শিরোনাম

অপরিকল্পিত কনস্ট্রাকশন ডেঙ্গুর কারখানা

প্রিন্ট সংস্করণ॥মাহমুদুল হাসান  |  ০০:৪৮, জুলাই ১০, ২০১৯

রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে। আক্রান্তদের মিছিল প্রতিনিয়ত লম্বা হচ্ছে। উন্নত চিকিৎসার আশায় সারা দেশ থেকেই রোগীরা ঢাকায় ভিড় করছেন।

ফলে রাজধানীর চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় ২১শজন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হবার খবর পাওয়া গেছে।

শুধু জুন মাসে ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৭১৩ জন। যা গত তিন বছরের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।

জুলাই মাসের প্রথম চারদিনে রাজধানীতে আক্রান্ত হয়েছে ৩৫৮ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার তথ্যমতে, চলতি বছর একজন চিকিৎসকসহ এ পর্যন্ত তিনজন মারা গেছেন।

এপ্রিল মাসে আক্রান্ত দুজন রোগী মারা যান। তাদের একজনের বয়স ৫৩ বছর। তিনি রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৫ এপ্রিল মারা যান।

আরেকজনের বয়স ৩২ বছর। তিনি ২৮ এপ্রিল মারা যান। সর্বশেষ ২ জুলাই ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক চিকিৎসকের মৃতু্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীতে এবছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ রাজধানীর অধিকাংশ রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি হচ্ছে। অসংখ্য ভবন নির্মাণকাজ চলছে।

এসব সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্প এলাকায় জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা বেশি জন্মাচ্ছে। ছাদ বাগানের টব, সৌন্দর্য্য বর্ধনের জন্য সড়কের ডিভাইডারেও লাগানো গাছের টবে জমে থাকা পানিতে ব্যাপকভাবে এডিস মশা লার্ভা ছড়াচ্ছে।

অথচ এসব কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়মিত মনিটরিং আর মশকনিবারণী ওষুধ ছিটানো হচ্ছে না বলে ডেঙ্গু আক্রান্ত হবার ঝুঁকিও কমছে না।

প্রশিক্ষিত জনবল কাজে লাগিয়ে ডেঙ্গু শনাক্ত করে উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করা না গেলে আক্রান্তদের মধ্যে শতকরা ২০ জনের মৃত্যু ঝুঁকি থাকে।

দ্রুত শনাক্ত ও প্রশিক্ষিত জনবল দিয়ে চিকিৎসা করা গেলে মৃত্যুঝুঁকি ১ ভাগেরও নিচে নেমে আসে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। আক্রান্তদের নিয়ে বিলম্ব না করে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

যদিও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোন বলছেন, ডেঙ্গু এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা জানিয়েছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে মশার প্রজনন দ্রুত হয়। মশার সংক্রমণ হওয়ার জন্য যে ইউকিউবিশন সময় প্রয়োজন হয় তা কমে যায়।

আগে যেসব জায়গায় মশা থাকতে পারত না তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সেসব জায়গাতে অবস্থান করতে পারে।

বিশেষ করে বৃষ্টির পানি ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন পাত্রে জমিয়ে রাখার কারণে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার প্রজনন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সরেজমিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, নতুন ভবনের ৬০২ নাম্বার ওয়ার্ডে গত রোববার ৯৬ জন ভর্তি হয়েছে।

বাড়তি রোগীর চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। অতিরিক্ত রোগীর যায়গা হয়েছে ওয়ার্ডের মেঝে কিংবা বারান্দার খোলা যায়গায়।

রাজধানীর পান্থপথের বাসিন্দা শ্যামলের সঙ্গে কথা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৬ষ্ঠ তলায়।

গত দুদিন আগে ছোটভাই অনিককে ডেঙ্গু আক্রান্ত অবস্থায় ভর্তি করেন। বাড়তি লোকের চাপের কারণে সিট না পাওয়ায় আক্ষেপের সঙ্গে চিকিৎসা সেবার মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

তিনি বলেন, অসুস্থ মানুষ ফ্লোরে থাকলে সুস্থ হবে কি করে। পান্থপথের কাঠালবাগান এলাকায় নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানো হয় না বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি।

এদিকে গত মঙ্গলবার মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে উচ্চ আদালত ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদ্বয়কে নির্দেশ দিয়েছেন।

বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ তাদের এ নির্দেশ দেন।

তারা এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং তার কার্যকারিতা কী! সে বিষয়ে আগামী ১৭ জুলাই প্রতিবেদন হিসেবে আদালতে পেশ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

সাধারণত এপ্রিল-জুন মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে। এরপর ডেঙ্গুর প্রকোপ কমতে থাকে।

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক অধ্যাপক ডা. রাজিবুল আলম আমার সংবাদকে বলেন, রাজধানীজুড়ে এখন খোঁড়াখুঁড়ি চলছে।

আবার সেরকারি উদ্যোগে ভবন নির্মাণের হিড়িক। বর্ষা মৌসুমে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে গিয়ে বিভিন্ন যায়গায় পানি জমে থাকে।

কিন্তু সেসব দেখার জন্য তেমন প্রচারণা কিংবা সচেতনতা নেই। ফলে এডিস মশা তার লার্ভা ছড়িয়ে দিচ্ছে নগরীজুড়ে।

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এখন ডাক্তার কদম আলীর ভূমিকায়। ডাক্তার কদম আলীর ওষুধে যেমন রোগ ভালোও হয় না, রোগীও মরে না।

সিটি কর্পোরেশন যে ওষুধ ছিটায় তা ভেজাল, মানহীন ও অকার্যকর। ফলে মশাও মরে না, তাদের বংশবিস্তারও রোধ হয় না।

এসব কারণেই রাজধানীতে এখন ডেঙ্গু ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ভেজাল ওষুধ কেনার অভিযোগতো অনেক আগের।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখন সবচেয়ে বড় উদ্যোগ নিতে হবে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের মেয়রদ্বয়কে।

নগরবাসীর মাঝে সচেতনতা আর নিয়মিত মানসম্মত ওষুধ ছিটালে ডেঙ্গু থেকে মুক্তি মিলবে।

আক্রান্তদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে ঘাবড়ে যাবেন না। অতিরিক্ত জ্বর এলে কালবিলম্ব না করে চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হতে হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত