শিরোনাম

ইফা ডিজি গায়েব করতে চেয়েছিলেন দুর্নীতির নথি

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল লতিফ রানা  |  ০০:৪৪, জুন ২০, ২০১৯

দুর্নীতির অভিযোগ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক শামীম মোহাম্মদ আফজাল। দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়েই মহাপরিচালকের পদ থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে বলে সংশ্লিস্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

তার দুর্নীতির অভিযোগগুলো মধ্যে— মৌখিক নির্দেশে সরকারি চাকরি প্রদান, মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা প্রকল্পে নিয়োগপত্র ছাড়াই বছরের পর বছর কাজ করেন ৩৮ কর্মকর্তা, মৌখিক নির্দেশে মোটরসাইকেল ব্যবহার, তাদের স্বাক্ষরেই ব্যাংক থেকে তোলা হয় প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা।

সেই সাথে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অর্থ আত্মসাৎ, গণশিক্ষা কার্যক্রম কল্পের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ভাতা হিসেবে প্রকল্পে রাখা সোয়া কোটি টাকা শিক্ষকদের না দিয়ে তা আত্মসাতের অভিযোগ।

শুধু তাই নয়, ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক পদে নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি সরকারি খরচে ভারত, পাকিস্তান, মিসর, সৌদি আবর, তুরস্ক, ইটালি, জার্মানি, জর্ডান, ইরাক, মালয়েশিয়া, আরব-আমিরাত, ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে সফর করেছেন।

জানা গেছে, ইফার ডিজি শামীম মোহাম্মদ আফজাল ৫০টি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল গায়েব করতে ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছিলেন। লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, এমন তথ্য সাংবাদিকদের জানিয়েছেন ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ।

এসব ফাইল ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আটক করার তথ্য জানিয়ে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মন্তব্য করে সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, তার দ্রুত পদত্যাগ করা উচিত।গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানান তিনি।

সূত্র জানায়, গত শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (ইফা) মহাপরিচালক শামীম মোহাম্মদ আফজাল তার অফিসে এসে নিজ দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করার কথা জানিয়েছিলেন। এর পরদিন তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনে গিয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ৫০টি ফাইল লুকিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

এসময় ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তা আটকে দেন। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখ্য সচিবকে জানানো হলে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে কঠোরভাবে জানিয়ে দেয়া হয়, কোনোভাবেই তিনি (শামীম মো. আফজাল) কোনো ফাইল সরাতে না পারেন।’ ফলে এখন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজির (মহাপরিচালক) দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।

ইফার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ছুটির দিনে গুরুত্বপূর্ণ নথি সরাতে গিয়ে তোপের মুখে পড়েন শামীম মোহাম্মদ আফজাল। একপর্যায়ে নিজ কার্যালয়ে তাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পরে কৌশলে সেখান থেকে বের হয়ে যেতে সক্ষম হন তিনি। সম্প্রতি ছুটির দিনে ফাউন্ডেশনের তার কক্ষ থেকে অফিসের প্রয়োজনীয় কিছু নথি নিয়ে যেতে চান মহাপরিচালক। তখন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাধায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি।

পরে কিছু না নিয়েই দ্রুত কার্যালয় ত্যাগ করেন। নানা দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে মন্ত্রণালয় তাকে সরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ধর্ম মন্ত্রণালয় তাকে শোকজ করার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই তিনি পদত্যাগ করছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে।

ইফার মহাপরিচালক শামীম আফজাল রাতের আধারে জাতীয় মসজিদের পিলার অপসারণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতিসহ নানা অপকর্মের মূল হোতা। এর আগে ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় ধর্ম মন্ত্রণালয়। শুধু তাই নয়, তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে কেন অবহিত করা হবে না তা সাত কার্যদিবসের মধ্যে ধর্ম মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদ মার্কেট বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ মহিউদ্দিন মজুমদারকে ইফা ডিজি সমপ্রতি সাময়িকভাবে বরখাস্তের আদেশকে কেন্দ্র করে এই শোকজের ঘটনা ঘটে। একই চিঠিতে ওই কর্মকর্তার সাময়িক বরখাস্তকে বেআইনি, ক্ষমতাবহির্ভূত, অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, স্বেচ্ছাচারী ও অকার্যকর আখ্যায়িত করে ওই সাময়িক বরখাস্তের আদেশটি বাতিল করা হয়।

আবার মসজিদের একটি পিলার এক আওয়ামী লীগ নেতা কর্তৃক অপসারণের ঘটনা প্রকাশ এবং এ ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করার কারণে ক্ষুব্ধ ইফা ডিজি মহিউদ্দিন মজুমদারকে পুরনো কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই তড়িঘড়ি করে গত ৩০ মে সাময়িক বরখাস্ত করেন।

তার বরখাস্তের বিষয়টি সঠিক হয়নি মর্মে ধর্ম মন্ত্রণালয়কে দেয়া ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিলের বোর্ড অব গভনর্সের এক পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। আর মহিউদ্দিন মজুমদারও বরখাস্ত আদেশ বাতিল চেয়ে আবেদন করেন।

তারই ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। জানা গেছে, ইফার ডিজির বাসায় নেয়ার জন্য আনুমানিক ৪০টি ফাইল তার গাড়িতে ওঠানো হয়েছিল। কিন্তু বাধার মুখে সেগুলো আবার গাড়ি থেকে অফিসের লকারে রাখতে তিনি বাধ্য হন।

পরে দ্রুত অফিস ত্যাগ করলে বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তার কক্ষে অতিরিক্ত তালা লাগিয়ে দেন। রাত পর্যন্ত তারা অফিস পাহারা দেন। ডিজির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত দুই পরিচালকের কক্ষেও তালা দেয়া হয়।

ডিজি বা তার ঘনিষ্ঠ কেউ যাতে অফিস থেকে কোনো নথি সরাতে না পারেন তার জন্য রাত ৮টা পর্যন্ত ইফা ভবনে অবস্থান করে বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পরে পুলিশ ভবনের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিলে তারা সরে আসেন।

বিগত ওয়ান-ইলেভেনের পর আওয়ামী লীগ সররকারের শুরু থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়ে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তিনি। গত দুই বছর আগে তিনি মূল চাকরিস্থলে অবসরে গেলেও দুই বছরের নতুন চুক্তিতে ইফায় বহাল থাকেন।

ধর্ম মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন সূত্র জানিয়েছে, শামীম মোহাম্মদ আফজাল প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সাথে নিজের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে এমন কথা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের কাছে প্রায়ই বলে সবাইকে তটস্থ রাখতেন।

তার বিরুদ্ধে এর আগে বিভিন্ন নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনেও রয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।

তবে সর্বশেষ বায়তুল মোকাররম মসজিদের পিলার অপসারণের ঘটনাকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা এবং পিলার অপসারণের বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেয়ায় মসজিদ মার্কেট বিভাগের পরিচালককে অন্য কিছু অভিযোগে বরখাস্তের ঘটনায় ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হন।

পিলার অপসারণের বিষয়টি গোপন রেখে জাতীয় মসজিদকে দীর্ঘ আট মাস ধরে বিপর্যয়ের মধ্যে রাখা হয় বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইফার একাধিক কর্মচারী জানান, দুর্নীতি আর অনিয়মের নানা অভিযোগে ইসলামী ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক শামীম মোহাম্মদ আফজালকে মন্ত্রণালয় থেকে পদত্যাগের কথা বলা হলেও এখন স্বপদে বহাল রয়েছেন। অদৃশ্য ক্ষমতার বলে দীর্ঘ ১১ বছর ধরে ইসলামী ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকের পদটি দখল কওে রেখেছেন তিনি।

এর আগে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক পদে ত্রিমুখী লড়াই চলে। সম্ভাব্য তালিকায় ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ড. চৌধুরী মো. বাবুল হাসান, বাংলাদেশ ওলামা মাশায়েখ তৌহিদি জনতা সংহতি পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ, বর্তমান ডিজি শামীম মোহাম্মদ আফজাল এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাবেক পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ আল মারুফের ছিল।

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি হিসেবে নিয়োগ পান শামীম মোহাম্মদ আফজাল। এ পদে যোগদানের পর থেকে দীর্ঘ ৯ বছর তিনি দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ না বাড়লে সে ক্ষেত্রে এই পদে নতুন করে নিয়োগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সূত্রে জানা গেছে, মহাপরিচালক শামীম মোহাম্মদ আফজালসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা প্রকল্পের ৩৮ কর্মকর্তাকে মৌখিক নির্দেশে সরকারি চাকরি দিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, ফিল্ড অফিসার পদে অতিরিক্ত নিয়োগ, প্রশিক্ষণের অর্থ আত্মসাৎ ও ভুয়া বিল করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ মন্ত্রণালয় ও দুদকে রয়েছে।

গত ২০১৬ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (ইফা) মহাপরিচালক শামীম মোহাম্মদ আফজাল ও প্রকল্প পরিচালক এ এম এম সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

তখন দুদক যে সব অভিযোগ তদন্ত করে সেগুলোরমধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল, মৌখিক নির্দেশে সরকারি চাকরি প্রদান, মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা প্রকল্পে নিয়োগপত্র ছাড়াই বছরের পর বছর কাজ করেন ৩৮ কর্মকর্তা, মৌখিক নির্দেশে ব্যবহার করছেন প্রকল্পের মোটরসাইকেল, তাদের স্বাক্ষরেই ব্যাংক থেকে তোলা হয় প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অর্থ আত্মসাৎ, গণশিক্ষা কার্যক্রম কল্পের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ভাতা হিসেবে প্রকল্পে রাখা সোয়া কোটি টাকা শিক্ষকদের না দিয়ে তা আত্মাতের অভিযোগ।

এ ব্যাপারে ইসলামী ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক শামীম মোহাম্মদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত