রিভিউ জার্নালে প্রকাশ হলে দেশের সাধারণ মানুষ কিংবা সরকার জানতে পারে না।

কারণ ঐ জার্নাল শুধু বিজ্ঞানীরা পড়ে। তাই দায়িত্ববোধ থেকে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছি। বিএসটিআইর মান পরীক্ষায় অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয় না।

তাই তাদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে আমাদের এ কার্যক্রম ছিলো বলতে পারেন। তবে মন্ত্রণালয়ে আমরা সাত দিনের মধ্যে জবাব দেবো এবং পিআর রিভিউ জার্নালেও প্রকাশ করবো। সে প্রস্তুতিও আমাদের রয়েছে।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশনের (বিএসটিআই) পরিচালক (মান) মো. সাজ্জাদুল বারী আমার সংবাদকে বলেন, আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের গবেষণা প্রতিবেদন দেখেছি এবং আমলে নিয়েছি।

আমাদের প্রতিষ্ঠানে তরল দুধে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি নির্ণয় করা হয় না বলে আমরা মান পরীক্ষায় সেটা তুলে ধরতে পারিনি।

পরবর্তী মান পরীক্ষায় এ বিষয়টি তুলে ধরা হতে পারে। চলতি মাসেই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কমিটির বৈঠক আছে। তখন এ বিষয়ে পরিষ্কার বলা যাবে।

শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এমএ মান্নান আমার সংবাদকে বলেন, শুধু দুধ নয়, খাদ্যদ্রব্যে যেকোনো ধরনের রাসায়নিকের উপস্থিতিই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

তবে বেশি ক্ষতি হয় শিশুদের। কারণ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের এই সময়ে ভেজাল ও ক্ষতিকর খাদ্য তাদের স্বাভাবিক বিকাশকে ব্যাহত করে।

তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের খেয়াল রাখতে হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত