শিরোনাম

প্রস্তুত নৌকাবিরোধী মন্ত্রী এমপিদের আমলনামা

প্রিন্ট সংস্করণ॥রফিকুল ইসলাম  |  ০৯:৩৪, জুলাই ১০, ২০১৯

পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকার বিরোধিতা করার পর এবার স্থানীয় মন্ত্রী-এমপিরা তৃণমূলের সম্মেলনেও আওয়ামী লীগের বিরোধিতা শুরু করেছেন।

ওই সাংসদদের বিরুদ্ধে নিজ বলয় ভারী করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে ত্যাগী ও পরিশ্রমী নেতাদের বাদ দিয়ে নিজ আত্মীয়স্বজনকেন্দ্রিক কমিটি তৈরি করার অভিযোগ উঠেছে। এদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে আওয়ামী লীগের হাই-কমান্ড।

ক্ষমতাসীন দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সাংগঠনিক সফর শেষে তৈরি করা হয়েছে মন্ত্রী-এমপিদের আমলনামা।

আগামী শুক্রবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তুলে ধরা হবে। ওই সভায় দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গকারীদের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত আসবে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

তথ্যমতে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরষ্কুশ বিজয় অর্জনের মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে দেশের আ.লীগ মনোনীত ১৪৩টি উপজেলায় নৌকার প্রার্থীরা হেরে যায়। অনেকটা একতরফা এই নির্বাচনেও বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে পরাজিত হয়েছেন।

বিএনপিসহ সরকারবিরোধী দলগুলো এবার ভোটের মাঠে ছিল না। মূলত স্থানীয় সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতাদের ক্ষমতার দাপটেই ওইসব উপজেলায় হেরেছে নৌকার প্রার্থীরা।

বিএনপির বর্জনের কারণে উপজেলা নির্বাচনকে জমজমাট করতে এবার নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর পাশাপাশি দলের অন্যদেরও প্রার্থিতার সুযোগ তৈরি করে দেয় আ.লীগ।

কেন্দ্রীয় এমন সিদ্ধান্ত থাকলেও পক্ষপাতিত্ব শুরু করে এমপি-মন্ত্রীরা। কোনো কোনো মন্ত্রী-এমপি নৌকার বিরোধিতা করে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে সরাসরি প্রচারণায় শামিল হন।

তৃণমূল সূত্রে, কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগেই জেলা-উপজেলার মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোর সম্মেলন করতে চায় আওয়ামী লীগ।

মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোর নির্দিষ্ট সময়ে সম্মেলন করার জন্য তৃণমূল নেতাকর্মীদের চিঠিও দিয়েছে ক্ষমতাসীন দলটি। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা পেয়ে কমিটি গঠনের কাজ শুরু করেছেন দলটির তৃণমূলের নেতারা।

কিন্তু উপজেলা নির্বাচনের মতোই জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডের সম্মেলনেও তৃণমূলের নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে স্থানীয় সাংসদ ও সাংসদপন্থি নেতারা। ওই সাংসদরা নিজ বলয় ভারী করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে ত্যাগী ও পরিশ্রমী নেতাদের বাদ দিয়ে নিজ আত্মীয়স্বজনকেন্দ্রিক কমিটি তৈরি করছে।

তবে এবার নৌকা ও আওয়ামী লীগবিরোধিতাকারী ওইসব সাংসদ ও সাংসদপন্থি নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড।

আ.লীগ সূত্রে, দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও জাতীয় সম্মেলনসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আগামী শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে দলের কন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভা করবেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

অনুষ্ঠিত ওই সভায় আ.লীগের নৌকাবিরোধী মন্ত্রী-এমপি এবং দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে দলটির সভানেত্রী। মূলত বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তী এবং আগামী অক্টোবরে জাতীয় সম্মেলনের আগেই দল ও দলের ভিতরে সকল অন্তর্কলহ দূর করতে চান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সূত্র আরও জানায়, প্রথমে নমনীয়তা দেখালেও ওই স্থান থেকে এবার সরে আসবেন সভানেত্রীসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। দলের বিদ্রোহীদের বহিষ্কার, তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে না রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে পারে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এছাড়াও আগামী জাতীয় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোতে নতুন করে কাউন্সিল সম্পন্ন করতে বিশেষ দিক নির্দেশনা দেবেন শেখ হাসিনা।

আ.লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অনেক সাংসদ নিজের স্বার্থের জন্য নৌকার বিরোধিতা করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে আ.লীগ কঠোর ব্যবস্থা নেবে।

নৌকাবিরোধী মন্ত্রী-এমপিদের বিষয়ে জানতে চাইলে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক আমার সংবাদকে বলেন, তৃণমূলে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোর সম্মেলন করতে ইতোমধ্যে আমরা দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংগঠনিক সফর করেছি।

সেখানো দেখেছি একটি নৌকাবিরোধীচক্র ত্যাগী ও পরিশ্রমী কর্মীকে দল থেকে বাদ দেওয়ার জন্য চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে সম্পাদকমণ্ডলীর সভায় আলোচনা করেছি। এসব নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তিনি বলেন, যে নৌকা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নৌকা, যে নৌকা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির নৌকা, সে নৌকার বিরোধিতা করে কোনো নেতা পার পাবে না। নৌকার বিরোধিতা করার জন্য তাদের সবার সাজা ভোগ করতে হবে।

তথ্যমতে, চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সাংসদ আলী আজগর টগরের বিরুদ্ধে দলীয় নির্দেশনা অমান্য করার ঘটনা অহরহর। তিনি দায়িত্বে আসার পর থেকেই কেন্দ্রীয় নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন। সম্প্রতি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকার প্রতিপক্ষ হিসেবে অগ্নিরূপ ধারণ করেন সাংসদ।

নৌকার প্রার্থী মনোপুত না হওয়ায় দামুড়হুদা উপজেলায় বিদ্রোহী প্রার্থী করেন আপন ছোটভাই দর্শনা পৌর আ.লীগের দপ্তর সম্পাদক আলী মনসুরকে। নির্বাচনে নৌকার বিপক্ষে ভিন্নপন্থিদের একত্রিত করে সাংসদের দাপটে গোটা নির্বাচনি এলাকায় একক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেন এবং নির্বাচনের ফলাফল ছিনিয়ে নেন।

একই অবস্থা পার্শ্ববর্তী জীবননগর উপজেলায়। ওই উপজেলায় নৌকার প্রার্থীর বিপক্ষে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেন। দুটি উপজেলাতেই শোচনীয় পরাজয় হয়। শুধু চুয়াডাঙ্গা নয়, দেশের প্রায় শতাধিক নৌকার প্রতিপক্ষ ছিলেন স্থানীয় সাংসদ।

এরমধ্যে রয়েছেন— গাজীপুরের সিনিয়র মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে গাজী গোলাম দস্তগীর (বীরপ্রতীক), নাটোরের প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, সংসদ সদস্য অধ্যাপক আবদুল কুদ্দুস ও সংসদ সদস্য শহীদুল ইসলাম বকুল, কুমিল্লা-২ আসনের এমপি সেলিমা আহমাদ মেরী, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া-৫ আসনের এবাদুল করিম বুলবুল, টাঙ্গাইল-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসান ইমাম খান সোহেল হাজারী, ময়মনসিংহ-৯ আসনের আনোয়ারুল আবেদীন খান তুহিন, মুন্সীগঞ্জ সদরে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ড. আজিজ, সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এমপি, ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলসহ আরও অনেক এমপি-মন্ত্রী রয়েছেন।

আগামী শুক্রবার এই সকল মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে জানা গেছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত