শিরোনাম

হঠাৎ বিশাল লোকসানে রাষ্ট্রায়ত্ত ১৩ প্রতিষ্ঠান

প্রিন্ট সংস্করণ॥জাহাঙ্গীর আলম  |  ১১:৩১, জুন ১৭, ২০১৯

*পিডিবির লোকসান বেড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা
*বছরের ব্যবধানে ঢাকা ওয়াসার মুনাফা তলানিতে
*উৎপাদন বাড়ায় লোকসানও বাড়ছে : খালেদ মাহমুদ

রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গত পাঁচ বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা লাভ করলেও চলতি অর্থবছরে হঠাৎ করে দেখা দিয়েছে বিপরীত চিত্র। লাভ তো দূরের কথা বড় ধরনের লোকসানে পড়েছে ওইসব প্রতিষ্ঠান। লোকসানের পরিমাণ প্রায় চার হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। যেখানে আগের অর্থবছরে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর নিট মুনাফার পরিমাণ ছিল প্রায় পাঁচ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা।

এর মধ্যে শুধু বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডেরই (বিপিডিবি) লোকসান হচ্ছে ১০ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। এক বছরে বেড়েছে হাজার কোটি টাকা। সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র হলো ঢাকা ওয়াসার। পানি ব্যবস্থাপনার এ প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ৮০ লাখ টাকা লাভ করবে।

যেখানে গত অর্থবছরে লাভ হয়েছে ২৬০ কোটি টাকা। তার আগের অর্থবছরে লাভ হয়েছিলো ১৯২ কোটি টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে লাভ হয়েছিলো ২ কোটি টাকা, পরের অর্থবছরে ১৬৬ কোটি টাকা এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরে লাভ হয়েছিলো ১৮২ কোটি টাকা। মতামত জানতে প্রতিষ্ঠানটির এমডি প্রকৌশলী তাকসিম এ খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে ফোন বন্ধ থাকায় মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

লোকসানের ব্যাপারে জানতে চাইলে পিডিবির চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ আমার সংবাদকে বলেন, প্রতি বছরই উৎপাদন বাড়ছে। বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে। এ কারণেই লোকসানের পরিমাণ বাড়ছে। কারণ অনেক ভর্তুকি দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হচ্ছে।

লোকসান প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালও বাজেট ডকুমেন্টে উল্লেখ করেছেন, দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ এবং জনকল্যাণে উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কম মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের ফলে বিদ্যুৎ খাত লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে।

বাজেট ডকুমেন্ট অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৯ এ দেখা যায়, ইতোপূর্বে ২০১২-১৩ অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় দুই হাজার ৬০৫ কোটি টাকা নিট লোকসান দিয়েছিল। এরপর ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সব মিলিয়ে নিট মুনাফায় রয়েছে।

ওই অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নিট মুনাফা হয়েছিল প্রায় তিন হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে মুনাফা করে ৪ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মোট নিট মুনাফা হয়েছে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে। ওই বছর নিট মুনাফা হয়েছিল ১০ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা।

পরের অর্থবছরে মুনাফা হয় ৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা, গত অর্থবছরে ৫ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা মুনাফা করে। কিন্তু হঠাৎ করে এক বছরের ব্যবধানে লোকসান হয়েছে ৪ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ৫৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চলতি অর্থবছরে মাত্র ১৩টি প্রতিষ্ঠান লোকসান দিয়েছে। অর্থবছর শেষে এগুলোর মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৩ হাজার ৬৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে একই প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসানের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৩৬৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অর্থাৎ, গত এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান বাড়ছে এক হাজার ৭০১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা কমে যাওয়ার পাশাপাশি লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান বৃদ্ধি ও মুনাফা অর্জনকারী দু-একটি প্রতিষ্ঠান লোকসান দেয়ার কারণে লোকসানের পরিমাণ বাড়ছে।

সমীক্ষায় তথ্য উপাত্তে দেখা যায়, ১৩টি লোকসানি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। এক বছরে এ প্রতিষ্ঠানটির লোকসান বেড়ে হয়েছে ১০ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। যা গত অর্থবছরে লোকসান ছিলো ৯ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা।

অর্থাৎ গত অর্থবছরের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটি এবার ৯৮৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা অতিরিক্ত লোকসান দিচ্ছে। তার আগের অর্থবছরে ছিলো ৪ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে লোকসান ছিলো ৩ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। তার আগের অর্থবছরে লোকসান ছিলো ৭ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরে পিডিবির লোকসান ছিলো ৬ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা।

রাষ্ট্রীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসানও গত অর্থবছরের তুলনায় বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে লোকসানের দ্বিতীয় তালিকায় থাকছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশন (বিএসএফআইসি)। এর লোকসানের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৯৮২ কোটি টাকা।

যা গত অর্থবছরে লোকসান দিয়েছে ৮৩৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। তার আগের অর্থবছরে লোকসান দিয়েছে ৬৩০ কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চিনির এ প্রতিষ্ঠানে লোকসান হয়েছে ৫১৭ কোটি টাকা। তার আগের অর্থবছরে ৫৪০ কোটি টাকা এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এ প্রতিষ্ঠানের লোকসান হয়েছে ৫৬৫ কোটি টাকা।

লোকসানি তৃতীয় প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)। গত পাঁচ বছরে শিল্পমন্ত্রণালয়ের উৎপাদনমুখী এ প্রতিষ্ঠানে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে লোকসানের পরিমাণ। এবার এর লোকসান দাঁড়াবে ৯১১ কোটি টাকা।

গত অর্থবছরে লোকসান দিয়েছে ৫৫৫ কোটি টাকা। তার আগের অর্থবছরে লোকসান দিয়েছে ৪৮৫ কোটি, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৭৪ কোটি, পরের অর্থবছরে ১০৩ কোটি টাকা এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরে লোকসান হয়েছে ৯৪ কোটি টাকা। লোকসানের ৪র্থ পর্যায়ে বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন (বিজেএমসি)। চলতি অর্থবছরে এর লোকসান দাঁড়াবে ৬৯৫ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে লোকসান দিয়েছে ৪৯৭ কোটি টাকা।

প্রতিবছর ব্যাপক চাহিদা বাড়ার পরও লোকসান ঠেকানো যাচ্ছে না বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআরটিসি)। তবে এর লোকসান গত অর্থবছরের তুলনায় কমছে। চলতি অর্থবছর শেষে বিআরটিসির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬০ কোটি টাকা।

গত অর্থবছরে লোকসান দিয়েছে ৯৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। অবশিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসানের পরিমাণ সব মিলিয়ে ১০০ কোটি টাকার মতো দাঁড়াবে। বিআইডব্লিউটিএর লোকসান হবে ৬১ কোটি টাকা। যেখানে গত অর্থবছরে লোকসান ছিলো ২৬ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরে মুনাফা কমে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় রয়েছে— বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। চলতি অর্থবছর শেষে বিপিসির মুনাফার পরিমাণ দাঁড়াবে এক হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে মুনাফা করেছে পাঁচ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা। বিটিআরসির মুনাফার পরিমাণ দাঁড়াবে দুই হাজার ৫৪৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

গত অর্থবছরে এটি মুনাফা করেছে ছয় হাজার ২৬২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। সিএএর মুনাফার পরিমাণ দাঁড়াবে ৩৫৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। গত অর্থবছরে মুনাফা করেছে ৬৮৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

তবে গত অর্থবছরের তুলনায় ‘পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড’ (আরইবি) ও ‘রাজউক’-এর মুনাফা এবার বাড়ছে। চলতি অর্থবছর শেষে আরইবির মুনাফার পরিমাণ দাঁড়াবে ৫৯২ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে মুনাফা করেছে ৩৫১ কোটি টাকা। রাজউক-এর মুনাফার পরিমাণ দাঁড়াবে ৪৮৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। গত অর্থবছরে মুনাফা করেছে ৪১৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

এদিকে এসব প্রতিষ্ঠানের নিট মুনাফা কমে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরে সরকারকে মোট লভ্যাংশ দেয়ার পরিমাণও কমে যাবে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত বিপিসি লোকসানে থাকবে বলে সংস্থাটি কোনো মুনাফা অর্জন করবে না। এছাড়া ভর্তুকি মূল্যে অভ্যন্তরীণ বাজারে আমদানিকৃত এলএনজিও (প্রাকৃতিক তরল গ্যাস) বিক্রয় করা হবে। এ কারণেও লোকসানের পরিমাণ আগামীতে আরও বাড়তে পারে বলে বলা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন সর্বোচ্চ নিট মুনাফা করেছে। আগের অর্থবছর নিট মুনাফা ৬ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা থেকে হ্রাস পেয়ে এবছর হবে ২৫৪৮ কোটি টাকা।

পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন ১ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। আগের বছর মুনাফা করেছিল ৫ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা। তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ কর্পোরেশনের মুনাফা হবে চলতি অর্থবছরে ৮৮৯ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আগের নিট মুনাফা ৭৯২ কোটি টাকা হতে চলতি অর্থবছরে কমে ৫৯১ কোটি টাকায় নেমে আসবে।

বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের নিট লোকসান বৃদ্ধি পেয়ে ৬৯৫ কোটি টাকা হয়েছে। গত বছর প্রতিষ্ঠানটি লোকসান দিয়েছে ৪৯৭ কোটি টাকা। বিআরটিসি চলতি অর্থবছর লোকসান দিয়েছে ৬০ কোটি টাকা, বিআইডব্লিউটিএ লোকসান করেছে ৬১ কোটি টাকা। তবে রাজউকের লাভ হবে ৪৮৯ কোটি টাকা, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের ( বেজা) মুনাফা হবে ৩২১ কোটি টাকা।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত