শিরোনাম

জ্যেষ্ঠরা চান খালেদার মুক্তি লন্ডন থেকে আসছে কৌশল

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম  |  ১১:২২, জুন ১৭, ২০১৯

খালেদা জিয়া বন্দি হওয়ার পর থেকেই তারেক রহমানের সাথে মতে মিলছে না বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের। মওদুদ আহমদ, মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, আমান উল্লাহ আমানসহ মাঠপর্যায়ের অনেক নেতাই আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করে আসছেন। কিন্তু তারেক রহমান, লন্ডন বুদ্ধিজীবীসহ মহাসচিব হাঁটছেন দেশের নেতৃত্বের জন্য ভবিষ্যৎ প্ল্যানে।

বিএনপির নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য— সরকার টিকে গেছে, বিএনপি আন্দোলন-সংগ্রাম করে আর কিছুই করতে পারবে না। তাই একটা রাজনৈতিক সমঝোতায় দলীয় সম্পদ রক্ষা, হামলা-মামলা, দল ও নেতাকর্মীদের রক্ষা করাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান। দীর্ঘ সময় ধরে দেশ আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকাকালীন বিএনপি অনেক কর্মকৌশল থেকেই পিছিয়ে গেছে।

সামপ্রতিক ইস্যুতে সক্রিয় থাকা, জনগণের ইস্যু নিয়ে কথা বলা ও দলে নেতৃত্ব তৈরি অনেকটাই অম্লান ছিলো। তাই আগামী পাঁচ বছরে বিএনপি পুনর্গঠিত হয়ে আন্দোলনের শক্তি সঞ্চয় করবে।

এর মধ্যে সামপ্রতিক সব ইস্যুতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে মাঠে থাকতেও নির্দেশ দিয়েছেন তারেক রহমান। এমন কৌশলে একটা দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পর ফের বিএনপির হাতে ক্ষমতা আসবে বলেও স্থায়ী কমিটিকে লন্ডন থেকে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এখন তারেক রহমানের সঙ্গে স্থায়ী কমিটির মতের অমিল খালেদা জিয়ার মুক্তি ইস্যু নিয়ে। খালেদাপন্থিদের অনেকে তারেক রহমানের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন, আপাতত তৃণমূল নেতাকর্মীদের সতেজ রাখতে এবং সরকারকে চাপে রাখতে প্রতি মাসে অন্তত দুই-একদিন হলেও বড় ধরনের কর্মসূচি হাতে রাখতে চাচ্ছেন তারা।

এতে করে দেশের জনগণের কাছে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির ভূমিকা সুদৃঢ় থাকবে। আন্দোলন না করে রাজচরিত্র হারালে বিএনপি পঙ্গু দলেও পরিণত হতে পারে, এমন ইঙ্গিত লন্ডন নেতাকে দেন জ্যেষ্ঠ নেতারা।

গতকালও দলের সিনিয়র স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, আইনি প্রক্রিয়ায় বেগম জিয়ার জামিনের জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব। কিন্তু তার সত্যিকারের মুক্তি আসবে আন্দোলনের মাধ্যমে। রাজপথেই বেগম জিয়ার মুক্তি নিশ্চিত হতে পারে। এ জন্য আমাদের সংগঠিত হয়ে কর্মসূচি দিতে হবে। আমাদের এমন কর্মসূচি দিতে হবে, যাতে সরকার বেগম জিয়াকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এ ছাড়া বেগম জিয়ার মুক্তির আর কোনো পথ নেই।

তবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে হাতে রেখে বিএনপি যাতে আগামীতে দেশের নেতৃত্ব দিতে পারে; সেই প্ল্যানে এগোচ্ছেন তারেক রহমান। যদিও এতে করে খালেদা জিয়াসহ দলের স্থায়ী কমিটি, দীর্ঘ সময় ধরে যারা নানা পদ নিয়ে বসে আছেন এমন নেতা বাদ পড়বেন। লন্ডন বুদ্ধিজীবীদের ছকেই এখন বিএনপি পরিচালিত হচ্ছে।

স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত এখন পরামর্শে রূপ নিয়েছে বিএনপিতে! দল পরিচালিত হওয়ার জন্য স্থায়ী কমিটি আগে যে ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা রাখত, এখন তা আর নেই। তাদের সিদ্ধান্ত এখন পরামর্শ! ভালো লাগলে গ্রহণ হচ্ছে, না হয় বাদ যাচ্ছে।

জ্যেষ্ঠদের মত, খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর স্থায়ী কমিটির কোনো সিদ্ধান্তই তারেক জিয়া বাস্তবায়ন করতে দেয়নি। স্থায়ী কমিটির বৈঠকে শীর্ষ নেতারা বড় যে কয়টি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, দিন শেষে তা উল্টোভাবে করেছেন লন্ডন নেতা। স্থায়ী কমিটিতে সিদ্ধান্ত ছিলো বিএনপির কেউ শপথ নেবেন না, কিন্তু দিন শেষে তারেকের নির্দেশে সবাই শপথ নিলেন।

যদিও এ ইস্যুতে তারেকের দোষ নেই বলে দাবি বিশ্বস্ত একটি সূত্রের। তখন শপথ নিতে বিএনপি প্রার্থীদের উস্কে দিয়েছিলেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শপথ নেয়া একজন সমপ্রতি দলীয় এক ফোরামে দাবি করেছেন, গুলশানে এবং মহাসচিবের বাসায়ও তারা ডাক পেয়েছিলেন, বিষয়টি দু-একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য ও তারেক রহমান জানেন। ‘শপথ নেয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে মহাসচিবের যোগাযোগ ছিলো।

শেষ মুহূর্তে মির্জা ফখরুল তারেক রহমানকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, আমরা যদি দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংসদে যোগ দেই, তাহলে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা ও ভাবমূর্তি সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

তার চেয়ে কৌশলগতভাবে তাদের অনুমতি দেয়াই ভালো হবে। শেষ মুহূর্তে এভাবে তারেক জিয়াকে রাজি করাতে সফল হন মহাসচিব।’ যেমন— এর আগে কারাগারে গিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি দিতেও খালেদা জিয়াকে বোঝাতে সক্ষম হন ছাত্র রাজনীতিতে জিয়ার আদর্শের বাইরে থাকা এই মহাসচিব।

এমন সব ইস্যু নিয়ে দীর্ঘ সময়ের পর বিএনপির ক্ষুব্ধ স্থায়ী কমিটির নেতারা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে স্কাইপে রেখে গত শনিবার বৈঠকে বসেছিলেন। দেড় মাস পর শনিবার গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৈঠকে বসেন তারা। কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়।

খালেদা জিয়ার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার অনুমতি ছাড়া বগুড়ায় তাকে প্রার্থী করা হলো কেন? এখন সংসদে যাওয়া বৈধ হলে এর আগে উপজেলা ও সিটি নির্বাচনে অনুমতি দেয়া হলো না কেন? শত শত নেতা উপজেলা নির্বাচনে বহিষ্কার হলো; এখন তাদের কী হবে?

স্থায়ী কমিটিকে দূরত্বে রেখে এভাবে আর কয়দিন দল চলবে? খালেদা জিয়া কারাগারে, সংসদে গিয়ে সরকারকে বৈধতা দেয়া! এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির ভূমিকা কী হবে? দলে কমিটি গঠন নিয়ে অতুষ্টদের আন্দোলনের শেষ ইমেজও ধ্বংসের পথে? দলের সিনিয়র তিন স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ, মোশাররফ হোসেন ও মির্জা আব্বাস এমন কিছু প্রশ্ন উপস্থাপন করলেও, এরও কোনো উত্তর আসেনি।

তবে দলের বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, তারেক জিয়া ভবিষ্যৎ প্ল্যান নিয়ে সেই সিদ্ধান্তের আলোকেই বিএনপি চালাচ্ছেন। লন্ডনে এবং দেশের বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শে টিকে থাকার কৌশলে থাকবে দল।

খালেদা জিয়া কারাগারে থাকাকালীন আগামীর নতুন নেতৃত্বের স্লোগানে তার (তারেক) সমর্থকদের দিয়ে সেটআপ সম্পূর্ণ করবেন। দলের স্থায়ী কমিটির বড় একটি অংশ বাদ পড়বেন। যাদের পদ আছে দলে কোনো কাজ নেই, তারাও বাদ পড়ে যাবেন।

আরেকটি সূত্রের দাবি, সমপ্রতি ছাত্রদলে যারা আন্দোলন করছেন, তারা অতীতে অনেকে ত্যাগের পরিচয় দিয়েছেন। তাই যুবদলের কমিটিতে তাদের প্রয়োজন। আর হুট করে চাইলে সিনিয়র বুড়ো যুবদল নেতাদের বাদ দিয়ে নতুনদের ভালো পদ দেয়া সম্ভব নয়। তাই তারেকের ইঙ্গিতেই ছাত্রদল নয়াপল্টনে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। এতে করে অনেকেরই যুবদলে ভালো পদের নিশ্চয়তা আসবে।

তবে এখন যেহেতু বড় একটি অংশ খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে দলে সরব, তাদের আপাতত মাঠের কর্মসূচিতে, ঘরোয়া সমাবেশ, মানবন্ধন, অনশনসহ এমন কিছু কর্মসূচিতে তাজা রাখবেন। বিএনপির জ্যেষ্ঠ এক নেতার মত, খালেদা ইস্যুতে কোনোভাবে যদি তারেকের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অনুমতি পাই, এতে করেও খালেদা জিয়ার মুক্তির একটা সম্ভাবনা থাকবে।

কারণ তারেক বিএনপিকে নেতৃত্ব দিক এটি অন্তত ক্ষমতাসীনরা চায় না। তাই খালেদার মুক্তিই হতে পারে সরকারের জন্য বড় সফলতা! কারণ খালেদা জিয়া এখন বের হলেই তারেক সেটআপের সব বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। তাই খালেদাপন্থিরা এখন সরব রয়েছেন। আইনি প্রক্রিয়া ও আন্দোলন দুটিই চালিয়ে যাওয়ার কৌশলে রয়েছেন তারা।

গতকালও বাজেট প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, আইনি প্রক্রিয়ায় বেগম জিয়ার জামিনের জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব। কিন্তু তার সত্যিকারের মুক্তি আসবে আন্দোলনের মাধ্যমে। রাজপথেই বেগম জিয়ার মুক্তি নিশ্চিত হতে পারে। এ জন্য আমাদের সংগঠিত হতে হবে এবং কর্মসূচি দিতে হবে। আমাদের এমন কর্মসূচি দিতে হবে, যাতে সরকার বেগম জিয়াকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

মওদুদ আহমদ বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে সারা বাংলাদেশের মানুষ উৎকণ্ঠিত। তারা সকলেই চান, বেগম জিয়া যাতে আর কারাগারে না থাকেন। এটা দেশের ১৬ কোটি মানুষের ইচ্ছা। কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না। সম্ভব হচ্ছে না কারণ, সরকারের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আমরা শত চেষ্টা করেও জামিনের সুরাহা করতে পারছি না।

বিএনপির এই নীতিনির্ধারক বলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় এক সপ্তাহের মধ্যে হাইকোর্টের ডিভিশনে জামিন চাওয়া হবে। আমরা আশা করি, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় তার জামিন হবে। যদি জামিন না হয়, তাহলে অবশ্যই আমরা আপিল বিভাগে যাবো। সরকারের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আজকে প্রায় এক বছর চার মাস ধরে খালেদা জিয়া কারাগারে আছেন।’

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত